আমরা অনেক সময় বলি, ‘অহংকার মানুষের পতন ঘটায়’। কিন্তু এই অহংকারের পাশাপাশি আমাদের আরও একটি নীরব শত্রু আছে—তা হলো কোনো কিছুকে অতিরঞ্জিত করে বা ‘বড় করে’ দেখার প্রবণতা। এটি মূলত পারফেকশনিজম বা খুঁতখুঁতে স্বভাবের একটি বিশেষ দিক। যারা সবকিছু নিখুঁত করতে চান, তারা জীবনের সাধারণ ঘটনাকেও হয় বিশাল বড় সাফল্য মনে করেন, না হয় চরম বিপর্যয় হিসেবে দেখেন।
একজন থেরাপিস্ট যখন তার রোগীর সমস্যার কথা শোনেন, তিনি প্রায়ই একটি প্রশ্ন করেন— “এই সমস্যার কতটুকু বাস্তব, আর কতটুকু আপনার নিজের মনের তৈরি?” একটু গভীরভাবে ভাবলে আমরা বুঝতে পারি, আমাদের জীবনের অনেক নাটকীয়তাই আসলে আমাদের মস্তিষ্কপ্রসূত। হয়তো কেউ একটি কথা বলেছে, আমরা সেটির ভুল অর্থ বের করে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছি। অথবা আমরা নিজেরাই অন্যের সাথে রুক্ষ আচরণ করে ফেলেছি, যা পরে আমাদের ম নে অপরাধবোধের পাহাড় তৈরি করছে। আমরা আসলে জীবনকে কেবল দুটি চরম বিন্দুতে (Extremes) দেখতে অভ্যস্ত—সবকিছু হয় খুব ভালো, না হয় খুব খারাপ। মাঝখানের স্বাভাবিক জায়গাটা আমরা ধরতেই পারি না।
সবকিছুকে বাড়িয়ে দেখার অভ্যাস
দেহের খুঁত ও অতিরঞ্জনের খেলা
এই মানসিকতা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে ‘বডি ডিসমরফিয়া’ নামক সমস্যায়। এখানে মানুষ নিজের শরীরের সামান্য কোনো খুঁত নিয়ে দিনরাত দুশ্চিন্তা করে। মজার ব্যাপার হলো, এই অতিরঞ্জন দুইভাবে কাজ করে। যখন কেউ নিজেকে নিজের চেয়ে সুন্দর কারো সাথে তুলনা করে, তখন নিজের খুঁতগুলো তার চোখে অনেক বড় হয়ে ধরা দেয়। আবার যখন সে নিজেকে এমন কারো সাথে তুলনা করে যাকে সে নিজের চেয়ে কম সুন্দর মনে করে, তখন সে নিজের ভালো দিকগুলোকে অতিরঞ্জিত করে দেখে এবং অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করে। এই যে সারাক্ষণ নিজেকে অন্যের পাল্লায় মাপা—এটি আসলে এক ধরণের বিকৃত মানসিকতা, যা বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন।
পারফেকশনিস্টদের রঙিন ও ধূসর জগত
পারফেকশনিস্টরা আসলে এক আজব জগতের বাসিন্দা। তাদের কাছে মাঝামাঝি বলে কিছু নেই। তারা হয় সবার ভালোবাসা পায়, না হয় সবার ঘৃণা। তারা হয় প্রচণ্ড বুদ্ধিমান, না হয় আস্ত নির্বোধ। এই চরমপন্থী চিন্তা তাদের এক ধরণের সাময়িক স্বস্তি দেয় ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি কেবল ডিপ্রেশন আর মানসিক যন্ত্রণাই বাড়ায়। ছোটখাটো খুঁতকে তারা বিশাল করে দেখে বলেই তা সারানোর জন্য অস্থির হয়ে পড়ে।
সাফল্যের নেশা এবং একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
এই অতিরঞ্জন আসলে এক ধরণের আসক্তি বা নেশার মতো। আমরা যখন সফল হই, তখন সেই সাফল্যকে কল্পনায় অনেক বড় করে তুলি। আমি নিজে একসময় ভাবতাম, যদি আমি একজন নামকরা লেখক হতে পারি, তবেই হয়তো আমি সুখী হবো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমার লেখা যখন ছাপা হয়, তার কিছুদিনের মধ্যেই মানুষ তা ভুলে যায়। আবার নতুন কোনো লেখা সেই জায়গা দখল করে।
সাফল্যের চূড়ায় থাকলে আমি ভাবি ‘আমি জিতে গেছি’, আর ব্যর্থতার সময় ভাবি ‘সব শেষ হয়ে গেল’। অথচ এই দুটোর কোনোটিই ধ্রুব সত্য নয়। আগের ভাবনাটি আমাকে অতি-আশাবাদী করে তোলে যা পরে বড় আঘাত দেয়, আর পরেরটি আমাকে ভয়ে গুটিয়ে রাখে।
প্রকৃত শান্তি কোথায়?
আমরা অনেক সময় ভাবি কোনো অ্যাওয়ার্ড বা বড় সাফল্য আমাদের জীবন আমূল বদলে দেবে। অস্কার বিজয়ীরাও স্বীকার করেছেন যে, পুরস্কার পাওয়ার পর তাদের জীবনে আসলে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। তাহলে আমরা কেন এত অতিরঞ্জন করি?
আসলে আমরা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শান্তি পেতে চাই। আমরা চাই আমাদের জীবনটা মাটির পুতুলের মতো হোক, যাকে আমরা যেভাবে খুশি সাজাতে পারবো। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ আর শান্তি—এই দুটি কখনো এক সাথে থাকে না।
প্রকৃত শান্তি তখনই আসে যখন আমরা আমাদের এই অতিরঞ্জিত করার স্বভাব আর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নিজের বলে মেনে নিতে পারি। যখন আমরা নিজের সীমাবদ্ধতাকে গ্রহণ করি এবং বারবার নিজেকে এই প্রশ্ন করা বন্ধ করি যে— ‘জীবনে কি আর কিছু পাওয়ার নেই?’
আপনার অতিরঞ্জিত করার এই প্রবণতা হয়তো পারিবারিক চাপ বা ছোটবেলার কোনো কষ্টের স্মৃতি থেকে আসতে পারে। হয়তো সাফল্যের মাধ্যমে আপনি পুরনো কোনো অপমানের প্রতিশোধ নিতে চান। কিন্তু দিনশেষে নিজেকে প্রশ্ন করুন—অন্যের সাথে এই যে নেতিবাচক তুলনা, তা কি আপনাকে টেকসই কোনো সুখ দিচ্ছে? বাইরের কোনো কিছু কি আসলেই আপনাকে পরিপূর্ণ করতে পারে?
অন্যরা যখন আমাদের ওপর বিরক্ত হয়, তখন আমরা মন খারাপ করি। কিন্তু তারা আসলে আমাদের এই ‘অতিরঞ্জিত চশমা’র ওপর বিরক্ত। তারা যা সহজভাবে দেখতে পাচ্ছে, আমরা আমাদের মনের জটিলতায় তা দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের অতিরঞ্জনই আমাদের সত্য দেখা থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।
মূল নিবন্ধ: ”If Ego Is the Enemy, So Is Your Tendency to Exaggerate”- Psyciatric TImes (Febriaty 2026)
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও দেখুন-


