ভুলে যাওয়া অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত আবার অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত। মনে করার চেষ্টা করে দেখেন তো শেষবার তীব্র দাঁত ব্যথার অনুভূতিটা কেমন ছিল, অথবা খুব প্রিয় কিছু হারিয়ে ফেলার পর তাৎক্ষণিক কি প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলেন! সেই অনুভূতিটা কখনোই একই তীব্রতায় স্মরণ করা যায় না, তাই না? এক অর্থে এটা কিন্তু আমাদের জন্য সৃষ্টিকর্তার উপহার, আর এই ভুলে যাওয়াটা কাঙ্ক্ষিতও।
অন্যদিকে যদি এমন হয়, খুব জরুরি প্রয়োজন কিন্তু আলমারির চাবিটা কোথায় রেখেছেন মনেই করতে পারছেন না, অথবা মনে করতে পারছেন না ক্রেডিট কার্ডের পিন নাম্বার! এমন টুকটাক ভুলও হতেই পারে, কিন্তু সেটা নিয়মিত আর ক্রমবর্ধমান হলেই বিপদ। স্বাভাবিকভাবে বয়সের সাথে সাথে আমাদের স্মৃতিশক্তি এমনিতেই কিছুটা কমে আসে তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমন ভুলে যাওয়াটা মানসিক রোগের লক্ষণও বটে। আসুন জেনে নেই কী কী মানসিক রোগে স্মৃতিশক্তির সমস্যা হতে পারে। মানসিক রোগের কারণে ভুলে যাওয়া-Psychogenic Memory Dysfunction, মানে ভুলে যাওয়ার সমস্যা যেটা কিনা আবেগজনিত কারণে, কোনো শারীরিক সমস্যার কারণে নয়, তাকে Functional Amnesia বলা হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত অতিমাত্রার মানসিক চাপ, বা নিকটজনের সাথে দ্বন্দ্বই অন্তর্নিহিত কারণ হয়ে থাকে।
বিষণ্ণতা (Depressive Disorders), উদ্বেগজনিত রোগ (Anxiety disorders), শুচিবায়ু (Obscessive compulsive disorder) এসব রোগীরা প্রায় সময়ই স্মরণশক্তির সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে আসেন। অনেক সময় Somatic Symptom disorder বা Conversion disorder এর পেশেন্টরা তাদের শারীরিক উপসর্গ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকে যে মনোযোগের অভাবে তাদের স্মরণশক্তির সমস্যা হচ্ছে বলে মনে করেন।
আসলে কোনো কিছু মনে রাখার প্রথম ধাপই হচ্ছে রেজিস্ট্রেশন, মানে ঘটনাটা মনে গেঁথে নেয়া, তারপর আসে রিকল মানে স্মৃতি থেকে সেটাকে তুলে আনা। যদি আমরা আনমনা থাকি, তাহলে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াটা বাধাগ্রস্ত হয়, আর তখনই চাইলেই সহজে আমরা কিছু মনে করতে পারি না।
মনোযোগের অভাব হয় নেশাগ্রস্তদের মধ্যেও, সেটা হোক ড্রাগের নেশা বা ইন্টারনেটের। বিশেষ করে ছোটো বাচ্চারা, কিশোর-কিশোরীরা, মোবাইল গেম বা ইন্টারনেট আসক্তিতে পড়ে গেলে, সারাক্ষণ তাদের মাথায় সেই সম্পর্কিত চিন্তা আসতে থাকে, এবং কখন কীভাবে আবার মোবাইল হাতে পাওয়া যায় সেই পরিকল্পনা করতে থাকে। কাজেই তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়, বাবা-মা এমন পরিস্থিতিকে স্মরণশক্তির সমস্যা হিসেবে ডাক্তার বা সাইকলজিস্টের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন।
ঠিক একই বয়সি কিছু বাচ্চাদেরকে তাদের বাবা-মায়েরা নিয়ে আসতে পারেন স্মরণশক্তির সমস্যার কারণে দিন দিন পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে এই বলে, হয়ত তাদের তেমন কোনো মোবাইলের নেশাও নেই। এসব ক্ষেত্রে ভালোমতো সমস্যার ইতিহাস জেনে নিলে বোঝা যাবে সমস্যাটার মূল কারণ বাচ্চার বুদ্ধিমত্তার সমস্যা বা Intellectual Disability.
