শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধগুলোর একটি, অথচ বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর অসংখ্য শিশু এই সহিংসতার শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিও খুবই উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুর কয়েক মাসে প্রকাশিত ধর্ষণের ঘটনাগুলোর প্রায় অর্ধেক ভুক্তভোগী ছিল শিশু; অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বয়স ছিল ১২ বছরের নিচে।
গবেষণায় দেখা যায়, অনেক যৌন অপরাধমূলক আচরণের বীজ কৈশোর (adolescence) থেকেই তৈরি হতে পারে। একজন মানুষ কীভাবে ধীরে ধীরে একজন ধর্ষক হিসেবে গড়ে ওঠে— সেই প্রক্রিয়াকে বোঝার জন্য মনোবিজ্ঞান মানুষের মানসিক বিকাশ, আবেগ, সম্পর্ক ও সামাজিক শিক্ষাকে বিভিন্ন তত্ত্ব ও গবেষণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। এই প্রক্রিয়া সাধারণত হঠাৎ শুরু হয় না; বরং শৈশব থেকে শুরু হয়ে জীবনের বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে একটি বিকৃত মানসিক কাঠামো।
প্রথম স্তর: শৈশব — মানসিক কাঠামোর জন্ম
মনোবিজ্ঞানী জন বোলবির Attachment Theory অনুযায়ী, জীবনের প্রথম কয়েক বছরে শিশুর যত্নদাতার (caregiver) সঙ্গে তার যে আবেগীয় সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সেটিই ভবিষ্যৎ সম্পর্কবোধের ভিত তৈরি করে।
যে শিশু নিরাপদ ভালোবাসা পায়, যার ভয়, কান্না, আবেগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়— সে ধীরে ধীরে অন্যের অনুভূতি বুঝতে শেখে। তার ভেতরে গড়ে ওঠে সহানুভূতি (empathy), নিরাপত্তাবোধ এবং সম্পর্কের প্রতি আস্থা।
কিন্তু যে শিশু অবহেলা (neglect), শারীরিক নির্যাতন (physical abuse), মানসিক নির্যাতন (emotional abuse), অপমান বা অনিরাপদ পরিবেশে বড় হয়, তার মানসিক কাঠামো ভিন্নভাবে গড়ে উঠতে পারে। সে অনেক সময় শিখে ফেলে— সম্পর্ক মানে ক্ষমতার খেলা; কে শক্তিশালী, কে দুর্বল— সেটিই আসল। যদি তার সামনে masculinity বারবার আধিপত্য, ভয় দেখানো বা আবেগ চেপে রাখার ভাষায় প্রকাশ পায়, তবে সে বিশ্বাস করতে শুরু করতে পারে— “পুরুষত্ব” মানেই নিয়ন্ত্রণ ও শক্তি প্রদর্শন। ফলে healthy masculinity নয়, বরং dominance-based masculinity গড়ে উঠতে পারে।
এখানে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ: ট্রমাগ্রস্ত প্রতিটি শিশু কখনোই অপরাধী হয়ে ওঠে না। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক যৌন অপরাধীর জীবনে শৈশবের ট্রমা, অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতার ইতিহাস অস্বাভাবিকভাবে বেশি যায়। অর্থাৎ, ভিত্তিটা অনেক সময় সেখান থেকেই তৈরি হতে শুরু করে।
দ্বিতীয় স্তর: শেখার বয়স — সমাজ যা শেখায়
শিশু একটু বড় হলেই শুরু হয় সামাজিক শেখার পর্ব। মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরার Social Learning Theory বলছে, মানুষ আচরণ শেখে দেখে দেখে— পরিবারে, বন্ধুমহলে, মিডিয়ায়, সমাজে।
