কাগজ থেকে গাছের জন্ম

0
40
কাগজ থেকে গাছের জন্ম
শেয়ার করুন, সাথে থাকুন। সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে।

গাছ থেকে কাগজের জন্ম, আবার কাগজ থেকেই গাছের পুনর্জীবন ব্যাপারটা অনেকটা এমনই। আর এই ব্যাপারটিকে বাস্তবায়ন করেছেন যিনি তাঁর নাম মাহবুব সুমন।

মানুষ প্রকৃতির ওপর আধিপত্য করতে গিয়ে দিনে দিনে যে দেনা বাড়িয়েছে তা-ই যেন শুধবার ভার নিয়েছেন তিনি। পরিত্যাক্ত কাগজ থেকে তিনি তৈরি করেছেন বনকাগজ নামে এক ধরনের কাগজ। যাতে থাকে বিভিন্ন রকমের গাছের বীজ। আর জাদুর মতোই সেই কাগজটি মাটিতে মিশে গেলে তার থেকে জন্ম নেয় গাছ।

পলিথিনের অভিশাপ থেকে প্রকৃতিকে মুক্তি দিতে আলু থেকে তৈরি করেছেন পলকা নামের বিকল্প উপকরণ। যা দিয়ে তৈরি হয় বহনযোগ্য ব্যাগ। প্রকৃতির মঙ্গলার্থে আরো নানাবিধ উদ্ভাবন চিন্তায় মগ্ন থাকা মানুষটি কথা বলেছেন মনের খবরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন সাদিকা রুমন।

মনের খবর: কেন পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হলেন?

মাহবুব সুমন: কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তথ্য প্রযুক্তিতে ক্যারিয়ার খারাপ ছিল এরকম বলা যাবে না। ভালো আয় রোজগার হচ্ছিল। তবু গণিত আর পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে ব্যবহারিক পর্যায়ে বিশদভাবে কাজ করার জন্য দ্বিতীয়বার ২০০৪ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শুরু করলাম একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িৎ প্রকৌশলে।

তখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে হালকা লেখালেখি, আলোচনা হচ্ছে। আমার পূর্ব-পুরুষের বাড়ি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জে। একদিন পত্রিকায় পড়লাম, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নোয়াখালী সমুদ্রে হারিয়ে যাবে। খবরটা পড়ে খুব মনে কষ্ট পেলাম। দাদা, নানা, নানি এই তিনজন আমাকে এত ভালোবসা দিয়েছেন যা তাদের বাকি সব নাতি-নাতনিদের চেয়েও বেশি।

সেই ভালোবাসা ভোলার মতো না। শৈশবের গ্রীষ্মের ছুটি কিংবা বছর শেষে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে গ্রামে চলে যাওয়া, বেড়ানো দিনগুলা, শীতের পিঠা, খেজুঁরের রস, আমসত্ত্ব, পুকুরে ডুবিয়ে চোখ লাল করা, সারাদিন এ-বাগান ও-বাগানের আম পাড়া, ভর্তা করে খাওয়া।

মূলা ক্ষেতে মূলা তুলে লবণ মরিচ দিয়ে ঝাল ভর্তা বানিয়ে জমিতে বসেই সব ভাই-বোন মিলে সাবাড় করে দেয়া, কাছাকাছি বর্ষায় নতুন ওঠা পানিতে মাছ ধরা, রাতে সব ভাই-বোন উঠোনে মজা করে নামতা, কবিতা, ছড়া, শ্লোক আবৃত্তি করা, আর দাদা-দাদি, নানা-নানির কবরÑএরকম হাজারো স্মতি স্রেফ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য হারিয়ে যাবে, এটা হতে পারে না।

আমার মনে হলো যা-ই পড়ি না কেন, যা-ই করি না কেন সেই পড়াটা এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলায় কোনো না কোনোভাবে কাজে লাগাতে হবে। এই ব্যথাটাকেই নিজের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজে লাগিয়ে ২০০৫/২০০৬ সাল থেকে কাজ শুরু করি। কাজ করা বলতে কথা বলা, প্রেজেন্টেশান দেয়া ও লেখালেখি শুরু করলাম। পরে একেবারে ব্যবহারিক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান তৈরি আর বাস্তবায়ন করতে শুরু করলাম।

মনের খবর: পরিবেশ কীভাবে মনের ওপর প্রভাব ফেলে?