কোনো কোনো সময় অনেক আতঙ্কের বা কষ্টের সময়ের কিছু স্মৃতি মন থেকে মুছে যায়, এটা আমাদের মস্তিষ্কের একটা ডিফেন্স মেকানিজম, মানে অবচেতনভাবে কষ্টটা কম রাখার প্রচেষ্টা।
এরকম হতে পারে PTSD বা ASD রোগীদের। আবার Dissociative Disorder-এ এমন হয়ে থাকে। কোনো একটা বিশেষ মানসিক চাপের মুখোমুখি হলে কারো কারো ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যাদের বুদ্ধিমত্তা বা পরিচিত জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, এবং সেই সময় কী বলছে বা করছে তা পরে তাদের মনে থাকে না। ব্যক্তিতের সমস্যা আছে তাদের কিছু সময়ের জন্য স্মরণশক্তির সমস্যা হয়। তারা কিছুটা সময় নিজের এমনকি কিছুক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিত্বও পরিবর্তন হতে পারে, যেটা পুনরাবস্থায় ফিরে আসলে মনে থাকে না তাদের।
এছাড়া ঘুমের সমস্যা, কোনো কোনো ঔষধের প্রভাবও স্মরণশক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। অনেক সময় কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবেই স্মরণশক্তির সমস্যার কথা বলতে পারে, যেটা তাদের নির্দিষ্ট কিছু সুবিধা পেতে হয়ত সাহায্য করবে। ইচ্ছাকৃত হলে একে মেলিঙ্গারিং বলে।
কিছু শারীরিক রোগ আছে যেসব ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যাও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এই সব রোগের চিকিৎসা মনোরোগ বিশেষজ্ঞরাও দিয়ে থাকেন। স্মরণশক্তির সমস্যা হয় এমন আরও কিছু রোগ তাই এই আলোচনায় আসতে পারে।
মৃগী রোগ
মৃগী রোগ বা Epilepsy একটি দীর্ঘ মেয়াদি মস্তিষ্কের রোগ। একেকবার খিচুনি হওয়ার পর এটা মস্তিষ্কের কিছুটা ক্ষতি করে। পরবর্তিতে এর প্রভাব বুদ্ধিমত্তার উপরও পড়ে। সাথে দেখা দিতে পারে বিষণ্ণতা বা উদ্বেগ। সব কিছু মিলে স্মরণশক্তির সমস্যা করতে পারে, এবং ভুলে যাওয়ার উপসর্গ নিয়ে আসতে পারেন রোগীর অভিভাবক।
স্মৃতিভ্রংশ রোগ বা Dementia এক কথায় বলতে গেলে এটা বয়সজনিত কারণে
মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাওয়া বা ক্রনিক ব্রেইন ফেইলিউর। আমরা যেমন শুনে থাকি হার্ট ফেইলিউর, কিডনি ফেইলিউর অনেকটা তেমনই। Alzheimer Disease ডিমেন্সিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ, অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে পারকিন্সন্স ডিজিস, স্ট্রোক-সহ আরও কিছু রোগ।
স্ট্রোকের কারণে যে স্মৃতিশক্তির সমস্যা হয় তাকে বলে ভাস্কুলার ডিমেন্সিয়া। ডিমেন্সেয়ায় প্রধানত এবং প্রথমত সমস্যা হয় নতুন করে কিছু মনে রাখার প্রক্রিয়ায়, পুরোনো অনেক কিছুই হয়ত মনে থাকে ঠিকই। তাই রোগীর আত্মীয়-স্বজনকে স্মরণশক্তির কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, “না, না ডাক্তার সাহেব, উনার স্মরণশক্তি তো খুবই ভালো, ৫০ বছর আগের কথাও মনে আছে, সে সবই বলতে থাকেন বারবার”। তবে প্রশ্নটা সঠিকভাবে করলে বের হয়ে আসে আসল তথ্য। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, “উনি কি টুকটাক, ছোটোখাটো জিনিস ভুলে যান, যেমন দিন-তারিখ, কোথায় কি রাখলাম এই সব?” তখন আসল তথ্যটি বের হয়ে আসে, “জ্বি জ্বি, এসব তো ভুলেই যান, আর ভুলে গিয়ে অন্যকে দোষ দেয়া, সন্দেহ করা এসবও করেন।” যত দিন গড়ায় স্মরণশক্তি পাশাপাশি পরিবর্তন আসতে থাকে তার স্বভাব-চরিত্রসহ আরও অনেক কিছুতে। এই রোগ সম্পর্কে আরও অনেক কিছুই বলা যাবে অন্য লেখায়।
অবশেষে বলি, স্মৃতিতে থাকুক পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য, আর ভুলে যাই যা কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত, যা কিছু কষ্টের, ক্ষমা করে দেই সবাইকে। তবে ভুলে যাওয়ার রোগ থাকুক অনেক অনেক দূরে।
- ডা. নাসিম জাহান
- সহযোগী অধ্যাপক, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা

