আজকের পৃথিবী আগের চেয়ে অনেক বেশি সংযুক্ত। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমরা একে অপরের খুব কাছে থাকার কথা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, মানুষ এখন ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ‘বিচ্ছিন্ন’ বা ‘ডিসকানেক্টেড’ অনুভব করছে। কেন আমরা এই শূন্যতা অনুভব করি? মনোবিজ্ঞানীরা এর পেছনে কিছু গভীর কারণ খুঁজে পেয়েছেন।
হাজারো মানুষের ভিড়েও কেন আমাদের এতো একা লাগে?
১. ডিজিটাল সংযোগ বনাম প্রকৃত ঘনিষ্ঠতা
আমরা সারাদিন স্ক্রিনে লাইক, কমেন্ট বা টেক্সট বিনিময়ে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু এগুলো কখনোই মানুষের চোখের ভাষা বা সরাসরি স্পর্শের বিকল্প হতে পারে না। আমরা অনলাইনে অনেক মানুষকে চিনি, কিন্তু বিপদে বা একাকীত্বে পাশে পাওয়ার মতো মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এই ‘ডিজিটাল মিথস্ক্রিয়া’ আমাদের সামাজিক ক্ষুধা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
২. নিজেদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া (Self-disconnection)
আমরা যখন বাইরের জগতের কোলাহল আর অন্যের জীবনের চাকচিক্য দেখতে ব্যস্ত থাকি, তখন ধীরে ধীরে আমরা নিজেদের প্রকৃত ইচ্ছা, অনুভূতি এবং ভালো লাগা থেকে দূরে সরে যাই। সাইকোলজিতে একে বলা হয় ‘অ্যালিয়েনেশন’। যখন একজন মানুষ নিজের সাথে সৎ থাকতে পারে না বা নিজের মনের কথা শুনতে পায় না, তখন সে বাইরের পৃথিবীর সাথেও দূরত্ব অনুভব করে।
৩. জীবনযাত্রার অতি-ব্যস্ততা
আধুনিক জীবন অনেকটা ইঁদুর দৌড়ের মতো। আমাদের কাছে ক্যারিয়ার, অর্থ আর সাফল্যের পেছনে ছোটার সময় আছে, কিন্তু প্রিয়জনের পাশে বসে শান্তিতে কথা বলার বা প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়ার সময় নেই। এই নিরন্তর কর্মব্যস্ততা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে সবসময় উত্তেজিত রাখে, যা আমাদের সামাজিক সম্পর্কের গভীরতাকে নষ্ট করে দিচ্ছে।
৪. তুলনার সংস্কৃতি ও হীনম্মন্যতা
সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের ‘পারফেক্ট’ জীবন দেখার ফলে আমরা অবচেতনভাবেই নিজের জীবনের সাথে তুলনা করতে শুরু করি। এই তুলনা আমাদের মনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি করে। ফলে আমরা অন্যদের সাথে মিশতে ভয় পাই বা মনে করি কেউ আমাদের বুঝতে পারবে না। এই দেয়ালটিই আমাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
এই বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তির উপায় কী?
বিচ্ছিন্নতা কোনো স্থায়ী সমস্যা নয়, বরং এটি একটি সিগন্যাল যে আমাদের জীবনে পরিবর্তন প্রয়োজন।
-
ডিজিটাল ডিটক্স: দিনের কিছুটা সময় ফোন সরিয়ে রাখুন এবং প্রিয়জনের সাথে সরাসরি কথা বলুন।
-
আত্ম-জিজ্ঞাসা: প্রতিদিন অন্তত ৫-১০ মিনিট নিরিবিলি বসে নিজের মনের অবস্থা বুঝুন। আপনি আসলে কেমন আছেন তা নিজেকে জিজ্ঞেস করুন।
-
ছোট উদ্যোগে বড় ফল: কেবল চেনা মানুষের সাথে নয়, মাঝেমধ্যে প্রতিবেশীদের সাথে সৌজন্য বিনিময় বা কোনো কমিউনিটি কাজে অংশ নেওয়া সামাজিক বন্ধন মজবুত করে।
-
সহমর্মিতা চর্চা: অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং বোঝার চেষ্টা করা সম্পর্কের গভীরতা বাড়ায়।
মানুষ সামাজিক জীব। আমরা যতোই প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হই না কেন, আমাদের আত্মার প্রশান্তির জন্য একে অপরের প্রকৃত সান্নিধ্য প্রয়োজন। তাই যান্ত্রিকতাকে ছাপিয়ে আসুন মানুষের সাথে মানুষের গভীর সম্পর্ক তৈরিতে আরও মনযোগী হই।
অনুবাদ ও সম্পাদনা: আনিছুজ্জামান রুমি
মূল নিবন্ধ: ”Why So Many People Feel Disconnected”- Psychology Today (December 2025)
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও দেখুন-

