বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে অনলাইন জুয়া বা অনলাইন গ্যাম্বলিং একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে জুয়া খেলাকে পুরুষতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, আধুনিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে নারীদের অংশগ্রহণের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। তবে অনলাইন জুয়ার জগতে নারী ও পুরুষের পছন্দ, উদ্দেশ্য এবং আচরণের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য বিদ্যমান, যা সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ম্যাককর্ম্যাক, শর্টার এবং গ্রিফিথস পরিচালিত ৯৭৫ জন অনলাইন জুয়াড়ির ওপর করা একটি জরিপে দেখা গেছে যে, অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৮১.৬% পুরুষ এবং ১৮.৪% নারী। যদিও পুরুষরা সংখ্যায় বেশি, তবুও গবেষণার তথ্য অনুযায়ী নারীরা অপেক্ষাকৃত কম বয়সে অনলাইন জুয়ায় হাতেখড়ি নিচ্ছেন। এটি প্রথাগত ‘অফলাইন’ জুয়ার চেয়ে আলাদা, যেখানে নারীরা সাধারণত অনেক দেরিতে এই পথে পা বাড়ান।
অনলাইন জুয়ায় অংশগ্রহণের ধরন ও সময়কাল:
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, পুরুষরা দীর্ঘ সময় ধরে অনলাইন জুয়ার সাথে যুক্ত, যেখানে নারীরা তুলনামূলকভাবে নতুন। জরিপে দেখা গেছে, ৪৬.৭% পুরুষ গত পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে জুয়া খেলছেন, অথচ মাত্র ১৪.৩% নারী এত দীর্ঘ সময় ধরে যুক্ত। জুয়া খেলার সেশনের দৈর্ঘ্যের ক্ষেত্রেও বড়ো পার্থক্য লক্ষ করা গেছে। পুরুষরা সাধারণত ১ থেকে ২ ঘণ্টা সময় ব্যয় করলেও, প্রায় ২৫.৬% নারী ১০ মিনিটেরও কম সময় জুয়া খেলেন। নারীরা সচরাচর এক ঘণ্টার কম সময় জুয়া খেলায় ব্যয় করতে পছন্দ করেন।
আরও দেখুন…
পছন্দের গেম এবং প্ল্যাটফর্ম নির্বাচনের কারণ
গবেষণাটি দেখিয়েছে যে, নারী ও পুরুষরা ভিন্ন ভিন্ন অনলাইন কার্যক্রমে আগ্রহী।পুরুষরা সাধারণত কৌশলগত এবং প্রতিযোগিতামূলক গেম যেমন: পোকার, ঘোড়দৌড়, স্পোর্টস বেটিং এবং বেটিং এক্সচেঞ্জে বেশি সক্রিয়।
নারীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে অনলাইন বিঙ্গো এবং স্লট মেশিন। ওয়েবসাইট নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারীরা মূলত বন্ধুদের সুপারিশ এবং বিজ্ঞাপনের দ্বারা প্রভাবিত হন। পুরুষরা ওয়েবসাইটের ব্র্যান্ড নেম এবং বিভিন্ন ফোরামের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে প্ল্যাটফর্ম বেছে নেন।
মনস্তাত্ত্বিক তাড়না এবং আবেগীয় প্রতিক্রিয়া
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জুয়া খেলার পেছনের ভিন্ন ভিন্ন কারণসমূহ। নারীদের অনলাইন জুয়ায় আসার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে একঘেয়েমি (boredom), বিজ্ঞাপনের প্রভাব এবং বিনামূল্যে প্র্যাকটিস গেম খেলার সুবিধা। অন্যদিকে পুরুষরা মূলত সুবিধা, উচ্চ গতির গেমপ্লে, অর্থ জেতা এবং চ্যালেঞ্জের নেশায় জুয়া খেলেন।
জুয়া খেলাকালীন আবেগের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য দেখা যায়। পুরুষরা খেলার সময় রাগ, সুখ বা খিটখিটে মেজাজ অনুভব করলেও, নারীরা উল্লেখযোগ্যভাবে অপরাধবোধ (guilt) এবং লজ্জা (shame) অনুভব করেন। জুয়া সেশন শেষ করার ক্ষেত্রেও ভিন্নতা লক্ষ করা গেছে; নারীরা মূলত একঘেয়েমি অনুভব করলে বা টাকা শেষ হয়ে গেলে খেলা বন্ধ করেন, যেখানে পুরুষরা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছালে বা অনেক টাকা জিতলে খেলা থামান।
নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক প্রভাব
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, অনলাইন জুয়ার ব্যাপারে নারীদের মনোভাব পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি নেতিবাচক। নারীরা জালিয়াতি (fraud), ব্যক্তিগত তথ্য চুরি এবং গেমগুলো কারচুপি হওয়ার বিষয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকেন। এছাড়া নারীরা মনে করেন অনলাইন জুয়া অফলাইন জুয়ার চেয়ে বেশি আসক্তিমূলক এবং শিশুদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ।
পরিশেষে, গবেষণার ফলাফলটি এটিই নিশ্চিত করে যে অনলাইন জুয়ার ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদে অংশগ্রহণকারীদের মানসিকতা ও আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই ফলাফলগুলো স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা লিঙ্গভেদে ভিন্ন ভিন্ন সচেতনতামূলক ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন।
রেফারেন্স-
https://link.springer.com/arti-cle/10.1007/s10899-012-9341-х
- ডা. অনন্যা ভট্টাচার্য্য
ফেইজ বি রেসিডেন্ট, এমডি (সাইকিয়াট্রি), বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।


