মায়ের সঙ্গে বন্ধন সন্তানের বিকাশে ভূমিকা রাখে

0
68
মায়ের সঙ্গে বন্ধন সন্তানের বিকাশে ভূমিকা রাখে

মায়ের মতো আপন কেউ নেই। মা আমাদের গর্ভে ধারণ করেন, স্তন্য দান করেন। যখন চরম অসহায় অবস্থায় পৃথিবীতে আসি তখন তিনিই আদর-যত্ন দিয়ে

তিলে তিলে সন্তানকে স্বাবলম্বী করে তোলেন শারীরিক ও মানসিকভাবে। তাই মায়ের সঙ্গে সন্তানের বন্ধন থাকে স্বাভাবিকভাবেই অটুট। মায়ের সঙ্গে সন্তানের সুস্থ স্বাভাবিক বন্ধন সন্তানকে আবেগীয়ভাবে শক্তিশালী করে গড়ে তোলে, পাশাপাশি তাদের আচরণগত সমস্যাও অনেক কম হয়। মা সন্তানের বন্ধন সন্তানকে নিরাপত্তা দান করে এবং এর ফলে সন্তান হয় আত্মবিশ্বাসী। মনোবিজ্ঞানী Bowlby এর মতে, মা সন্তানের নিরাপদ বন্ধন সন্তানের মস্তিষ্ক বিকাশে, তার মানসিক ও সামাজিক বিকাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাঁর মতে, জন্মের পর প্রতিটি শিশুরই

প্রয়োজন হয় মা বা মাতৃস্থানীয় কারো সঙ্গে নিবিড় বন্ধনের। তা না হলে স্বাভাবিক মানসিক ও সামাজিক বিকাশ ব্যাহত হয়। সন্তান নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে মানুষ ও পৃথিবীর প্রতি বিশ্বাসে ঘাটতি দেখা যায়। সন্তানের আত্মবিশ্বাস কমে যায়। তার মনে হয়, এই পৃথিবীতে সে নিরাপদ নয়। এই অনুভূতি শুরু হয়ে যেতে পারে শিশুর ভূমিষ্ট হওয়ার পর থেকে এক বছরের মধ্যেই। ভূমিষ্ট হওয়ার পর থেকে এক বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানের সঙ্গে নিবিড় বন্ধনের ঘাটতি থেকে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে। নিবিড় বন্ধন সন্তানকে তার মায়ের অনেক কাছে নিয়ে আসে মানসিকভাবে, মা-ও সন্তানের যত্ন, ভালোবাসা প্রকাশে উদগ্রীব হয়। প্রসঙ্গত প্রশ্ন আসে, মা সন্তানকে ভালোবাসে না। এটি খুবই অবান্তর। মা-সন্তানের নাড়ীর টান, এই বাঁধন কখনোই ছিঁড়ে যায় না বা নষ্ট হয় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ভালোবাসা সঠিকভাবে প্রকাশে যখন কোনো মা ব্যর্থ হন কিংবা নানা কারণে যত্ন প্রকাশে উদাসীন হন কিংবা কোনো কিছু নিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি চাপ দেন তখন মা-সন্তানের অটুট বন্ধনে চিড় ধরতে পারে যা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। যে সন্তান মায়ের ভালোবাসায় বা বন্ধনে ঘাটতি অনুভব করবে সে কোথাও সত্যিকারের ভালোবাসা অনুভব করবে না। সবকিছুতে একটা অবিশ্বাস নিয়ে চলবে। এটা তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। জন্মের পর শিশু যখন কাঁদে সঙ্গে সঙ্গে কোনো কারণে তাকে যদি কোলে নেয়ার কেউ না থাকে, বিছানা ভিজিয়ে ফেলার পর সেটা পরিবর্তন করে দেয়ার কেউ না থাকে, ক্ষুধা বা তৃষ্ণায় সেটা বোঝার কেউ না থাকে তখন শিশু খুব অনিরাপদ ও অনিশ্চয়তায় ভোগে। এই ভেবে যে, পৃথিবীতে তাকে দেখার কেউ নেই। সে একা, তাকে কেউ দেখবে না। শুধু ১-৩ বছর বয়সেই যে বন্ধনের ঘাটতি হয় তা নয়। দেখা গেছে পরবর্তীতে শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত মা-সন্তানের বন্ধনের ঘাটতি হওয়ার মতো অনেক কিছু ঘটে যা তার ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মনোবিজ্ঞানী Rohner এর মতে, শিশুর সাত বছর থেকে ১২ বছর বয়সে পিতা-মাতার প্রত্যাখ্যান তার মানসিক বিকাশকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই বয়সে মা অথবা বাবার গ্রহণযোগ্যতা না পেলে সন্তানের আত্মবিশ্বাস কমে যায়, আত্মমর্যাদা বোধ কমে যেতে পারে, নিজের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি হয়। নিজেকে অবমূল্যায়িত মনে হয়। পরবর্তীতে এই মানসিক অবস্থার জন্য তার বিভিন্ন পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানোয় সমস্যা হয় যা তার সামাজিক মেলামেশা সঠিকভাবে করতে পারার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। এ ধরনের শিশুরা পরবর্তীতে সবকিছু থাকা সত্ত্বেও ভেতরে ভেতরে অনেক একা অনুভব করে। তাদের অনেক ধরনের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা অতটা আত্মবিশ্বাস অনুভব করে না। অনেক ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতার সঠিক ব্যবহারও তারা করতে পারে না। তারা সবকিছু প্রথমেই নেতিবাচক চিন্তা করে। বিশেষ করে মা-সন্তানের সুষ্ঠু বন্ধন সন্তানকে সুখী করে তোলে। আর এই সুষ্ঠু বন্ধনের অভাব তাকে সারাজীবন অসুখী অনুভব করায়। মায়ের অতিরিক্ত রক্ষণশীল মনোভাব, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা, নেতিবাচক সমালোচনা করা, নির্মম শাস্তি দেয়া ইত্যাদি বিষয়কে সন্তান মায়ের প্রত্যাখ্যান হিসেবে ধরে নেয়। এই প্রত্যাখ্যানের ফলেও মা-সন্তানের বন্ধনে ঘাটতি দেখা যেতে পারে। এর ফলস্বরূপ, সন্তান তার গর্ভধারিণী, লালন-পালনকারী মায়ের সঙ্গে চরম খারাপ ব্যবহার করে কিংবা তাকে অপছন্দ ও অমান্য করে। যেটা তার ভেতরকার শান্তি নষ্ট করে দেয়, সন্তান চরম রাগী হয়ে ওঠে। ফলে সে সন্তান নিজের মায়ের প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে না, তারা সমাজে অন্যদের সঙ্গে মিশতে গিয়েও চরম স্বার্থপরতা ও অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দেয়। তাদের ব্যক্তিত্বের গঠন স্বাভাবিক হয় না। আর এই অস্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব নিয়ে তারা তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করে। তারা নিজেরাও সুখী অনুভব করে না এবং অন্যকে সুখী দেখতে পছন্দ করে না। তাদের কাছের, আশেপাশের মানুষগুলো তাদের সঙ্গে ভালো থাকে না। তাই মা-সন্তানের সুষ্ঠু স্বাভাবিক বন্ধন প্রতিটি সন্তানের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সফলতার চাবিকাঠি। আসুন মা দিবসকে সামনে রেখে সকল মাকে জানাই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আর যারা মা হয়েছেন তারা আরো সচেতন হই ভালোবাসা সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারার ক্ষেত্রে। মা-সন্তানের বন্ধন অটুট থাকুক আর এভাবেই সন্তান আত্মনির্ভরশীল, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও সুখী হয়ে বেড়ে উঠুক যা সন্তানের মানসিক ও সামাজিক জীবনকে সফল করে তুলবে।

 

লেখক

ডা. সেলিনা ফাতেমা বিনতে শহিদ

সহকারী অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি

মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব

মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্র: মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ৪র্থ বর্ষ, ৫ম সংখ্যায় প্রকাশিত।

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে 

 

“মনের খবর” ম্যাগাজিন পেতে কল করুন ০১৮ ৬৫ ৪৬ ৬৫ ৯৪
শেয়ার করুন, সাথে থাকুন। সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে।
       
 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here