স্মৃতিশক্তি একটি মানসিক প্রক্রিয়া যা তথ্য অর্জন জমা রাখা এবং পরবর্তিতে পুনরায় মনে করা বোঝায়। স্মরণশক্তি দ্বারা মানুষ অতীতের সাথে বর্তমানের সামঞ্জস্য করে কাজকর্ম করে থাকে। এটি ব্রেইনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। স্মৃতিশক্তির সমস্যা বলতে আমাদের মনে তথ্য জমা রাখা বা পুনরায় স্মরণ করার ব্যর্থতা বোঝায়। স্মৃতিশক্তির সমস্যা যেকোনো মানুষকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে ও কাজ করতে বাধাগ্রস্ত করতে পারে যা মানুষের সামাজিক কাজকর্ম, সমস্যা সমাধান এবং কথাবার্তা প্রভৃতির মাধ্যমে বোঝা যায়। বয়সের সাথে সাথে মানুষের স্মৃতিশক্তি কমতে থাকে। তবে বিভিন্ন রোগের কারণে, মাথায় আঘাত পেলে, বিভিন্ন ঔষধ সেবন, ভিটামিন ঘাটতি এমনকি দীর্ঘমেয়াদি অতিরিক্ত নেশাদ্রব্য গ্রহণ স্মৃতিশক্তি নষ্টের কারণ হতে পারে। সাধারণত অ্যালকোহল, গাঁজা, কোকেইন এমনকি প্রেসক্রিপশনের ঔষধ সেবনকারীদের মাঝে স্মৃতিশক্তির সমস্যা বেশি দেখা যায়। এসব দ্রব্যাদি ব্রেইনে নিউরোকেমিক্যাল রিয়েকশন অথবা হঠাৎ বন্ধ করার জন্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টির দ্বারা এবং অন্যান্য উপায়ে যেমন রক্তনালী কিংবা লিভারের ক্ষতির মাধ্যমে স্মৃতিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে যেখানে রোগীর বিদ্যমান শারীরিক ও মানসিক অবস্থা রোগীর স্মরণশক্তির ব্যাঘাত ঘটাকে প্রভাবিত করতে পারে। স্বল্পমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের সমস্যাই নেশাদ্রব্য গ্রহণের জন্য হতে পারে।
আরও দেখুন…
স্মৃতিশক্তির সমস্যার ধরনসমূহ
ক. স্বল্পমেয়াদি প্রতিক্রিয়া:
স্বল্পমেয়াদি মেমোরি সিস্টেম আমাদের দৈনন্দিন জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অ্যালকোহল, গাঁজা, সিডেটিভ ঔষধ মানুষের নতুন তথ্য মনে রাখায় ব্যাঘাত ঘটায় যা নিম্নোক্তভাবে আমরা দেখি:
ভুলে যাওয়া: একজন মানুষ কিছুক্ষণ আগের কথাবার্তা, অ্যাপয়েন্টমেন্ট অথবা সাধারণ কাজকর্ম মনে রাখতে পারেন না।
কগনিটিভ ফাংশনে সমস্যা: মনোযোগ দেওয়া এবং মনোযোগ ধরে রাখা উভয়ই আক্রান্ত হয়।
সিদ্ধান্তহীনতা: স্মৃতিশক্তির সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। কারণ যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য স্মৃতিতে জমা থাকা পূর্ব অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্য কাজে লাগে। অনেকে পরিণতি না ভেবেই বেপরোয়া হয়ে এমন কাজকর্ম করেন যা দুর্ঘটনার কারণ হয়। অ্যালকোহল সেবনে এ ধরনের সমস্যা বেশি হয়।

খ. দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া:
নেশাদ্রব্য দীর্ঘদিন গ্রহণে মানুষের স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি উভয় মেমোরি সিস্টেমই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সমস্যা সমাধান, পরিকল্পনা, জটিল চিন্তা-ভাবনার ক্ষমতা কমে যায় যা ব্যক্তির দৈনন্দিন কাজকর্ম ও আচার-আচরণে প্রভাব ফেলে থাকে।
নেশাজাতীয় দ্রব্যে কীভাবে স্মরণ শক্তি নষ্ট হয়?
- মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট হওয়া। ব্রেনের যে অংশে স্মৃতি জমা হয়, যেমন: হিপ্পোক্যম্পাসের ক্ষয়।
- নিউরনের কানেকশন নষ্ট হয় যা তথ্য গ্রহণ, সংরক্ষণে এবং পুনরায় মনে করার জন্য প্রয়োজন।
- নিউরোট্রান্সমিটারের পরিবর্তন। নিউরোট্রান্সমিটার হলো এক ধরনের কেমিক্যাল যা মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানে কাজে লাগে। দীর্ঘদিন নেশাজাতীয় উপাদান সেবন করলে মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটারের সাম্যাবস্থা নষ্ট হয়ে স্মৃতিশক্তির ব্যাঘাত ঘটে।
বিভিন্ন নেশাদ্রব্যের প্রভাব
অ্যালকোহল: অ্যালকোহল সেবন মানুষের স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনেরই স্মৃতিশক্তির সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যারা বেশ কয়েকবার এটি সেবন করেন তাদের এটি সেবনের দিনের ঘটনা মনে থাকে না যাকে ব্ল্যাকআউট বলা হয়। আর যারা দীর্ঘদিন আলোক সেবন করে তাদের শরীরে ভিটামিন বি ১ এর ঘাটতি দেখা দিয়ে স্থায়ী স্মরণশক্তির সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গাঁজা: গাঁজা সেবনে ব্রেইনের স্থায়ী পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘদিন এটি সেবন করলে এর মূল উপাদান (ক্যানাবিনোয়েড) যা আনন্দের অনুভূতি আনে সেটি স্মৃতিশক্তির ব্যাঘাত ঘটায়।
একসটাসি: যারা অন্তত এক বছর এই ক্লাব মাদকটি সেবন করেন তাদের স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি স্মরণশক্তি আক্রান্ত হতে পারে।
কোকেইন: কোকেইন ব্রেইন এবং স্পাইনাল কর্ডের স্নায়ুকে উদ্দীপ্ত করার দ্বারা মানুষকে অধিক উদ্যমী এবং কর্মক্ষম করে। গবেষণায় দেখা গেছে যারা কোকেন নেয় তাদের ১ বছর পর কগনিটিভ স্কিল বিশেষ করে স্বল্পস্থায়ী স্মৃতি সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক কম থাকে।
পিসিপি বা ফেনসাইক্লিডিন: এটি একটি মাদক যা প্রধানত হেলুসিনেশন করে। দীর্ঘসময় এটি ব্যবহারে মানুষের স্মৃতিশক্তি বিশেষ করে শর্ট টার্ম মেমোরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাইলসাইবিং অথবা মেজিক মাশরুম: এটিও প্রধানত হেলুসিনেশন তৈরি করে। বেশিদিন ব্যবহারে ক্ষণস্থায়ী স্মৃতি নষ্ট হয়, যেমন-কোনো নির্দেশনা অথবা ফোন নাম্বার ভুলে যাওয়া ইত্যাদি।
ওপিয়েট: এটি যেমন বৈধ উপায়ে ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয় তেমনই অবৈধ উপায়েও এর ব্যবহার রয়েছে। যারা দীর্ঘদিন এটি সেবন করেন তাদের ওয়ার্কিং মেমোরিতে সমস্যা হয়।
মাদকের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত স্মৃতিশক্তি কি পুনরায় ঠিক হতে পারে?
এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে যারা কোকেন সেবন করে তাদের মাদক ত্যাগ করার এক বছর পর স্মৃতিশক্তি কিছুটা উন্নতি হয়। তবে কার কতটুকু রিকোভারি হবে তা বলা যায় না। যদিও সময়ের সাথে সাথে মস্তিষ্কের কোষ নতুন করে তৈরি হয় তবে মাদক পরিত্যাগ করার পর স্মৃতি ফিরে আসার পরিমাণ এবং সময় বিভিন্ন মানুষের আলাদা হয়।
করণীয়
মাদক ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়ের জন্যই ভয়াবহ অভিশাপ। মাদক গ্রহণ থেকে বিরত রাখা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্য চিকিৎসা প্রদান, বিভিন্ন সাইকোথেরাপি ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসা করা হয়। কেবল স্মৃতিশক্তির সমস্যার জন্য নয়, বরং মাদকের জন্য সৃষ্ট শারীরিক সমস্যা, ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের উপর মাদকের প্রভাব থেকে মুক্তির জন্য একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা খুব জরুরি।
- ডা. দিল মোহাম্মদ সাজ্জাদুল কবির সবুজ
- রেজিস্টার, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।

আরও দেখুন

