ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মাদকাসক্তি জটিলতা বাড়ায়

0
26
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে মাদকাসক্তি জটিলতা বাড়ায়
শেয়ার করুন, সাথে থাকুন। সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে।

জাফর আহমেদ ব্যাংকের উচ্চপদস্থ চাকরিতে আছেন প্রায় ২৫ বছরেরও বেশি। কাজের চাপে নিজেকে সামলাতে সিগারেট খান দিনে প্রায় এক প্যাকেট করে। সেইসঙ্গে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মাঝে মাঝে মদ্যপান করেন। তার মদ্যপানের অভ্যাস পরিবারের কেউ জানে না। স্ত্রী ডাক্তার, শিশুবিশেষজ্ঞ। একমাত্র ছেলে বুয়েটে ইলেকট্রনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে শরীর খারাপ হলে ঘরে সুগার ও প্রেসার মাপেন। ইদানীং তিন বেলা খুব হাই ডোজে ইনসুলিন নেয়ার পরেও সুগার নিয়ন্ত্রণে আসছে না। মাঝে মাঝে হাত পা ঝিম ধরে, শরীরে শক্তি পান না, মেজাজও খিটখিটে হয়ে গেছে। কয়েকদিন ধরে প্রস্রাব বন্ধ। ডাক্তারকে দেখানোর পরে ধরা পড়ল, সুগার নিয়ন্ত্রণে না থাকার জন্য এমনটা হচ্ছে। ডাক্তাররাও ভেবে পাচ্ছেন না এত ওষুধ দেয়ার পরও কেন সুগার নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এদিকে কিডনি বিকল। ডায়ালাইসিস করছেন প্রতি সপ্তাহে দুই বার। আবার পেটে পানি জমেছে। আলট্রাসোনোগ্রাম করে দেখা গেল Liver Cirrosis due to Alchohol. জানা গেল, জাফর সাহেব নিয়মিত অ্যালকোহল নিচ্ছেন আর তাতেই এ বিপত্তি।

২০১৮ সালে যুক্তরাজ্যের University of Greenwich এর বিজ্ঞানী Omorogreva তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ৪ জন গবেষক নিয়ে ২০০৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মাদকের সঙ্গে ডায়াবেটিসে ভোগা মানুষদের মধ্যে অনেকগুলো গবেষণার রিপোর্ট অনুযায়ী একটা মিল খুঁজে পান। তিনি দেখলেন, শুধু অ্যালকোহল নয় গাঁজা, হেরোইন, প্যাথিড্রিন এমনকি সিগারেটের সাথে সুগার বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা আছে। কারণ মাদক গ্রহণে মিষ্টি খাবার প্রবণতা বাড়ে কিন্তু ইনসুলিনের রিসেপ্টরের সেন্সিটিভিটি কমে যায় তখন ইনসুলিন দেয়ার পরে তেমন কাজ করে না। অ্যালকোহল নিতে থাকলে

  • হঠাৎ সুগার কমে যাবার প্রবণতা থেকে কেউ হাইপোগ্লেসিমিক কোমাতে চলে যেতে পারে।
  • ওজন কমতে থাকে।
  • প্রেসার নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ার প্রবণতা থেকে ব্রেইন স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।

সমাধান: তাই ডায়াবেটিস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এবং ডাক্তার স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় অনমতি না দিলে অ্যালকোহল গ্রহণ করা উচিত নয়। মনে রাখতে হবে এতে ডায়াবেটিস কমতে বা বাড়তে পারে। যারা একেবারেই অ্যালকোহল ছাড়তে পারছেন না তাদের জন্য-

  • ১ পেগের বেশি মহিলাদের ও পুরুষদের ২ পেগের বেশি গ্রহণ না করা। গ্রহণ করলেও low calorie alcohol drinks গ্রহণ করতে হবে।
  • নিয়মিত ফলো-আপে থাকতে হবে।
  • অ্যালকোহল জাতীয় দ্রব্য নেয়ার আগে ম্যাক্স নেয়া। তাতে ব্লাড সুগার ফল করার ঝুঁকি কমে যাবে।

