আজকে একটি বর্ষার গান দিয়ে শুরু করা যাক। “বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান।” কোনো এক বর্ষণমুখর দিনে বারান্দায় বসে ধোঁয়া উঠা কফি হাতে নিয়ে পছন্দের গান শুনতে শুনতে বৃষ্টি দেখা অতীব সুন্দর এবং আমাদের মনে প্রাণের সঞ্চার করে। অথবা অস্তমিত রবির কিরণের গোধূলি বেলায় আলো-আঁধারের সৌন্দর্য আমাদের হৃদয়কে আন্দোলিত করে। বর্ষার কোন এক পড়ন্ত বিকেলে ভরা যৌবনে প্রাণবন্ত নদীর বুকে পাল তোলা নৌকা নিয়ে হারিয়ে যেতে খুব ইচ্ছে করে।
ছেলেবেলার সেই পাগলামিগুলোয় আবার হাওয়া লাগাতে মন চায়। আধুনিক সভ্যতার বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব সাফল্যে আমরাও আধুনিক হয়ে উঠছি। আমাদের শৈশবের মতো পাগলামি করে বেড়ানো সময়গুলো এখন অন্য কিছু দখল নিয়েছে।
আমরা বৃষ্টি দেখি, বৃষ্টি বিলাস করি তবে, সেখানে আমাদের হাতে শোভা পায় স্মার্টফোন, আমরা বুঁদ হয়ে থাকি সোশ্যাল মিডিয়াতে। বন্ধুর সাথে দেখা হয়, কিন্তু আড্ডা আর আগের মতো জমে না, আড্ডায় যেন আর প্রাণ নেই। কেননা বহুদিন পর দেখা হবার পরও আমরা আড্ডার ফাঁকে ঢু মেরে দেখে আসতে চাই রাশিয়া-ইউক্রেনের খবর, মেসির কোনো বিশ্বজয়ের গল্প। আমরা সবাই মিলে পরিবারের সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটাতে দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যাই কিন্তু সেখানেও আমাদের হাতে থাকে আমাদের নিত্যসঙ্গী স্মার্টফোন। আমরা স্যোশাল মিডিয়াতে উকি দেই। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের দূরের মানুষকে কাছে নিয়ে আসছে। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।
সোশ্যাল মিডিয়া জনসচেতনতায় অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে অনেকে সোশ্যাল মিডিয়া অপব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করছে। মেডিক্যাল সেক্টরের মানুষ নন অথচ বিরাট বড়ো ডাক্তার সেজে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালাচ্ছেন। অনেকে হয়ে উঠেছেন মানসিক রোগের বড়ো ডাক্তার অথচ এই বিষয়ে তাদের বিজ্ঞানসম্মত কোনো জ্ঞান নেই। সোশ্যাল মিডিয়াতে তাদের অনুসারীদের বিশাল মহিরুহর উত্থান ঘটেছে।
ফলে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা চলছে। বাড়ছে স্টিগমা। সাধারণ মানুষের মাঝে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে এবং তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। অপর একটি পক্ষ নিজেদের কাউন্সিলর বা সাইকোথেরাপিস্ট হিসেবে দাবি করেন। অথচ তাদের বিজ্ঞানসম্মত কোনো প্রশিক্ষণ নাই। ফলে তাঁরা নিজেদের মতো করে মনগড়া কথা বলছেন। দিচ্ছেন কাউন্সেলিংয়ের ধর্ম উপদেশ, বিবাহের উপদেশ বা সন্তান নেয়ার উপদেশ। ফলে তৈরি হচ্ছে তথ্য বিভ্রাট। বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ মানসিক চিকিৎসা সেবা হতে। বেড়েই চলেছে মানসিক স্বাস্থ্যের স্টিগমা।

সময়ের পরিবর্তনে আধুনিক সভ্যতার বিনির্মাণে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি স্টিগমা কমার কথা থাকলেও সেরকম কমানো সম্ভব হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়াতে এই অপপ্রচারের কারণে আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতে যে বুঁদ হয়ে থাকি তা সম্ভব হয়েছে স্মার্টফোনের কল্যাণে। আর এই স্মার্টফোনের জনক বলা হয় মার্টিন কুপারকে। আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর পূর্বে সেল ফোনের সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। আজ তাঁর সৃষ্টি করা ফোনই অন্যদের হাত ধরে বিরাট আপডেটেড হয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই অত্যাধুনিক ফিচারগুলির ব্যবহার তাঁর কাছে কিছু সময় দুর্বোধ্য হয়ে উঠে। তাঁর কথায়, “আমি কোনোদিনই বুঝতে পারবো না, সেলফোন কীভাবে ব্যবহার করতে হয় অন্তত যেভাবে আমার নাতি-নাতনিরা ব্যবহার করে।”
এই বিখ্যাত মার্কিন প্রকৌশলী মার্টিন কুপার ১৯২৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইলিনয়িস রাজ্যের শিকাগোতে জন্যগ্রহণ করেন। তিনি মোটোরোলা অ্যারেক মের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং একইসাথে ডায়না এলএলসি’র সহ প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। ১৯৫০ সালে ইলিনয়িস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৭ সালে আই আইটি থেকেই ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২০০৪ সালে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। বিশিষ্ট উদ্যোক্তা, আবিষ্কারক, বিনিয়োগকারী, এবং নীতি পরামর্শক ও তারবিহীন মোবাইলের ফার্স্ট লেডি হিসেবে পরিচিত আর্লিন হ্যারিসকে বিয়ে করেন মার্টিন কুপার। মোবাইল ফোন মানুষের জীবনকে উন্নত করেছে। সেলফোনের স্রষ্টা মার্টিন কুপার মনে করেন, “ছোট্ট ডিভাইস আমাদের সকলের পকেটেই রয়েছে।
এই ফোনের মধ্যে একদিন আমাদের রোগ সারিয়ে তোলার ক্ষমতাও রয়েছে। সেলফোন এখন মানুষের এক্সটেনশনে পরিণত হয়েছে। আরও অনেক কিছু করতে পারে এটি।” মার্টিন কুপারে কথায়, “আমরা একেবারে শুরুর সময়টায় রয়েছি। আমরা সবে বুঝতে শিখেছি, এটা কী করতে পারে। ভবিষ্যতে আমরা আশা করতে পারি সেলফোন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটাতে পারে।
আমি তাদের জানিয়ে রাখতে চাই, এক বা দুই প্রজ্যা পরেই রোগ জয় করতে মানুষকে সাহায্য করবে মোবাইল ফোন।” আমরা বর্তমানে দেখেছি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্মার্টফোন বিপ্লব ঘটিয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনায় স্মার্টফোনের জয়-জয় কার। মোবাইল ফোনের সমস্যার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার খুবই বিরক্ত লাগে যখন দেখি মানুষ রাস্তা পারাপারের সময়ও নিজেদের সেলফোনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।” তাই যাকে স্মার্টফোনের জনক মার্টিন কুপার আমাদের পরামর্শ দিলেন, “ফোন রেখে জীবন উপভোগ করুন।” আমাদের বাঁচা উচিত জীবনের ঘটনায়, জীবনের প্রতি মুহূর্তে।
ডা. মনিশঙ্কর বালা
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও পড়ুন:


