মাদকের আসক্তির মতো জুয়ার আসক্তি একটি মারাত্মক আসক্তি। আগের দিনে কয়েকজন মানুষ মিলে একত্রে জুয়ার আসর বসাত কিন্তু এখন অনলাইনে স্মার্টফোনে বাসায় বসে দূরবর্তী ব্যক্তির সাথে জুয়া খেলা যায়। অনলাইনে পণ্য বিক্রির ওপর সরকারের নজরদারি বাড়ানোর পর এখন ই-কমার্সের আড়ালে ভয়ংকর এক অনলাইন জুয়ার ফাঁদ পেতে বসেছে প্রতারক চক্র। সাম্প্রতিক অপরাধ তদন্ত বিভাগের তথ্যমতে, অপরাধীচক্র ১০০ এর বেশি অ্যাপস ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে সারা দেশে অবৈধ অনলাইন জুয়া কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিছু অসাধু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বেশি লাভের আশায় পণ্য বিক্রি ছেড়ে এসব অপরাধমূলক কর্মে জড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব সাইটে জুয়া পরিচালনা করা হয় তার বেশির ভাগই দেশের বাইরে থেকে নিবন্ধিত ও বিদেশি ব্যক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার ফলে এসব অ্যাপস বা সাইট বন্ধ করা সরকারের জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে দেশি কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল করেছেন এবং অনলাইনে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে চিঠি দিয়েছেন। তবে বিদেশি সাইটগুলোর বিরুদ্ধে তাঁরা তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেন না।
জুয়ার নেশায় কেউ যদি একবার আকৃষ্ট হয়ে যায় তাহলে সেটা মাদকের নেশার মতোই ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বর্তমানে তরুণ সমাজ মোবাইলে ফেসবুক, রীল, টিকটক দেখতে খুব পছন্দ করে। তাছাড়া ইন্সটাগ্রাম, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ-সহ নানারকম সোশ্যাল সাইট ব্যবহার করে থাকেন। প্রতারক চক্র এসব সাইটে বিভিন্ন চটককদার বিজ্ঞাপন ও বিনোদনমূলক কন্টেন্টের মাঝে সুকৌশলে জুয়ার বিজ্ঞাপনগুলো দিয়ে থাকে। তারা প্রথমে গ্রাহকদের বিদেশি কারেনসির মাধ্যমে জুয়া খেলতে প্ররোচিত করে। তারা যে পরিমাণ ডলার ব্যবহার করবে তার দ্বিগুণ বা আরও বেশি ডলার ফেরত দেওয়ার লোভ দেখায়। বিদেশি জুয়াড়িরা অনেক সময় তাদের কার্যক্রম ভালোভাবে পরিচালনা করার সুবিধার্থে স্থানীয় এজেন্ট নিয়োগ করে থাকেন। এসব এজেন্ট জুয়ায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের ভার্চুয়াল চিপস সরবরাহ করেন এবং সেই চিপস দিয়ে তারা জুয়া খেলে। কোনো কোনো এজেন্ট আবার স্থানীয় মুদ্রা টাকা গ্রহণ করে বিদেশে থাকা ব্যক্তির মাধ্যমে ডলার কনভার্ট করে কৌশলে বিদেশে অর্থ পাচার করে থাকেন। ফলে দেশ ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
আরও দেখুন…
- ধূমপান না করেও মৃত্যু: পরোক্ষ ধূমপানে বিশ্বে প্রায় ১৭ লাখ মানুষের মৃত্যু
- শিশুমনে মৃত্যু-শোক : কাটিয়ে উঠবে যেভাবে
