আমরা সবসময় সুদূর ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকি—ভাবি কোনো একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। আগামীকাল কী হবে, তা নিয়ে আমরা রঙিন স্বপ্ন বুনি। যৌবনে আমি নিজেও এমনটাই করতাম। আমার কল্পনায় ছিল একটি নিখুঁত ঘর, রোমাঞ্চকর ক্যারিয়ার, একজন প্রেমময় স্বামী আর একঝাঁক চমৎকার সন্তান। বাস্তবে এর অনেক কিছুই আমি পেয়েছি। আমার সন্তানরা চমৎকার, যদিও প্রতিটি মানুষের মতো তাদেরও কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে। আমার একজন স্নেহময় স্বামী আছেন, আর একজন চমৎকার প্রাক্তন স্বামীও। আমার পেশাটিও বেশ অর্থপূর্ণ, যদিও আমি সেই স্বপ্নের ‘সুপার এজেন্ট স্পাই’ হতে পারিনি।
আসলে আমাদের মন সারাক্ষণ অতীত আর ভবিষ্যতে ঘুরে বেড়ায়। সবাই এটি করে, তবে কেউ কেউ একটু বেশিই করে। বেশিরভাগ সময় আমরা এমন সব বিষয় নিয়ে ভাবি যা হয়তো ঘটেছে বা ঘটতে পারে—যা আমাদের মনঃপূত নয়। ফলে মন একঘেয়ে চিন্তার জালে আটকে যায় এবং সেখান থেকে বের হতে পারে না।
মস্তিষ্ক কেন খারাপ জিনিসের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট? ‘জার্নাল অফ পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি’-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষকে যখন রোলারকোস্টারের মতো ইতিবাচক বা হেয়ার ড্রায়ারের মতো নিরপেক্ষ ছবির পাশাপাশি একটি বন্দুকের ছবি দেখানো হয়, তখন মস্তিষ্ক বন্দুকের ছবিটি দেখেই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানী পল রোজিন এবং এডওয়ার্ড রয়জম্যানের মতে, আমাদের মস্তিষ্ক জন্মগতভাবেই খারাপ জিনিসের প্রতি কিছুটা পক্ষপাতদুষ্ট। মানুষের সাথে তিক্ত অভিজ্ঞতা বা কোনো অস্বস্তিকর ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে শক্তভাবে গেঁথে থাকে। সংবাদমাধ্যমগুলোও এই সুযোগটি নেয়। তারা নেতিবাচক শিরোনাম প্রচার করে কারণ আমরা অবচেতনভাবেই খারাপ খবরের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হই। এতে তাদের রেটিং বাড়ে। মূলত, আদিমকাল থেকেই টিকে থাকার তাগিদে আমাদের মস্তিষ্ক বিপদ বা খারাপ সংবাদের প্রতি বেশি সতর্ক থাকতে অভ্যস্ত।
সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব এই নেতিবাচক প্রবণতা আমাদের সম্পর্কেরও ক্ষতি করে। যেমন, নতুন কারো সাথে দেখা হলে আমরা তার ভালো গুণের চেয়ে ছোটখাটো ত্রুটিগুলো আগে খুঁজে বের করি—যাতে অবচেতনভাবে আমরা নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারি। এমনকি দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সামান্য সমালোচনা শুনলে আমরা দ্রুত রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ি।
মানসিক পক্ষপাতের কয়েকটি ধরণ: স্মৃতির প্রাধান্য: আমরা ভালো কথার চেয়ে বন্ধুর বলা কোনো একটি কষ্টদায়ক মন্তব্য বেশি মনে রাখি। আতঙ্ক বাড়িয়ে তোলা: ছোট কোনো শারীরিক সমস্যা বা মেডিকেল প্রসিডিউর নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমরা সেটিকে বড় কোনো বিপর্যয় হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করি। ভুলের পুনরাবৃত্তি: গত সপ্তাহের কোনো একটি ছোট সামাজিক ভুল বা বেফাঁস কথা (faux pas) আমরা বারবার মনে করে লজ্জিত হই।
কীভাবে এই চক্র থেকে বের হওয়া যায়? ১. সচেতনতা: যখনই মন খারাপের দিকে যাবে, নিজেকে মনে করিয়ে দিন যে এটি আপনার মস্তিষ্কের একটি পুরনো অভ্যাস মাত্র। ২. আবেগীয় ভারসাম্য: সমগুরুত্বের দুটি স্মৃতির মধ্যে অপ্রীতিকর স্মৃতিটি বেশি শক্তিশালী মনে হলেও, সচেতনভাবে সেটিকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করতে হবে। ৩. দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণ: কোনো বড় ঘটনার আগে আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক, তবে সচেতন থাকলে এই উদ্বেগকে একটি সীমার মধ্যে রাখা সম্ভব।
মূলত, নেতিবাচকতা ইতিবাচকতার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। আমাদের মস্তিষ্ক এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে আমরা বিপদ বা হুমকিগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে নিরাপদ থাকতে পারি। তবে বর্তমান সময়ে সুস্থ থাকার জন্য আমাদের এই ‘নেতিবাচকতার আসক্তি’ কাটিয়ে ওঠা জরুরি।
মূল নিবন্ধ: ”How to Stop Obsessing Over the Bad Stuff”- Psychology Today (January 2026)
References
Adapted from How to Be Less Miserable. Blackstone Publishing, 2025.
Negative information weighs more heavily on the brain: The negativity bias in evaluative categorizations. Journal of Personality and Social Psychology. T. A. Ito et al.
Negativity Bias, Negativity Dominance, and Contagion. Personality and Social Psychology Review. 2001. P. Rozin, E. Royzman
Tierney, J., & Baumeister, R.F. (2019). The Power of Bad: How the negativity effect rules us — and how we can rule it. New York: Penguin.
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও দেখুন-



