রামিসা। একটি ছোট্ট শিশু। যার পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল নিরাপদ শৈশব, স্কুলের খাতা, গল্প আর স্বপ্নে ভরা ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই পৃথিবীকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে এক ভয়ংকর বিকৃত মানসিকতা। সাম্প্রতিক সময়ে রামিসাসহ দেশে একের পর এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আমাদের শুধু শোকাহত করছে না, বরং সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক ভয়াবহ মানসিক ও সামাজিক সংকটকে সামনে এনে দিচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে—কীভাবে একজন মানুষ একটি শিশুর প্রতি এমন নিষ্ঠুর হতে পারে?
মনোবিজ্ঞান ও মনোরোগবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে শিশু ধর্ষণ কেবল যৌন আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য ও বিকৃত মানসিক তৃপ্তির প্রকাশ। শিশুদের টার্গেট করা হয় কারণ তারা দুর্বল, সহজে ভয় পায়, প্রতিরোধ করতে পারে না এবং অনেক সময় ঘটনাটি প্রকাশ করার ক্ষমতাও তাদের থাকে না।
এই ধরনের অপরাধীদের একটি অংশের মধ্যে কিছু গুরুতর মানসিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যেমন—সহানুভূতির ঘাটতি, অনুশোচনাহীনতা, আবেগপ্রবণ (impulsive) আচরণ, আগ্রাসী মনোভাব (aggression), ধর্ষকামী প্রবণতা (sadistic tendency) এবং অন্যের কষ্টে আবেগহীনতা। অনেকের মধ্যে সমাজবিরোধী ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য (antisocial personality traits) বা psychopathy-ও বিদ্যমান থাকতে পারে।
Psychopathy বলতে ব্যক্তির এমন এক বৈশিষ্ট্যকে বোঝায়, যেখানে ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক মনে হলেও তার মধ্যে থাকে গভীর আবেগের শূন্যতা (emotional emptiness), প্রভাবিত করার কৌশল (manipulation), মিথ্যাচার এবং অন্যের অনুভূতির প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীনতা। এরা অনেক সময় অন্য মানুষকে “মানুষ” হিসেবে নয়, বরং নিজের তৃপ্তি বা নিয়ন্ত্রণের বস্তু হিসেবে দেখতে শুরু করে। যখন এর সঙ্গে যৌন বিচ্যুতি (sexual deviance), আগ্রাসী মনোভাব (aggression) ও power fantasy যুক্ত হয়, তখন শিশুরা ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি—সব মানসিক রোগী অপরাধী নয়, এবং সব অপরাধী “পাগল”ও নয়। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই অপরাধগুলো পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়। অনেক sexual predator বা যৌন নিপীড়ক সমাজে স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করে, সমাজে মিশে থাকে এবং সুযোগ পেলেই দুর্বল শিশুকে টার্গেট করে।
ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাগুলোও কেবল ক্ষণিকের রাগের ফল নয়। অনেক সময় তা ঘটে পরিচয় গোপন করতে, ধরা পড়ার ভয় থেকে, চরম আগ্রাসন (extreme aggression)-এর কারণে অথবা ভুক্তভোগীকে চিরতরে “নিশ্চুপ” করে দিতে।
এই ভয়াবহ বাস্তবতার পেছনে কিছু সামাজিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিশুদের Body Safety Education এর অভাব, পরিবারে যৌন (sexual) বিষয় নিয়ে চরম নীরবতা, নারীবিদ্বেষী ও সহিংস মনোভাব, পর্নোগ্রাফি ও সহিংস সেক্সুয়াল কনটেন্ট-এর অনিয়ন্ত্রিত প্রকাশ, মাদকাসক্তি, অপরাধের বিচারহীনতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অজ্ঞতা—সব মিলেই তৈরি হচ্ছে এক বিপজ্জনক সামাজিক পরিবেশ।
শিশু সুরক্ষার জন্য আমাদের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, শিশুদের বয়সোপযোগী Body Safety Education দিতে হবে। “Good touch–Bad touch”, “No means No”, এবং Unsafe situation চিনতে শেখানো জরুরি। শিশুকে এমন পরিবেশ দিতে হবে যেখানে সে ভয় ছাড়াই নিজের অভিজ্ঞতা বলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, পরিবারকে হতে হবে শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। সন্তান আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অস্বাভাবিক ভয়, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, যৌন সংশ্লিষ্ট আচরণ (sexualized behaviour) বা আগ্রাসী মনোভাব দেখা দিলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
তৃতীয়ত, স্কুল ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে Child Protection Policy কার্যকর করতে হবে। একইসাথে আচার আচরণে সমস্যা, আগ্রাসী মনোভাব, নিষ্ঠুরতা, জিনিসপত্র ভাঙচুর বা সমস্যাপূর্ণ যৌন আচরণ-এর মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের ক্ষেত্রে দ্রুত মানসিক ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।
সবশেষে, দ্রুত বিচার ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ বিচারহীনতা অপরাধীর সাহস বাড়ায়, আর সমাজের নীরবতা অপরাধকে আরও স্বাভাবিক করে তোলে।
রামিসাদের হারানোর পর শুধু কয়েকদিনের ক্ষোভ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ যথেষ্ট নয়। প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সামাজিক, নৈতিক এবং মানবিক দায়িত্ব।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় নির্ভর করে তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষগুলো কতটা নিরাপদ—তার উপর। আর শিশুদের চেয়ে দুর্বল, নির্ভরশীল ও নিষ্পাপ আর কেউ নেই।
আর কোনো রামিসা যেন এভাবে আমাদের বিবেককে না কাঁদায়—এ দায় আমাদের সবার।
- — ডা. মিউরিন হোসেন
- এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য)
- এমডি (চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রি)