মাহবুব সুমন: আমার অভিজ্ঞতাও এরকম যে, জন্ম থেকে বড়ো হয়ে আমরা যা হয়ে উঠি সেই মানুষটার তৈরি হবার পুরো প্রক্রিয়ার ১০ ভাগ বায়োলজিক্যাল, ৯০ ভাগ পরিবেশের নির্মাণ। পরিবেশের কারণেই আমাদের মস্তিষ্কের গঠন, তার নিউরন ডেভেলপমেন্ট, ভাষা তৈরি, চিন্তার একক হিসেবে গুচ্ছ গুচ্ছ নিউরনের জাল বা সিনপসিস তৈরি হওয়া এবং সেগুলার একেবারে বাস্তবিক পর্যায়ে ঝামেলা হওয়া, মানসিকভাবে ভালো ও খারাপ থাকা, সৃজনশীলতা, রোগ থেকে শুরু করে নানান রকম বিষক্রিয়া হবার পুরো বিষয়টাই পরিবেশের প্রভাব।

একটা উদাহরণ দিলে ভালো বোঝা যাবে প্রায়ই আমাদের কোনো কাজেই মন বসে না। এই ঘটনা বাচ্চাদের বেশি ঘটে, আমরা খেয়াল করি না। কোনো কথাই তারা মন দিয়ে শোনে না। দেখলে মনে হবে বাচ্চাটা ভীষণ দুষ্ট, চঞ্চল। আসলে নারী, পুরুষসহ সকল জেন্ডারের মানুষের নানান হরমোনাল, শারীরিক, মানসিক, আর্থ-সামাজিক কারণের বাইরেও এই আচরণের একটা বিরাট কারণ মস্তিষ্কের ওপর পরিবেশের দূষণজনিত বিষক্রিয়া।

ব্লাড ব্রেইন ব্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নানান জটিল সমস্যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তখন। যেকোনো অর্থেই উৎপাদনশীলতা কমে যায়, সৃজনশীলতা হারিয়ে যায়। মানুষ আর মানুষ থাকে না, জম্বিতে পরিণত হতে থাকে। এটা কেবলই উদাহরণ। সর্বোপরি বলা যায়, পরিবেশের প্রভাব মনের ওপর ব্যাপক।

মনের খবর: পরিবেশ দূষণ কি মানসিক দূষণের কারণ হয়ে উঠতে পারে?

মাহবুব সুমন: এটা একটা জটিল প্রশ্ন। একই সাথে হ্যাঁ এবং না। না, কারণ ১৭ হাজার বছর আগে মানুষ আর একটা প্রজাপতির টিকে থাকার ক্ষমতা সমান ছিল। মানুষের চেয়ে বরং অন্য প্রাণীরা টিকে থাকার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সক্ষম ছিল।

সামষ্টিক চর্চা, শৃঙ্খলাবদ্ধ আচরণ এবং সচেতনতা তৈরি হবার কারণে মানুষ মানুষ হয়ে উঠেছে এবং পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। এই সচেতনতা বা কনশাসনেস কখনো পেছনে যায় না। এটা শুধু আগায়। মাঝে মাঝে মানুষের সমাজে ছোটো ছোটো পরিবর্তনের অনুরণন আসে। সেগুলো ৫ থেকে ৫০ বছর আমাদের জ্বালায়, পোড়ায়। এসব কী হচ্ছে ধরনের দুশ্চিন্তায় আমরা অস্থির হয়ে যাই।

