প্রায় ছ’ফুট লম্বা পাতলা চেহারা, পরনে অর্ধময়লা প্যান্ট আর কোট। মাথায় সস্তা দামের টুপি। বাইশ তেইশ বছরের এক তরুণ। হাতের এক বান্ডিল কাগজ নিয়ে প্রকাশকের দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়ান। অনেক পরিশ্রম করে একটা উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর মনের ইচ্ছে যদি কেউ তাঁর উপন্যাস প্রকাশ করে। এক একদিন এক একজন প্রকাশকের কাছে যান। কিন্তু তাঁকে সবাই ফিরিয়ে দেন। বছরে পাঁচখানা উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু একটাও ছাপানোর মতো প্রকাশক পাওয়া যায়নি। দুঃখে-হতাশায় তিনি ঠিক করলেন আর যাই করুন না কেন কোনোদিন লেখক হবেন না।
নিজের প্রতিজ্ঞা রাখতে পারেননি তরুণ। কিছুদিন পরে আবার শুরু করলেন লেখা। তবে এবার আর উপন্যাস নয়, নাটক। আর এই নাটকই তাঁকে এনে দিলো বিশ্বজোড়া খ্যাতি। শেকসপীয়রের পরে যাঁকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নাট্যকার। কিংবা শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবতা পূজারি। এই মহান মানুষটির নাম জর্জ বার্নাড শ।
আয়ারল্যান্ডের ডাবলিয়ন শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই জন্ম হয় বার্নার্ড শর। তাঁরা ছিলেন দু-বোন এক ভাই। শ এর জীবনে তাঁর মায়ের বিস্তৃত ভূমিকা রয়েছে। মায়ের সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, ‘আমার মা ছিলেন সুন্দরের প্রতিমূর্তি। তাঁর গান শুনলে মনে হতো গির্জার প্রার্থনা-সংগীত। মা মানুষ হয়েছিলেন বড় শামনের মধ্যে, তাই তিনি আমাদের দিয়েছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা, আজ আমি যে পৃথিবী বিখ্যাত বার্নাড শ হতে পেরেছি তার জন্য সবচেয়ে বেশি ঋণী, সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ আমার মায়ের কাছে।’
দশ বছর বয়সে বার্নাড শকে ভর্তি করা হয় স্কুলে। কিন্তু স্কুলের বাঁধাধরা পড়াশোনা, পরীক্ষা তাঁর ভালো লাগত না। মাত্র ছ’বছর বয়সেই শিশুপাঠ্য বইয়ের সীমানা অতিক্রম করে জন স্টুয়ার্ট মিলের আত্মজীবনী পড়ে ফেলেছিলেন। বাড়িতেই পড়াশুনা শুরু করার পর শ সারাদিন পড়তেন। এই একাগ্রতা, পরিশ্রম আর নিষ্ঠার সঙ্গে মিশেছিল তাঁর অনুরাগ আর মেধা। কিশোর বয়সেই তিনি সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন পড়ে ফেলেছিলেন। বড় হয়ে লেখক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকলেও মাত্র পনের বছর বয়সেই আর্থিক দুরবস্থার দরুণ চাকরিতে ঢুকতে হয় তাঁকে। কিন্তু বাবার কাছে শিখেছিলেন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে। তাই চাকরির কাজের ফাঁকে ফাঁকে চলত তাঁর লেখালেখি।
কিন্তু ক্রমশই তাঁর মনে হচ্ছিল এই অফিসের চার দেয়ালের মধ্যে তিনি যেন ফুরিয়ে যাচ্ছেন। হারিয়ে যাচ্ছে তাঁর বড় হওয়ার চিন্তা। জীবনে যদি কিছু করতে হয় তাহলে যেতে হবে লন্ডন শহরে। এই সময়টায় অনেক আর্থিক কষ্টে কেটেছে তাঁর দিন। কিন্তু শ থেমে যাননি। একদিন তাঁর হাতে এলো কার্ল মার্কসের Das Kapital। মার্কস পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনের মধ্যে নতুন এক জগতের দ্বার উম্মেচিত হলো। তিনি তখন বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দেয়া শুরু করেন। বিভিন্ন পত্রিকায় সমালোচনাও লিখতেন। এ থেকেই প্রস্ফুটিত হয় শ এর মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রচলিত রীতি থেকে তিনি সমালোচনার ধারাকে নতুন দিকে পরিবর্তন করেন।