একটি ছেলে শিশু কী দেখছে? পরিবারের বড়রা যদি নারীর প্রতি অসম্মান, সহিংসতা বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আচরণকে স্বাভাবিক করে তোলে, তবে শিশুর মস্তিষ্ক সেটিকেই “স্বাভাবিক বাস্তবতা” হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় বন্ধুমহল। যেখানে নারীকে অপমান করা “মজা”, যেখানে তার শরীর নিয়ে কৌতুক স্বাভাবিক, সেখানে ধীরে ধীরে অন্যকে “মানুষ” হিসেবে দেখার ক্ষমতা ক্ষয় হতে থাকে।
তৃতীয় স্তর: কৈশোর — যৌনতার সঙ্গে প্রথম পরিচয়
আজকের দিনে অধিকাংশ কিশোর যৌনতা সম্পর্কে প্রথম শেখে পর্নোগ্রাফি থেকে— অনেক সময় ১০–১২ বছর বয়সেই।
সমস্যা হলো, আধুনিক অনলাইন পর্নোগ্রাফি মানেই আগ্রাসন, আধিপত্য এবং নারী ও শিশুদের বস্তু (objectification) হিসেবে দেখানোর সংস্কৃতি। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন Early Sexual Scripting।
কৈশোরের মস্তিষ্ক যখন প্রথম যৌনতার ধারণা তৈরি করছে, তখন সে যা বারবার দেখছে, সেটিই তার কাছে যৌনতার “টেমপ্লেট” হয়ে ওঠে। যদি সেই টেমপ্লেটে সম্মতি (consent) অনুপস্থিত থাকে, যদি সেখানে যন্ত্রণাকেও উত্তেজনা হিসেবে দেখানো হয়, তবে যৌনতার মৌলিক ধারণাটিই বিকৃত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে।
চতুর্থ স্তর: আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা
প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পথে অনেক মানুষের ভেতরে জমতে থাকে রাগ, অপমানবোধ, প্রত্যাখ্যানের ক্ষত, ব্যর্থতা, একাকিত্ব বা ক্ষমতাহীনতার অনুভূতি।
কিন্তু আমাদের সমাজ ছেলেদের খুব কমই শেখায়— কীভাবে আবেগ প্রকাশ করতে হয়, কীভাবে কষ্ট সামলাতে হয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Emotional Dysregulation।
কারও ক্ষেত্রে এটি বিষণ্ণতায় রূপ নেয়, কারও ক্ষেত্রে নেশা (substance use), কারও ক্ষেত্রে আত্মবিধ্বংসী আচরণ। কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে— বিশেষত যাদের সহানুভূতি আগেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে এবং যাদের কাছে যৌনতা মানেই আধিপত্য— তারা নিজেদের ভেতরের অসহায়তা চাপিয়ে দিতে চায় এমন কারও ওপর, যে দুর্বল, অসহায় এবং প্রতিরোধ করতে পারবে না। শিশু তখন হয়ে ওঠে সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য।
পঞ্চম স্তর: নিজের কাছেই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা
কোনো মানুষ অপরাধ করার আগে এবং করার পরেও নিজের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য রাখতে চায়। কারণ মানুষের বিবেক সাধারণত হঠাৎ করে নিশ্চুপ হয়ে যায় না। তাই অনেক অপরাধী ধীরে ধীরে নিজের কাছেই মিথ্যা বলা শুরু করে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় Cognitive Distortion। যেমন— “শিশুরা কিছু বোঝে না”, “একবারই তো করেছি।”
প্রথমে এসব চিন্তা দ্বিধাগ্রস্তভাবে আসে। কিন্তু বারবার মনে আওড়াতে আওড়াতে একসময় তা সত্যির মতো মনে হতে শুরু করে। বিবেক ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যায়।
ষষ্ঠ স্তর: Four Preconditions Model
মনোবিজ্ঞানী ডেভিড ফিঙ্কেলহর শিশু যৌন নির্যাতন বোঝার জন্য এই মডেলটি তৈরি করেছিলেন। তাঁর মতে, একটি যৌন অপরাধ ঘটার আগে চারটি বাধা ভাঙতে হয়।
১. বিকৃত প্রেরণার জন্ম (Development of Deviant Motivation)
ক্ষমতা, বিকৃত যৌন চিন্তা, দমিত রাগ বা আবেগীয় বিকৃতি থেকে অপরাধের প্রেরণা তৈরি হতে শুরু করে।
