একটি শিশুর জন্য পরিবার হলো প্রথম পাঠশালা। মা-বাবার সম্পর্কের গুণমান তার মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক বিকাশে মৌলিক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যখন মা-বাবার মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ, কলহ এবং মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়, তখন সেই পরিবেশ শিশুদের জন্য হয়ে ওঠে মানসিক বিকারের উৎস। এমনকি যদি মা-বাবা সরাসরি শিশুকে কিছু না বলে, তবুও শিশুরা ঘরের বাতাসে থাকা উত্তেজনা ও অস্থিরতা অনুভব করে এবং তার প্রভাব পড়ে তাদের মনোজগতে।
১. মানসিক প্রভাব:
১.১ নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের সৃষ্টি:
শিশুদের মনে নিরাপত্তার অনুভব সবচেয়ে বেশি আসে মা-বাবার সম্পর্কের স্থিতিশীলতা থেকে। কিন্তু যখন তারা দেখে মা-বাবা পরস্পরকে সন্দেহ করছেন, ঝগড়া করছেন বা আলাদা থাকছেন, তখন শিশুর মনে ভীতির সঞ্চার হয়।
শিশুর ধারণা হয়: “আমার পরিবার ভেঙে যেতে পারে।”
অনেকে মনে করে, “আমি কি কিছু ভুল করেছি?”
আরও দেখুন…
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অলসতা: প্রযুক্তির প্রভাব ও আমাদের ভবিষ্যৎ
- অতিরিক্তি হস্তমৈথুন থেকে মুক্তির উপায়
১.২ আবেগের ভারসাম্য হারানো:
দাম্পত্য কলহের ফলে শিশুরা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে না। তারা হয় অতিমাত্রায় চুপচাপ হয়ে পড়ে, নয় তো অত্যন্ত রাগী ও বিদ্রোহী হয়।
হাসিখুশি থাকা কমে যায়
ছোটোখাটো বিষয়ে অতিরিক্ত কাঁদে বা রেগে যায়
১.৩ আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার অভাব:
যেসব শিশুরা সবসময় অশান্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তারা নিজেকে অবমূল্যায়ন করতে শেখে। মা-বাবার ভালোবাসা পায় না বলে তারা ভাবে, “আমি অপ্রয়োজনীয়।”

২. শিক্ষাগত ও সামাজিক প্রভাব:
২.১ পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায়:
শিশুর মন যদি সবসময় চিন্তায় ভরা থাকে-“আজ আবার মা-বাবা ঝগড়া করবে কি না?” তাহলে তারা স্কুলে মনোযোগ দিতে পারে না।
পরীক্ষার ফল খারাপ হয়
শিক্ষক বা সহপাঠীদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়।
২.২ সামাজিক মেলামেশায় সমস্যা:
পারিবারিক অশান্তি অনেক সময় শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
তারা আত্মগোপনে চলে যায়
বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে ভয় পায়, কারণ নিজের পরিবার নিয়ে লজ্জা পায়।
৩. দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও নৈতিক প্রভাব:
৩.১ বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ (Depression and Anxiety):
ক্রমাগত পারিবারিক টেনশন থেকে শিশুদের মস্তিষ্কে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়। এতে ভবিষ্যতে মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
ঘুমের সমস্যা
খাওয়া-দাওয়ার অনিয়ম
আত্মহত্যার চিন্তা পর্যন্ত দেখা যেতে পারে
৩.২ সম্পর্কের প্রতি অবিশ্বাস:
যে শিশু দেখেছে তার মা-বাবা একে অপরকে বিশ্বাস করে না, সেই শিশু ভবিষ্যতে নিজের জীবনসঙ্গীকেও সন্দেহ করতে পারে।
বন্ধুত্বে স্থায়িত্ব থাকে না
প্রেম বা বৈবাহিক সম্পর্কে ভয় বা অনীহা তৈরি হয়
৩.৩ অপরাধপ্রবণতা:
দাম্পত্য দ্বন্দ্ব থেকে বেড়ে ওঠা অনেক শিশু পরে মাদকাসক্তি, সহিংসতা বা অপরাধমূলক আচরণে জড়িয়ে পড়ে।
তারা ভালো-মন্দ বিচার করতে শেখে না
হতাশা থেকে তারা ভুল পথে চলে যেতে পারে

করণীয় / সমাধানমূলক পরামর্শ:
মা-বাবার প্রতি:
পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও খোলামেলা যোগাযোগ বজায় রাখুন
ঝগড়া বা মতানৈক্য হলে তা শিশুর সামনে না দেখিয়ে একান্তে সমাধান করুন।
সন্দেহ হলে একজন পেশাদার কাউন্সেলরের সহায়তা নিন।
সন্তানকে নিয়মিত সময় দিন, কথা বলুন, বোঝার চেষ্টা করুন।
সমাজের প্রতি:
স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে কাউন্সেলিং চালু করা
পরিবার-ভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি আয়োজন করা
পারিবারিক সহিংসতা বা মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার জন্য হেল্পলাইন চালু করা
সন্তানের প্রতি:
তাকে বোঝান যে বড়োদের সমস্যা তার কারণে না
তার অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখান
প্রয়োজনে মনোবিদ বা কাউন্সেলরের কাছে নিয়ে যান।
একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল পরিবার শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। মা-বাবার পরস্পরের প্রতি সন্দেহ শুধু তাদের সম্পর্কই নষ্ট করে না, বরং শিশুর সারাজীবনের মানসিক গঠনে গভীর নেতিবাচক ছাপ ফেলে। তাই সব মা-বাবার উচিত নিজেদের সমস্যাগুলো পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহানুভূতির মাধ্যমে সমাধান করা-যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদ, আত্মবিশ্বাসী ও মানসিকভাবে সুস্থভাবে গড়ে উঠতে পারে।
- ডা. অনন্যা কর
- মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, এমবিবিএস, এমডি (সাইকিয়াট্রি)