এরপর তিনি শুরু করেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের নতুন আঙ্গিকে নাটক রচনা। তাঁর নাটকগুলোর বিষয়, ভাব সবকিছুই ছিল নতুন যা দর্শকরা ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। কিন্তু শ ছিলেন অবিচল। নাটকের মধ্য দিয়েই সমগ্র মানব সমাজে নিজেকে তুলে ধরতে বদ্ধপরিকর। তিনি চাইতেন তাঁর নাটক হবে সমাজের সমস্ত অবক্ষয়, অন্যায় আর আদর্শহীনতার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ। ১৮৯৭ সালে তাঁর চতুর্থ নাটক অভিনীত হলে প্রিন্স অব ওয়েলস মন্তব্য করেন, ‘নাট্যকার নিশ্চয়ই পাগল।’ শ এই কথা শুনে বলেন, ‘দুঃখের বিষয় ঈশ্বর আমাকে এই রকম একটা পাগল হিসেবেই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। ইংল্যান্ডের পক্ষে প্রিন্স অব এসেলকের চেয়ে এই রকম একটা পাগলেরই দরকার বেশি।’
জর্জ বার্নাড শ মানসিকভাবে যা বিশ্বাস করতেন তাই দৃঢ়তায় ফুটিয়ে তুলতেন। তিনি তাঁর রচিত নাটকসমূহে তৎকালীন সমাজের নানা অসমাঞ্জস্য ও পরস্পর বিরোধিতা নিয়ে ব্যঙ্গ আর বিদ্রূপের মাধ্যমে সাহসী কণ্ঠে উচ্চারণ করতেন প্রকৃত সত্য। আর তাই সমসাময়িক মানুষ নাটকের মর্মবানী উপলদ্ধি করতে ব্যর্থ হতো প্রায়শই।
সমালোচকদের উপহার দর্শকদের অনাগ্রহ তাঁর মনকে সামান্যতম বিচলতি করতে পারল না। তিনি পূর্ণ উদ্যমে নতুন নতুন নাটক নিয়ে চললেন। এরকমই একটা নাটক জ্যন্ডিডার পড়ে তৎকালীন যুগের অভিনেতা উইন্ড হাম বলেছিলেন, ‘এখন এ নাটক কেউ বুঝতে পারবে না। আগামী পঁচিশ বছর পর তারা উপলদ্ধি করবে এই নাটকের গভীর মর্মবাণী।’ নিজের সমন্ধে যা বলেন, ‘সব মহানাট্যকারের নাটকে মন্দ-ভালো চরিত্রের ভিড়। কিন্তু শুধুমাত্র তাদের উপস্থাপিত করাই আমার লক্ষ্য নয়। আমার লক্ষ্য মানুষ কেন ভালো হয়। কেন মন্দ হয়, তার কারণ খুঁজে বের করা। তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক ম্যান অ্যান্ড সুপারম্যান অভিনীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব স্বীকার করে নিল বিংশ শতকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার তিনি।
১৯১৪ সালে ইউরোপ জুড়ে শুরু হয় বিশ্বযুদ্ধ। ইংল্যান্ড জড়িয়ে পড়ে সেই যুদ্ধে। তিনি ছিলেন যুদ্ধের বিপক্ষে। এক আবেদনে লিখলেন, ‘এই যুদ্ধে বিভক্ত হয়ে গেলে ইউরোপের সভ্যতা সংস্কৃতির ভবিষ্যত বলে আর কিছুই থাকবে না।’ কিন্তু তাঁর বাণীকে তখন কেউ গ্রহণ করল না। যুদ্ধের পরই তিনি জোয়ান অব আর্কের জীবন নিয়ে লিখলেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক সেন্ট জোয়ান। সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে থাকল সম্মান আর অভিনন্দন’। এরপর তাঁকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলেন তিনি। বললেন, ‘এখন আমাকে এই পুরস্কার দেওয়া ডুবন্ত মানুষকে তীরে এসে পৌঁছানোর পর লাইফ বেল্ট দেওয়ার মতো’। তিনি আরো বললেন যারা এখনও সাহিত্যের খ্যাতির তীরে এসে উঠতে পারেনি সেই নবীন উদীয়মান সুইডিশ সাহিত্যিকদের জন্য টাকাটা ব্যয় করা হোক।’
- ডা. সাদিয়া আফরিন
- রেসিডেন্ট, এমডি (চাইল্ড সাইকিয়াট্রি) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