মানুষের মন সবসময় কৌতূহলপ্রবণ। তারা যেকোনো উপায়ে তার কৌতূহল নিবৃত্ত করতে চায়। ফলে তারা না বুঝেই অনেক সময় বিপজ্জনক ফাঁদে আটকে পড়ে। প্রতারকচক্র বিজ্ঞাপনে নানারকম কৌশল ব্যবহার করে থাকেন। যেমন কোনো সেলিব্রেটি ফিগার বা সরকারের কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন মিথ্যা বিজ্ঞাপন তৈরি করে। সেখানে বলা হয় সরকারের পক্ষ থেকে এই খেলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে অথবা কোন এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির মুখ থেকে বলানো হচ্ছে যে সে ঘরে বসেই মাত্র তিন মাসের ইনকাম দিয়ে একটি প্রাইভেট কার কিনেছে। কৌতূহলবশত জুয়ার সাইটগুলোয় ক্লিক করেই তরুণ প্রজন্ম প্রলোভনে পড়ে যায়। আর তাদের জন্য সবচেয়ে বড়ো সুবিধা হলো তারা ঘরে বসেই এই জুয়ায় অংশ নিতে পারে। প্রথমে প্রতারক চক্র দুই একবার তাদের কিছু টাকা জিতিয়ে লোভ বাড়িয়ে তোলে। পরবর্তিতে একবারে অনেক টাকা হারিয়ে দেয়। তখন সে সেই লসের টাকা তুলতে মরিয়া হয়ে বারবার টাকা লগ্নি করতে থাকে। এক পর্যায়ে সে সমস্ত সহায় সম্বল হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার এভাবে জুয়ার কবলে পড়ে পথে বসেছে ইতিমধ্যে। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির সব থেকে বড়ো সমস্যা হচ্ছে একবার যখন সে নেশায় পড়ে তখন তার আর ভালোমন্দ হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। অন্যান্য দরকারি কাজের প্রতি তার আর মনোযোগ থাকে না। দৈনন্দিন জীবনে সে উদাসীন হয়ে পড়ে। তার মনের মধ্যে সারাক্ষণ ঘুরপাক খেতে থাকে সে কীভাবে টাকা ম্যানেজ করে করে আবার জুয়ায় বসবে। কখনও সব পুঁজি হারিয়ে বিষণ্ণতায় পড়ে মাদকে জড়িয়ে পড়ে। কারও কারও ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে থাকে।
তাই অনলাইন জুয়া বন্ধে সরকারকে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট জোরালোভাবে কার্যকর করতে হবে। এছাড়া জুয়া বন্ধে বিটিআরসিকেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। জুয়া পরিচালনাকারী ও জুয়ায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। বেকার সমস্যা দূর করতে তরুণ প্রজান্মকে কর্মমুখী শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অভিভাবকদেরকে তাদের সন্তানের প্রতি নজরদারি বাড়াতে হবে। বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জুয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে জ্ঞানদান করতে হবে। আমাদের স্কুল কলেজের পাঠ্যসূচিতে জুয়ার ভয়ংকর প্রভাব সম্পর্কে অধ্যায় রাখা যেতে পারে। সর্বোপরি আনন্ড্রয়েড ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের একটি সুনির্দিষ্ট নিতিমালা প্রণয়ন করা উচিত।
শেষ কথা-অনলাইন গ্যাম্বলিং প্রথমে নিরীহ বিনোদনের মতো মনে হলেও ধীরে ধীরে এটি একটি বিপজ্জনক ফাঁদে পরিণত হতে পারে বিশেষ করে কিশোরদের জন্য। দ্রুত জয়ের উত্তেজনা, সহজলভ্য প্রযুক্তি এবং সামাজিক প্রভাব অনেক সময় তাদের এমন একটি পথে নিয়ে যায় যেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র “খেলা” হিসেবে না দেখে একটি সম্ভাব্য মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, শিক্ষক এবং সমাজ যদি সচেতন হয়, তাহলে অনেক কিশোরকে এই অদৃশ্য ফাঁদ থেকে রক্ষা করা সম্ভব। মনে রাখা দরকার-সত্যিকারের সাফল্য কখনোই ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে না; এটি আসে ধৈর্য, পরিশ্রম এবং সুস্থ মানসিক বিকাশের মাধ্যমে।
• ডা. মো. আব্দুল মতিন
• সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
• মানসিক রোগ বিভাগ রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।
আরো দেখুন…
best psychiatrist in dhaka



