ভোরের নরম আলোয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রিমির নিজেকে একটু অন্যরকম লাগছিল। চুলগুলো ঠিকঠাক করে, নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হচ্ছিল-আজ দিনটা ভালো যাবে। স্কুলে যাওয়ার পথে সে হালকা বাতাসে চুল উড়িয়ে হাঁটছিল, বন্ধুর সাথে গল্পে মেতে উঠছিল, এমনকি একটি ছোট্ট মজার কথায় তার হাসি থামতেই চাইছিল না। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব বদলে গেল। ক্লাসে একজন সহপাঠী খুব সাধারণ একটি মন্তব্য করল-হয়ত মজা করেই। অথচ সেই মুহূর্তে রিমির মনে হলো তাকে অপমান করা হয়েছে, তাকে কেউ বোঝে না। বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল, চোখ জ্বালা করতে লাগল। বিকেলে বাড়ি ফিরে সে কারো সাথে কথা বলল না, দরজা বন্ধ করে শুয়ে থাকল-মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা তার জন্য খুব কঠিন, খুব একা।
আরও পড়ুন…
অন্যদিকে আরিফের গল্পটা আরও জটিল, আরও গভীর। সে যখন তার প্রিয় মানুষটির সাথে থাকে, তখন মনে হয় এই সম্পর্কটাই তার জীবনের একমাত্র আশ্রয়-সে ভালোবাসে, বিশ্বাস করে, সবকিছু উজাড় করে দেয়। কিন্তু হঠাৎ কোনো ছোটো ভুল বোঝাবুঝি বা দেরিতে রিপ্লাই-তার ভেতরে তীব্র এক ভয় জেগে ওঠে: “সে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।” এই ভয় রাগে রূপ নেয়, রাগ আবার অপরাধবোধে, তারপর গভীর শূন্যতায়। একদিন সে নিজের আচরণেই অবাক হয়ে যায়-কেন সে এত দ্রুত বদলে যায়? কেন তার ভেতরের আবেগগুলো এত অনিয়ন্ত্রিত? চিকিৎসকের কাছে গিয়ে সে জানতে পারে, তার এই অভিজ্ঞতার নাম আছে-বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, যেখানে ‘মুড সুইং’ বা অতিদ্রুত মেজাজের পরিবর্তন কেবল একটি লক্ষণ নয়, বরং পুরো অভিজ্ঞতার কেন্দ্রবিন্দু।
এই দুইটি বাস্তবতার ভেতর দিয়ে আমরা প্রবেশ করি মানুষের মনের এক জটিল, বহুস্তরবিশিষ্ট অঞ্চলে-‘মুড সুইং’ বা অতিদ্রুত মেজাজের পরিবর্তন। এটি কেবল “মন ভালো থাকা” আর “মন খারাপ থাকা”-র সাধারণ পরিবর্তন নয়; বরং এটি আবেগের এমন এক ওঠানামা, যা কখনো হঠাৎ, কখনো অকারণ, কখনো আবার এতটাই তীব্র যে ব্যক্তি নিজেই নিজের ভেতরকে চিনতে পারে না।
সাইকোলজির ভাষায় ‘মুড’ হলো একটি তুলনামূলকভাবে স্থায়ী আবেগীয় অবস্থা, যা আমাদের চিন্তা, আচরণ এবং শারীরিক প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। আর ‘মুড সুইং’ বলতে বোঝায় এই আবেগীয় অবস্থার দ্রুত ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এই পরিবর্তনটি কত দ্রুত ঘটছে, কতটা তীব্র, এবং এটি ব্যক্তির দৈনন্দিন কার্যক্ষমতায় কতটা প্রভাব ফেলছে।
মুড সুইংয়ের পেছনে সবচেয়ে মৌলিক স্তরে কাজ করে আমাদের মস্তিষ্কের নিউরোবায়োলজিক্যাল প্রক্রিয়া। সেরোটোনিন, ডোপামিন, নরএপিনেফ্রিন-এই
নিউরোট্রান্সমিটার গুলো আমাদের আবেগের রং নির্ধারণ করে। সেরোটোনিন আমাদের মুডকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। এর ঘাটতি হলে বিষণ্ণতা, খিটখিটে মেজাজ দেখা দিতে পারে। ডোপামিন আনন্দ, প্রেরণা ও পুরস্কারের অনুভূতির সাথে জড়িত: এর ওঠানামা হলে কখনো অতিরিক্ত উৎফুল্লতা, কখনো আগ্রহহীনতা তৈরি হতে পারে। নরএপিনেফ্রিন স্ট্রেস ও উত্তেজনার সাথে সম্পর্কিত: এটি বাড়লে উদ্বেগ ও উত্তেজনা বাড়তে পারে। এই রাসায়নিকগুলোর সূক্ষ্ম ভারসাম্য নষ্ট হলেই মুডে অস্থিরতা দেখা দেয়।
