নামাজে দাঁড়ালে মনে বাজে চিন্তা আসে

0
552
প্রতিদিনের চিঠি

আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ঘটে নানা ঘটনা,দুর্ঘটনা। যা প্রভাব ফেলে আমাদের মনে। সেসবের সমাধান নিয়ে মনের খবর এর বিশেষ আয়োজন ‘প্রতিদিনের চিঠি’ বিভাগ। এই বিভাগে প্রতিদিনই আসছে নানা প্রশ্ন। আমাদের আজকের প্রশ্ন পাঠিয়েছেন -হাসেম আলী (ছদ্মনাম)-

আসসালামু আলাইকুম। আমি  অবিবাহিত। আমার বয়স এখন ২৭। আমার বয়স যখন ২১ ছিল তখন আমি পারিবারিক কঠিন চাপের মধ্যে কাটিয়েছি। সেই থেকে আমার ঘুম হয় না। দিন কিংবা রাত টোটালি হত না। তখন আমার স্বাভাবিক বিষয়েও প্রচুর দু:শ্চিন্তা হত । ঘুম না হওয়ায় দু:শ্চিন্তা ও ডিপ্রেশনের পরিমান আরো বাড়ত। কোথায় যাবো কি করবো বুঝতাম না। গুগলে সার্চ করলাম এইটা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় খুঁজতাম। একা একা ৩ বার সুইসাইড করার চেষ্টা চালাই। কিন্তু একটা সময় মনের মধ্যে কাজ করে আমি তো মানুষ। আমি হারবো না।পরিবারের কেউ আমার সমস্যাগুলো বুঝার চেষ্টা করত না। আমি মেডিটেশন শুরু করলাম, মেডিটেশন করার অল্প কয়েক ঘন্টা রিলাক্স বোধ করি তারপর আবার আগের মত হয়ে যাই। দুই বছর আগে আমি সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে যাই তিনি আমাকে relafin 50mg 1+1+1,clofranil25mg 1+1+1, clonatril 1/2 +0+1 খেতে দেয় প্রায় তিনমাস খাই মনের বিরুদ্ধে যে চিন্তা আসত সেগুলো কিছুটা কমত কিন্তু বিষন্নতা বেড়ে যেত,শরীর দুর্বল লাগত।ঘুমের কোন উন্নতি হত না। তারপর আবার ডাক্তারের কাছে গিয়ে সমস্যাগুলো বললাম উনি relafinবাদ দিয়ে setra দিল। setra খেলে দুশ্চিন্তা ও মানসিক যন্ত্রণা আরো বেড়ে যেত। ৭ দিন পর আমি ওষুধ বাদ দিই। আর ডাক্তারের কাছে যাই না। কারণ আমি টিউশনি করে যা টাকা পাই তা দিয়ে আমি নিজেই চাকরির পড়ার খরচ বহন করি।ফলে আমার পক্ষে ডাক্তারের কাছে রেগুলার যাইতে পারি না। আমি বর্তমানে নিজে আপনাদের বিভিন্ন জার্নাল পড়ে বুঝলাম আমার ওসিডি হয়েছে। আমার ওসিডির উপসর্গ গুলো হলো অহেতুক দু:শ্চিন্তা, মনের বিরুদ্ধে চিন্তা, না চাইলেও একটা দু:শ্চিন্তার পর আরেকটা দু:শ্চিন্তা আসে। পড়তে বসলে মনোযোগ থাকে না। জোর করে পজিটিভ চিন্তা করতে চাইলেও কিছুক্ষণ পর মন আবার অন্য নেতিবাচক চিন্তায় ডাইভার্ট হয়ে যায়। নামাজে দাঁড়ালে মনে বাজে চিন্তা আসে। আমি বুঝি এই চিন্তা গুলো করা ঠিক না, তারপরেও আমি এগুলা আটকাতে পারি না। অনিদ্রা নিয়ে সারাদিন হাতাশায় থাকি আর মনে মনে বলতে থাকি কেন ঘুম হয় না আমার,। এখন আমি চাইতেছি relafin50 রাতে একটা করে চালিয়ে যেতে চাই।মেডিটেশন ১ঘন্টা করবো হালকা যোগ ব্যায়াম করবো। কারণ ডাক্তারের কাছে যাওয়ার মত টাকা আমার কাছে নাই। আমি গ্রামে থাকি। বাবা মাকে বললেও আমি সাহা্য্য পাব না। আমি সুস্থ হতে চাই, আমি পারবো because i am the best creator from Allah। দয়া করে আমি কি কি ঔষুধ খেলে ওসিডি দূর হবে তার একটা প্রেসক্রিপশন দিন। আমি তা চালিয়ে যাবো, আমি বেকার তাই ভালো স্বল্প ডোজের ঔষধ দিবেন প্লিজ। নাকি উপরের ঔষধ গুলো চালিয়ে যাবো? এসব ওষুধ খেলে আমার মুখ শুকিয়ে যায়। দয়া করে পরামর্শ দিন প্লিজ।

