‘‘যাঁরা আকাশ ছুঁতে চান, তাঁরা স্বপ্নও দেখেন ভুবন জোড়া। আর যারা আত্মসুখে ভোগেন, তারা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত সবসময়।’’তাই তো পৃথিবীর বুকে এমন কিছু মানুষ আছেন যার চিন্তা ও কর্মের মাধ্যমে পৃথিবীতে অমর। এমনই একজন মানুষ যিনি আফ্রিকান—আমেরিকানদের স্বাধীনতার মুক্তিকামী বিশ্ব নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, যিনি বর্ণবাদী কৌম্য— বিরোধের বিরুদ্ধে সারাজীবন জুড়ে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন, যিনি স্বপ্ন দেখতেন মানবতার, খুঁজতেন মুক্তির পদ্ম,বলতেন ধর্ম—বর্ণ কখনো মানুষের বাধা হতে পারে না, বাধা হয় মনের সংকীর্ণতার।
১৯২১ সালের ১৫ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টা শহরে এক কৃষ্ণার্জ যাজক পরিবারে জন্ম নেন এই কিংবদন্তি নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। তাঁর পিতা মার্টিন লুথার কিং সিনিয়র, মাতা ছিলেন আলবার্ট উইলিয়ামস কিং এবং স্ত্রী কোরেটা স্কট। অনেকে বলে যাবেন জর্জ ওয়াশিংটনকে স্বাধীনতার জনক বলা হয়, আব্রাহাম লিংকনকে গণতন্ত্রের জনক বলা হয়ে থাকে, তবে মার্কিনীদের এই দেশকে যিনি সভ্যতার রূপ দিয়েছেন তিনি মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। মার্টিন লুথার কিং সিনিয়র একজন ধর্মযাজক ও নাগরিক আন্দোলনের নেতা ছিলেন। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে মাত্র ছয় বছর বয়সে বর্ণবাদের শিকার হতে হয় তারই বাবার এক বন্ধু এক শেতাঙ্গের দ্বারা। তিনি কৃষ্ণাঙ্গ হবার কারণে তার শেতাঙ্গ বন্ধুর ছেলের সাথে তাকে খেলাধুলা করতে নিষেধ করেন।
উনি এই বর্ণবাদী বৈষম্য মেনে নিতে পারেননি। তাই তার মনস্তত্ত্বে বাস করত মুক্তির সোনালী স্বপ্ন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ রাজ্যই শেতাঙ্গদের জন্য বাস সার্ভিস সংরক্ষিত ছিল। কৃষ্ণাঙ্গদের বাসের সামনে বসার অনুমতি ছিল শেতাঙ্গরা বসার পর কোনো সিট ফাঁকা থাকলে। তবেই বসতে পারতেন কৃষ্ণাঙ্গ যাত্রীরা। ভরা বাসে সিট ছেড়ে শেতাঙ্গদের বসতে দিত কৃষ্ণাঙ্গরা, আর এটাই ছিল নিয়ম। কিন্তু ইতিহাস বদলে দিল রোজা পার্কস নামের এক কৃষষ্ণাঙ্গ নারীর প্রতিবাদ। একদিন ভরা বাসে এক শেতাঙ্গ যাত্রীকে সিট ছেড়ে দিতে অস্বীকার করলেন তিনি। ফলে তাকে দশ ডলার জরিমানা করা হলো এই ঘটনার প্রতিবাদে গর্জে ওঠে এক তরুণের কণ্ঠ, তিনি মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র।
শুরু হয় অভূতপূর্ব এক আন্দোলনের, তার নেতৃত্বে সাড়া দিয়ে টানা ৩৮৫ দিন বাস সার্ভিস বর্জন করে স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ অধিবাসীরা। বয়কটের মুখে শেষ পর্যন্ত যানবাহনে বর্ণ বৈষম্য নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এট আন্দোলন সল্ট গো সারি বাস বয়কট হিসেবে আন্দোলন হিসেবে পরিচিতি পায়। পরবর্তিতে ১৯৫৫ সালে সাউদার্ন ক্রিশ্চিয়ান লিডার শিপ কনফারেন্স (ঝঈখঈ) এর প্রথম সভাপতি হন এবং আলবানি ও জর্জিয়ার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
গোটা আমেরিকা জুড়ে বিদ্বেষের জোয়ার উঠতে থাকে। আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে এক নেতার নাম, তিনি হলেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র।
১৯৬৩ সালে সরকারের নেওয়া বৈষম্যমূলক আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ঘোষণা করেন। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের শেতাঙ্গদের সমান অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে হবে, কৃষ্ণাঙ্গদের সর্বত্র প্রবেশাধিকার থাকতে হবে এবং শিশু শ্রম বন্ধ করতে হবে। এমনি এক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশে অ্যালবামার পুলিশ সমবেত জনতার উপর দমন—মূলক নিপীড়ন চালায়। এরপর তিনি ঠিক করেন, দেশ জুড়ে শুরু করবেন ফ্রিডম মার্ক। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুরু হয় ওয়াশিংটন অভিমুখে পদযাত্রা। ১৯৬০ সালের ২৭ আগস্ট ওয়াশিংটনের লিঙ্কন মেমোরিয়ালে সমবেত হয় প্রায় আড়াই লাখের বেশি মানুষ।
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেন, ‘‘আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন সব উপত্যকা উত্তীর্ণ হবে, সব পাহাড় আর পর্বত হবে মসৃণ, আঁকা—বাঁকা জায়গায়গুলো সমান হবে এবং ঈশ্বরের জয় উদ্ভাসিত হবে, আমি জানি, তোমরা অনেকে এসেছ দূর—দূরান্ত থেকে। কেও জেনের কুঠরি থেকে, কেউ পুলিশের টর্চার সেল থেকে। তোমরা যার যার ঘরে ফিরে যাও। কিন্তু কাদা পানিতে ডুব দিয়ে থেকো না। হয়ত আজ বা আগামীকাল আমাদের জন্য সংকটময় হবে। তবুও আমি স্বপ্ন দেখি, এই স্বপ্ন আছে আমেরিকার অস্তিত্বে। আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন এই জাতি জাগ্রত হবে এবং মানুষের বিশ্বাসের মূল্যায়ন করবে, সব মানুষ জন্মসূত্রে সমান।’’
তিনি সারাজীবন যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে গেছেন। তারই স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৬৪ সালে সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। কিন্তু নিয়তির বাস্তব পরিণতিতে ১৯৬৮ সালে আততায়ীর গুলিতে এই মহামানবের মৃত্যু হয়। মাত্র ৩৯ বছরের এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে তিনি একটি যুগের সৃষ্টি করেছেন। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ জাতিকে দিয়েছেন মুক্তির স্বাদ। তার আদর্শ, ভজনে ও বিভিন্ন উক্তি এখনো বিশ্ব জুড়ে অনুপ্রেরণা জোগায়। ‘‘যদি উড়তে না পার, তবে দৌড়াও; যদি দৌড়াতে না পারো, তবে হাঁটো; হাঁটতে না পারলে হামাগুড়ি দাও, তবে তুমি যাই করো না কেন সামনের দিকে এগিয়ে চল।’মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র।
এমডি -সাইকিয়াট্রি (বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়), মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও দেখুন-