ধূমপান

CDC এর গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ধূমপান করেন তাদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ৩০-৪০% বেশি। ধমূপান করলে ডায়াবেটিস রোগীদের সুগার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ওষুধ বেশি প্রয়োজন হয়। কারণ ধূমপানের কারণে ইনসুলিন কম বের হয় ও কম কাজ করে।

সমাধান:

  • ধূমপান ছেড়ে দেয়া
  • ছেড়ে দেয়ার জন্য সাইকিয়াট্রিস্ট ও সাইকোলজিস্টদের সাহায্য নেয়া
  • উইথড্রয়াল ইফেক্ট হলে দ্রুত সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে দেখা করা

গাঁজা

Canabis বা গাঁজা সেবনে ডায়াবেটিক রোগীর সুগার কমে Hypoglycemic হওয়ার প্রবণতা থাকে। কারণ গাঁজা ইনসুলিনের রিসেপ্টরকে আরো বেশি সেনসিটিভ করে।

সমাধান:

গাঁজা সেবন রোগীদের সন্দেহ প্রবণতা বাড়ায় সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা নষ্ট করে দেয়। তাই দ্রুত একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে দেখা করে রোগী ও পরিবারের কাউন্সেলিং করতে হবে। মাদকের উইথড্রয়ালের জন্য ওষুধ খেতে হবে। মাদক নেয়া বন্ধ করতে হবে।

Opioid মাদক

Health and medicine Alternative Therapies এ প্রকাশিত জার্নালের গবেষণা মতে, Opioid মরফিন, প্যাথেড্রিন জাতীয় মাদক সেবনে একজন ডায়াবেটিক রোগীর সুগারের লেভেল বাড়ে। এতে একজন ডায়াবেটিক রোগীর করোনারী আর্টারি রোগে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ে। সঙ্গে বাড়ে স্ট্রোক, কিডনির রোগ, প্রেসার বৃদ্ধি ও চোখের সমস্যার প্রবণতা।

সমাধান:

অবশ্যই রোগীকে সাইকিয়াট্রিস্টের অধীনে রিহ্যাবে রেখে চিকিৎসা করতে হবে কারণ Opioid মাদকের উইথড্রয়াল অনেক বেশি যা বাসায় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। রোগীর পরিবারকে এ ব্যাপারে সচেতন করা ও সাইকোলজিস্টের অধীনে কাউন্সেলিং সুবিধা নিতে হবে।

ইয়াবা

ইয়াবা বা Amphetamine জাতীয় stimulant মাদক: এসব মাদক গ্রহণে খাবারের রুচি কমে যায়, পুষ্টিহীনতা ও ওজন হ্রাস পায়। সঙ্গে ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালেন্স হয় যা ডায়াবেটিক রোগীর সুগার হঠাৎ করেই কমিয়ে Hypoglycemic shock করতে পারে যাতে মৃত্যুও হতে পারে।

সমাধান: ইয়াবা নিয়ে ইনসুলিন নেয়া যাবে না। দ্রুত ইয়াবা সেবন বন্ধ করতে হবে। উইথড্রয়াল থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওষুধ সেবন করতে হবে। প্রয়োজনে রিহ্যাবে ভর্তি করতে হবে। সঙ্গে অবশ্যই মাদকমুক্ত থাকার জন্য সাইকোলজিস্টের কাছে কাউন্সেলিং করতে হবে।

 

ডা. চিরঞ্জীব বিশ্বাস

সহকারী অধ্যাপক, উত্তরা মহিলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।

সূত্রঃ মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ৪র্থ বর্ষ, ৬ষ্ঠ  সংখ্যায় প্রকাশিত।

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে  

 

“মনের খবর” ম্যাগাজিন পেতে কল করুন ০১৮ ৬৫ ৪৬ ৬৫ ৯৪
more

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here