কিন্তু ইতিহাসের কাছে ৫০ কি ৭০ বছর আসলে কোনো সময়ই না। পলকের মতো। বৃহত্তর সময়ে এবং অর্থে কনশাসনেস এগুতেই থাকে। সে-কারণে পরিবেশ দূষণ মানসিক দূষণের কারণ হতে পারে না। তবে বায়োলজিক্যালি দূষণের কারণে আমাদের মস্তিষ্কের সিনপসিস, মৌলিক চিন্তা, মননের ক্ষতি হয়, আর কোষের গতানুগতিক মিউটেশানের বাইরে কিছু পরিবর্তন ঘটে যায়।

সেগুলো বিবেচনায় নিলে সচেতনতার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ, দিশা বা পথ বদলানো স্বাভাবিক। যা বৃহত্তর ঐক্য, সংহতি, শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বাধাগ্রস্ত করে। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো যে শক্তিটা পথিবীর পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে তাহলো এই প্রজাতির স্টুপিডিটি বা অবিবেচকের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

ইতিহাসে বা দর্শনের আলোচনায় স্টুপিডিটির ভূমিকার কথা কদাচিৎ আলোচনা হয়। কেন সচেতন একটা প্রজাতি স্টুপিডের মতো আচরণ করবে এবং কেন সে নিজেই নিজেকে ধ্বংস করবে? সেই চিন্তার গভীরে গেলে পরিবেশ দূষণের বড়ো কারণ খুজেঁ পাওয়া যাবে।

মনের খবর: ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য ইতিবাচক মন কতটা জরুরি?

মাহবুব সুমন: যেহেতু সার্বিক পরিস্থিতিতে লড়াকু হওয়া ছাড়া উপায় নাই, সেহেতু ইতিবাচকতা অবশ্যক। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সামনের দিনগুলোতে টিকে থাকা অনেক বেশি জরুরি। কারণ কিছু বিষয় আমরা দেখতেই পাচ্ছি না। আগামীর দুনিয়ায় সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হবে অব্যবহৃত এবং অপ্রয়োজনীয় শ্রম। মানুষের সংখ্যা ভয়ানকরকমে বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন।

ডাটার নিয়ন্ত্রণই আগামীর পৃথিবীর মূল নিয়ন্ত্রক হবে এবং রাষ্ট্র হয় কর্পোরেশন হয়ে যাবে নতুবা বড়ো কর্পোরেশন রাষ্ট্রকে চালাবে। অর্থাৎ ডাটার নিয়ন্ত্রণ যার সেই চালক। যেমন: গুগল, মাইক্রোসফট, ফেইসবুক। স্বাভাবিকভাবেই অলস শ্রম হতাশ ও বিক্ষুব্ধ হবে এবং একটা ভয়ানক বিপর্যয় আসছে এই তৈরি হতে থাকা অলস শ্রমের জন্য।

ঘটনাটি ২০৩৫ সাল থেকে দৃষ্টিগোচর হবে বেশি বেশি। কারণ ২০৩৫ সাল নাগাদ আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়ে যাবে। বেশিরভাগ কাজ তখন মেশিন বা রোবট করে ফেলবে। এ সময় মানুষের বুদ্ধির শ্রম এবং কায়িক শ্রমের প্রয়োজন কমতে থাকবে। একে কেন্দ্র করেই বিশ্বজুড়ে একটা বড়ো রকমের বিদ্রোহ, মারামারি, কেওয়াস আসছে।

ঘটনাটা আগাম উপলব্ধি করতে পেরে পুঁজিবাদের বড়ো গুরু যেমন বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেটরা এখন থেকেই সার্বজনীন ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করতে উঠে পড়ে লেগেছে। কিন্তু সেটা মোটেই গুরুতর সমস্যাগুলো সুরাহা করতে পারবে না। এই রকম সময়েই মাথার ওপর পরিবেশ দূষণ আর জলবায়ু পরিবর্তনের ঘটনাও ঝুলছে।

ফলে টিকে থাকতে হলে লড়াকু না হয়ে উপায় নেই। সেই জন্য জোর করে হলেও ইতিবাচক থাকা চাই। বা কেউ আমরা মানসিকভাবে নেগেটিভ এনার্জির মধ্যে পড়ে গেলে আশপাশের সবাই তাকে মানসিক সমর্থন দিয়ে ইতিবাচক রাখা দরকার।

মনের খবর: এই ইতিবাচক শক্তিটি গড়ে উঠতে পারে কীভাবে?