কিন্তু মানুষ কেবল রাসায়নিকের সমষ্টি নয়। তার অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, স্মৃতি-সবকিছু মিলেই তার আবেগ গড়ে ওঠে। রিমির মতো কিশোর-কিশোরীদের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব, এদের মুড সুইংয়ের পেছনে রয়েছে একটি বিকাশগত বাস্তবতা। কৈশোরে মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম-যা আবেগের কেন্দ্র-খুব সক্রিয় হয়ে ওঠে, কিন্তু প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স-যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী-যা এই বয়সে পুরোপুরি পরিপক্ব হয় না। ফলে আবেগের ঢেউ অনেক দ্রুত ও তীব্র হয়ে ওঠে, কিন্তু সেই ঢেউকে সামলানোর নৌকাটি তখনও শক্তভাবে তৈরি হয়নি। এই বৈসাদৃশ্যই কিশোর-কিশোরীদের মুড সুইংকে ব্যাখ্যা করে। ড্যানিয়েল গোলম্যান তার আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার ধারণায় দেখিয়েছেন, আবেগকে চেনা, বুঝা এবং নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। যদি এই দক্ষতা যথাযথভাবে বিকশিত না হয়, তাহলে ব্যক্তি আবেগের ঢেউয়ে ভেসে যেতে পারে। রিমির ক্ষেত্রে একটি ছোটো মন্তব্য তার আত্মসম্মানের সাথে জড়িয়ে গিয়ে বড়ো আবেগীয় প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে-যা তার কাছে বাস্তব, যদিও বাইরের দৃষ্টিতে তা তুচ্ছ।
অন্যদিকে, আরিফের অভিজ্ঞতা আমাদের নিয়ে যায় ব্যক্তিত্বের গঠন ও সম্পর্কের জটিলতায়। মার্শা লিনেহানের বায়োসোশ্যাল তত্ত্ব অনুযায়ী, বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারের পেছনে থাকে একটি ইমোশনাল ভালনারেবিলিটি’-অর্থাৎ ব্যাক্তি সহজেই আবেগে ভেসে যায়: এবং একটি ‘ইনভ্যালিডেটিং এনভায়রনমেন্ট’-যেখানে তার আবেগকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না, বরং অস্বীকার বা অবমূল্যায়ন করা হয়। এই দুইয়ের সংমিশ্রণে ব্যক্তি শেখে না কীভাবে নিজের আবেগকে সঠিকভাবে চিহ্নিত ও নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। ফলে তার আবেগগুলো হয়ে ওঠে চরম-ভালোবাসা থেকে ঘৃণা, আশা থেকে হতাশা-সবকিছু খুব দ্রুত বদলে যায়।
মুড সুইংয়ের পেছনে ট্রমার ভূমিকাও গভীর। শৈশবের অবহেলা, নির্যাতন, বা নিরাপত্তাহীনতা মস্তিষ্কের স্ট্রেস রেসপন্স সিস্টেমকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে ব্যক্তি পরবর্তিতে সামান্য চাপেও তীব্র আবেগীয় প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। অ্যাটাচমেন্ট থিওরি অনুযায়ী, যদি শৈশবে নিরাপদ সম্পর্ক গড়ে না ওঠে, তাহলে ব্যক্তি বড়ো হয়ে সম্পর্কের মধ্যে অনিশ্চয়তা, ভয় এবং অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অনুভব করতে পারে-যা মুড সুইংকে আরও তীব্র করে তোলে।