২. ভেতরের নৈতিক বাধা দুর্বল হয়ে যাওয়া (Weakening of Internal Inhibitions)
সহানুভূতি, বিবেক, অপরাধবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে।
৩. সামাজিক ও বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়া (Breakdown of External Barriers)
পরিবার, সমাজ ও বিচারব্যবস্থার নীরবতা বা দুর্বলতা অপরাধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
৪. শিশুর প্রতিরোধ অকার্যকর করে ফেলা (Overcoming the Child’s Resistance)
ভয়, প্রলোভন, বিশ্বাসের অপব্যবহারের মাধ্যমে শিশুকে অসহায় করে ফেলা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশু যৌন অপরাধী ক্লিনিক্যাল অর্থে Pedophile নন। অর্থাৎ, শিশুর প্রতি স্থায়ী যৌন আকর্ষণই সব ক্ষেত্রে মূল কারণ নয়। অনেকেই বরং আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বল, অসামাজিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন (antisocial traits), অথবা সুযোগসন্ধানী এবং তারা প্রায়ই অপরিচিত কেউ নয়। তারা হতে পারে— আত্মীয়, শিক্ষক, গৃহশিক্ষক, প্রতিবেশী, পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অর্থাৎ, যাদের ওপর শিশুটি সবচেয়ে বেশি ভরসা করে, অনেক সময় অপরাধী সেখান থেকেই আসে।
নতুন বাস্তবতা: ডিজিটাল অনুঘটক
আজকের ডিজিটাল পৃথিবী এই ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সন্তান কী দেখছে, কার সঙ্গে কথা বলছে, কখন আচরণ বদলে যাচ্ছে— অনেক সময় কেউ খেয়ালই করে না। এই অমনোযোগই অনেক অপরাধীর জন্য সুযোগ তৈরি করে।
প্রতিরোধ কোথায়?
যেহেতু একজন যৌন অপরাধী একদিনে তৈরি হয় না, প্রতিরোধও একদিনের কাজ নয়।
শৈশবে— নিরাপদ সম্পর্কের ভিত্তি (secure attachment) তৈরি করুন, শিশুর আবেগকে গুরুত্ব দিন, পরিবারে নারীর প্রতি সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করুন, “মজার” নামে অপমানকে স্বাভাবিক হতে দেবেন না, শিশুদের নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ (good touch–bad touch) শেখান।
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে— বয়স ও মানসিক পরিপক্কতা অনুযায়ী যৌনতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলুন, সন্তানের অনলাইন জগৎ সম্পর্কে সচেতন থাকুন, আবেগ নিয়ন্ত্রণ (emotion regulation) শেখান। অন্যায় করলে প্রশ্রয় দেবেন না। মনে রাখবেন, ছোট ছোট অন্যায়কে অবহেলা করার মধ্য দিয়েই বড় অপরাধীর জন্ম হতে পারে।
কাজেই শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার পুরো পথজুড়েই— পরিবার, শিক্ষা, সম্পর্ক, আবেগ ও সামাজিক শিক্ষার প্রতিটি স্তরে সচেতন প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। কারণ শুধু অপরাধের পর শাস্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; এমন অপরাধ জন্ম নেওয়ার পরিবেশ ও মানসিকতার পথগুলোও বন্ধ করতে হবে।
শিশুর সুরক্ষা তাই শুধু আইনের দায়িত্ব নয়। এটি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব— যেন আমরা শুধু অপরাধীর বিচারই না করি, বরং ভবিষ্যতের অপরাধী তৈরি হওয়াও প্রতিরোধ করতে পারি।
-ডা. হুমায়রা শাহজাহান হৃদি
শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

