বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েরা কেন বেপরোয়া হয়ে ওঠে? দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানো, মাদক গ্রহণ কিংবা অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্কের মতো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কেন তারা বারবার জড়িয়ে পড়ে? বিজ্ঞান বলছে, এটি কেবল কোনো চারিত্রিক ত্রুটি নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তনের এক জটিল রসায়ন।
১. ‘বয়স-অপরাধ বক্ররেখা’ (Age-Crime Curve)
গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ বছর বয়স থেকে অপরাধমূলক প্রবণতা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং ১৬ বছরের দিকে এটি শীর্ষে পৌঁছায়। আবার কৈশোরের শেষ দিকে এসে তা নাটকীয়ভাবে কমতে শুরু করে। সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘এজ-ক্রাইম কার্ভ’। এই ঝুঁকিগুলো সামাল দিতে হলে কিশোর মস্তিষ্কের ভেতরের পরিবর্তনগুলো আমাদের বুঝতে হবে।
২. মস্তিষ্কের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার যুদ্ধ
কৈশোরে মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। এই সময়ে প্রধানত তিনটি সিস্টেমের মধ্যে এক ধরণের লড়াই চলে:
রিওয়ার্ড সিস্টেম (Reward System): এই সময়ে মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক নিউরোট্রান্সমিটারের প্রবাহ বেড়ে যায়। ফলে যেকোনো উত্তেজনামূলক কাজ বা পুরস্কার পাওয়ার আনন্দ তাদের কাছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি লোভনীয় মনে হয়—বিশেষ করে যখন পাশে সমবয়সী বন্ধুরা থাকে।
বিপদ সংকেত ব্যবস্থা (Warning System): মজার ব্যাপার হলো, যেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের মস্তিষ্ক বিপদ দেখলে সতর্ক হয়, কিশোরদের মস্তিষ্কের সেই অংশটি (অ্যামিগডালা) এই সময়ে কিছুটা ঝিমিয়ে থাকে। ফলে তারা নেতিবাচক ফলাফল নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামায় না।
নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Regulatory System): পরিকল্পনা করা বা ভালো-মন্দের বিচার করার যে অংশ (এক্সিকিউটিভ ফাংশন), সেটির বিকাশ হতে হতে প্রায় বিশ বছরের কোঠা পেরিয়ে যায়।
সহজ কথায়, কিশোরদের মস্তিষ্কের ‘এক্সিলারেটর’ (উত্তেজনা) পুরোদমে চালু থাকলেও তাদের ‘ব্রেক’ (নিয়ন্ত্রণ) তখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
৩. ট্রমা ও অপরাধপ্রবণতার গভীর সম্পর্ক
কিশোর অপরাধ কেবল হরমোনের খেলা নয়, এর শিকড় অনেক সময় শৈশবের অভিজ্ঞতায় প্রোথিত থাকে।
পরিবেশের প্রভাব: যাদের শৈশব ভালোবাসা ও সহায়তার মধ্যে কাটে, তারা মস্তিষ্কের এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ সময়টা সহজেই পার করে দেয়।
শৈশবের ক্ষত: কিন্তু শৈশবে যারা শারীরিক বা মানসিক নিগ্রহের শিকার হয়, তাদের ‘স্ট্রেস রেসপন্স সিস্টেম’ অকেজো হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে না কাকে বিশ্বাস করবে বা কোনটি নিরাপদ।
অভিভাবকের ভূমিকা: যেসব শিশুর অভিভাবকরা মানসিকভাবে অনুপস্থিত থাকেন, তারা প্রায়ই বিপথগামী হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বড় বড় অপরাধীদের জীবনের পেছনের গল্পটি আসলে শৈশবের চরম অবহেলা আর ট্রমার ইতিহাস।কৈশোরের এই সময়টা হলো এক ধরণের ‘পরিবর্তনের ঝড়’। বিচারবুদ্ধি ও যুক্তির পূর্ণ বিকাশ ঘটতে সময় লাগে। তাই কিশোরদের কেবল ‘বিপথগামী’ তকমা না দিয়ে, তাদের মস্তিষ্কের এই সীমাবদ্ধতাগুলো বুঝে সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাদের সঠিক পথে গাইড করা জরুরি।
References
- Braams, B. R., & Krabbendam, L. (2022). Adolescent development: From neurobiology to psychopathology. Current Opinion in Psychology, 48, 1-3. Article 101490. doi.org/10.1016/j.copsyc.2022.101490
- Evans-Chase, M. (2014). Neuroscience of Risk-taking in Adolescence, Chapter 17 in Matto, H., Strolin-Goltzman, J. & Ballan, M, (Eds) Neuroscience for Social Work: Current Research and Practice. Springer Publishing Co., New York
- Scott, E. & Steinberg, L. (2008) Rethinking juvenile justice. President & Fellows of Harvard College
- Smith, W. (2014) The Role of Neurobiology in Social Work Practice with Youth Transitioning from Foster Care. Chapter 8 in Matto, H., Strolin-Goltzman, J. & Ballan, M, (Eds) Neuroscience for Social Work: Current Research and Practice. Springer Publishing Co., New York
মূল নিবন্ধ: ”The Adolescent Brain and Delinquency”- Psychology Today (January 2026)
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও দেখুন-