মাহবুব সুমন: জীবনের গতি কমাতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানোর জন্য যেমন প্রি ইন্ডাস্ট্রিয়াল লেভেলের জলবায়ু ফিরে পেতে হবে তেমনি জীবনকেও প্রি ইন্ডাস্ট্রিয়াল (উনবিংশ শতাব্দী) পর্যায়ে ফেরত নিয়ে যেতে হবে। সেটা যত কঠিনই হোক না কেন।

মনের খবর: প্রকৃতি, মানুষ কিংবা পৃথিবীর স্বার্থও আমারই স্বার্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে এই অনুভূতি জন্মানো সম্ভব কীভাবে?

মাহবুব সুমন: গতানুগতিক প্রায় সকল ধর্ম, গোত্রেই এরকম একটা চিন্তা আছে যে আমরাই (মানুষরাই) সেরা। এই চিন্তাটা মানুষকে বড়ো বেশি অহংকারী আর স্বার্থপর করে তোলে। সে নিজেকে পরিবেশের কোটি কোটি উপাদানের সঙ্গে সম-অধিকারের একটি উপাদান না ভেবে পরিবেশের কর্তা বা নিয়ন্ত্রক ভাবে। ফলে সে এমনকি আবহাওয়া, জলবায়ুকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

আর সকল প্রাণীকে তার অধঃস্তন হিসেবে বিবেচনা করে। হাস্যকর হলো, প্রকৃতির অতি ক্ষুদ্র একটা অংশ কীভাবে সমগ্র প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে? কিন্তু মানুষ এটাই ভাবে। প্রকৃতির অংশ মনে না করে সে প্রকৃতিকে অবজেক্টিভভাবে বিবেচনা করে নিজেকে তার ওপর অবস্থানে দেখতে পায়।

মানসিক ভিত্তিমূলের এই চিন্তা থেকে যদি আমরা নতুন শিশুকে, নতুন মানুষদের মুক্তি দিতে পারি এবং তাকে এই চিন্তায় বড়ো করতে পারি যে সে আর সবার মতোই একজন। সবার ওপরের একজন না, তবেই তার ভেতর নতুন চিন্তা ও বোধের বিকাশ ঘটবে।

মনের খবর: আপনার চলার পথটি সহজ নয়, গতানুগতিক নয় এই বন্ধুর দুর্গম পথে চলতে কখনো কি হতাশ হয়ে পড়েন?

মাহবুব সুমন: আমি খুব ইমোশনাল। দারুণ হতাশা আসে প্রায়ই।

মনের খবর: ঐ অবস্থা থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসেন?

মাহবুব সুমন: হতাশা ট্রিগার করে এমন বন্ধু, কাজ, কথা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি। বড়ো প্রত্যাশা রাখি না। আর প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি করার জন্য মাথাকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি।

একটা নির্দিষ্ট কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলে, ব্যর্থ হতে থাকলে আরেকটা কাজে ঢুকে পড়ি। তখন পরের কাজটা কাজ হলেও প্রথম কাজের জন্য সেটা বিশ্রামের মতো ভূমিকা রাখে। এটা একঘেয়েমি কাটাতে সাহায্য করে আর হতাশাকে ধোঁকা দেয়া যায়।

এসবও যখন কাজ করে না তখন বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে মন। কীভাবে যেন প্রতিবারই বন্ধুরা সাহায্য করে। এটা আমার নিজের কাছেই এক আলৌকিক ঘটনা। স্পিরিচুয়ালিটিতে বিশ্বাস করতে চায় না আমার মাথা। তবে কিছু কিছু ঘটনা কনভেনশনাল ফিজিক্স দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি না।

মনের খবরের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ

মাহবুব সুমন: মনের খবরকেও ধন্যবাদ।

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে

more

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here