আপনাকে দুটি কারণে প্রথেমেই ধন্যবাদ দিতে চাই। প্রথমত আপনি আপনার রোগটি বুঝতে পেরেছেন। ‍দ্বিতীয়ত আপনার যে চিকিৎসা দরকার সেটা ‍বুঝতে পেরেছেন। ওসিডি রোগটিই এমন: কোনো একটি চিন্তা, যার প্রয়োজন নাই বা অযথা চিন্তা মনের মাঝে আসতেই থাকে। বিভিন্নভাবে বন্ধ করার বা চিন্তাটি না করার চেষ্টা করলেও বারবার আসতে থাকে। এখানে আপনাকে কিছু বিষয় জানতে হবে এবং মানতে হবে। ওসিডি সাধারণত একটি দির্ঘমেয়াদী রোগ। এর চিকিৎসা দীর্ঘদিন চালিয়ে যেতে হয়। ওষুধ কখেনো কম কখনো বেশী সেই সাথে রোগটিকে নিয়ন্ত্রণ করার কিছু পদ্ধতি জেনে নিতে হয়ে । সেই পদ্ধতি গুলিও খুব প্রয়োজনীয়। আপনার বাড়ি কোথায় জানা দরকার ছিলো। আপনার চিকিৎসা প্রাইভেটভাবে চালিয়ে যেতে যদি সমস্যা হয় আপনি নিশ্চিন্তে যেকোনো মেডিকেল কলেজে যোগাযোগ করতে পারেন। প্রায় সব সরকারী ও বেসরকারী মেডিকেল কলেজে মনোরোগবিদ্যা বিভাগ আছে এবং সব জায়গায় এই রোগের চিকিৎসা সম্ভব। আপনি যদি ঢাকার কাছাকাছি হন, তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগে যোগাযোগ করতে পারেন। যেহেতু অনেক দিন চিকিৎসা চালাতে হতে পারে এখানেই আপনার জন্য ভালো হবে। খরচ নাই বললেই চলে। শুধুমাত্র তিরিশ টাকার একটা টিকিট কাটলেই চলবে, সেই সাথে আপনার যাওয়া আসার খরচ। সম্ভব না হলে কাছাকাছি কোনো মেডিকেল কলেজে যোগাযোগ করবেন।

আপাতত রিলাফিন চালিয়ে যেতে পারেন। সেই সাথে রিলাক্সেশন (মেডিটেশন)। রিলাফিনের বদলে ক্যাপসুল প্রোলার্ট ( Cap – Prolert 20mg) সকালে একটা করে খেতে পারেন। তবে অবশ্যই কোনো একটা জায়গা থেকে নিয়মিত চিকিৎসা নেয়ার চিন্তা করেন। পরিবারের বিষয়টি নিয়েও একটুভাবতে হবে। আমাদের দেশের মানুষজন এখনো মানসিক রোগ ভাবতে পারে না বা মেনে নিতে পারে না। আশা করি তারাও বুঝবেন। প্রয়োজনে উনাদেরকেও ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসবেন, তখন বুঝিয়ে বলা সম্ভব হবে। এই লেখাটিও উনাদেরকে দেখাতে পারেন। ভালো থাকুন।

ইতি,
প্রফেসর ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব

চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক – মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
সেকশন মেম্বার – মাস মিডিয়া এন্ড মেন্টাল হেলথ সেকশন অব ‘ওয়ার্ল্ড সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন’।
কোঅর্ডিনেটর – সাইকিয়াট্রিক সেক্স ক্লিনিক (পিএসসি), মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
সাবেক মেন্টাল স্কিল কনসাল্টেন্ট – বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্রিকেট টিম।
সম্পাদক – মনের খবর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here