এছাড়াও, দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কিছু বিষয়ও মুড সুইংয়ের পেছনে কাজ করে-ঘুমের অভাব, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, হরমোনাল পরিবর্তন, শারীরিক অসুস্থতা। সার্কাডিয়ান রিদমের ব্যাঘাত-যা আমাদের ঘুম-জাগরণের প্রাকৃতিক ছন্দ-মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। ফলে ব্যক্তি সহজেই বিরক্ত, ক্লান্ত বা বিষণ্ণ হয়ে পড়ে।
সাইকিয়াট্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে, মুড সুইং কখনো কখনো বৃহত্তর মানসিক রোগের অংশ হিসেবে দেখা দেয়। বাইপোলার ডিজঅর্ডারে ব্যক্তি ম্যানিয়া ও ডিপ্রেশনের মধ্যে দোল খায়-একদিকে অতিরিক্ত শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও উত্তেজনা: অন্যদিকে গভীর দুঃখ, ক্লান্তি ও শূন্যতা। এই পরিবর্তনগুলো সাধারণ মুড সুইংয়ের চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র, এবং এগুলো ব্যক্তির জীবনযাত্রাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-সব মুড সুইংই রোগ নয়। মানুষের আবেগের স্বাভাবিক ওঠানামা তার জীবনেরই অংশ। সমস্যা তখনই হয়, যখন এই ওঠানামা এতটাই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে যে ব্যক্তি তার কাজ, সম্পর্ক বা নিজের সত্তাকে ধরে রাখতে পারে না।
মুড সুইংয়ের অভিজ্ঞতা অনেকটা সাগরের মতো-কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল। এই সাগরের ঢেউ থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু এর সাথে সাঁতার কাটতে শেখা সম্ভব। সাইকোথেরাপি এই শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি ব্যক্তি তার চিন্তা ও আবেগের মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে-কীভাবে একটি চিন্তা একটি আবেগ তৈরি করে, এবং সেই আবেগ একটি আচরণে রূপ নেয়। ডায়ালেকটিক্যাল বিহেভিয়ার থেরাপি বিশেষ করে আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সহনশীলতা এবং বর্তমান মুহূর্তে থাকা শেখায়-যা মুড সুইং মোকাবেলায় অত্যন্ত কার্যকর। একই সাথে, আত্মসচেতনতা একটি মৌলিক ভূমিকা পালন করে। যখন ব্যক্তি বুঝতে পারে-“এই মুহূর্তে আমার মুড বদলাচ্ছে”-তখন সে সেই পরিবর্তনের দ্বারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত না হয়ে, কিছুটা দুরত্ব থেকে তা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এই ছোট্ট দূরত্বই অনেক সময় বড়ো পরিবর্তন এনে দেয়।
শেষ পর্যন্ত, মুড সুইংকে শুধুমাত্র একটি সমস্যা হিসেবে দেখলে আমরা এর মানবিক দিকটি হারিয়ে ফেলি। আবেগের এই ওঠানামা আমাদের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি-আমাদের ভালোবাসা, ভয়, আশা, ভাঙন-সবকিছু এর মধ্যে মিশে থাকে। রিমির অকারণ কান্না, আরিফের তীব্র ভালোবাসা ও ভয়-এসবই মানুষের মনের গভীরতার প্রকাশ। হয়ত মুড সুইং থেকে মুক্তি পাওয়াই লক্ষ্য নয়; বরং এর সাথে একটি সহনশীল, সচেতন সম্পর্ক গড়ে তোলা-যেখানে আমরা আবেগকে দমন করি না, আবার তার কাছে আত্মসমর্পণও করি না। বরং তাকে বুঝি, তার ভাবা শিখি, এবং ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের এই পরিবর্তনশীল সাগরের সাথে সহাবস্থান করতে শিখি।
- ডা. পঞ্চানন আচার্য্য
- সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
- মনোরোগবিদ্যা বিভাগ
- চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।
আরও দেখুন…



