সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আইন-কানুন অপরিহার্য। কিন্তু কিছু ব্যক্তি বারবার নিয়ম ভঙ্গ করে বা আইন অমান্য করে। এদের আচরণ কি শুধুই নৈতিক অবক্ষয়ের ফল, নাকি এর গভীরে রয়েছে মানসিক রোগের প্রভাব? আধুনিক সাইকিয়াট্রিক গবেষণায় দেখা যায়, নির্দিষ্ট মানসিক রোগের কারণে ব্যক্তির রুলস ব্রেকিং প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে। এই প্রবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব মানসিক রোগ ও আইন ভাঙার আচরণের সম্পর্ক, এবং কোন কোন মানসিক রোগে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায় তা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করবো।
আইন ভাঙার প্রবণতা এবং মানসিক রোগের সম্পর্ক:
আইন ভাঙা সবসময়ই ইচ্ছাকৃত দুষ্ট প্রবৃত্তির প্রকাশ নয়। ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য যদি দুর্বল হয়, তবে তার বিচারবোধ, আত্ম-সংযম এবং সামাজিক আচরণে গুরুতর বিঘ্ন ঘটতে পারে। বিশেষ করে কিছু নির্দিষ্ট মানসিক ব্যাধি নিয়মভঙ্গের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, কারাবন্দিদের মধ্যে মানসিক রোগের হার সাধারণ জনসংখ্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। ফলে বোঝা যায়, অপরাধমূলক আচরণ এবং মানসিক রোগের মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে।
প্রধান মানসিক রোগসমূহ এবং আইন ভাঙার ঝুঁকি:
১. অ্যান্টি-সোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (ASPD):
ASPD আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই –
# মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা এবং অপরের প্রতি সহানুভূতির অভাব দেখায়।
# নিজস্ব লাভের জন্য নিয়ম-কানুন অবজ্ঞা করে।
# অপরাধের পর অনুশোচনা বোধ করে না।
এদের আচরণ প্রায়শই আইন ভাঙ্গার দিকে নিয়ে যায়। ছোটবেলায় Conduct Disorder-এর উপস্থিতি ভবিষ্যতের ASPD-এর পূর্বাভাস দেয়।
২. বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (BPD):
BPD রোগীরা আবেগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে-
# ঝুঁকিপূর্ণ যৌনাচার
# মাদকাসক্তি
# অপরাধমূলক কার্যক্রমে যুক্ত হয়
তাদের আচরণ অনেক সময় তীব্র মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পরিচালিত হয়, যা বাইরের দৃষ্টিতে আইনের লঙ্ঘন বলে মনে হয়।
৩. বাইপোলার ডিসঅর্ডার:
বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ম্যানিক পর্বে-
# অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
# অবৈধ লেনদেন, চুরি, দুর্নীতির মত অপরাধ সংঘটিত হতে পারে।
# ম্যানিক অবস্থা ব্যক্তি বুঝতেই দেয় না যে তার কাজ আইনভঙ্গের শামিল।
৪. স্কিজোফ্রেনিয়া ও সাইকোসিস:
হ্যালুসিনেশন বা ভ্রান্ত বিশ্বাসের ফলে-
# ব্যক্তি বাস্তবতার সংযোগ হারিয়ে ফেলে।
# নিজের ও অন্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে।
# পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়।
তবে মনে রাখা জরুরি, অধিকাংশ স্কিজোফ্রেনিয়া রোগী শান্তিপূর্ণ এবং অপরাধ প্রবণ নয়।
৫. সাবস্ট্যান্স অ্যাবিউজ ডিসঅর্ডার (মাদকাসক্তি):
মাদক গ্রহণের ফলে-
# বিচারবোধ দুর্বল হয়।
# আর্থিক সংস্থান বা নেশার সংস্থান করতে চুরি, ছিনতাই, বা অবৈধ কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে।
# অনেক মানসিক রোগের সাথে মাদকাসক্তির যোগফল আইনের প্রতি অশ্রদ্ধার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।
৬. নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (NPD):
NPD আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের উচ্চতর ও বিশেষ মনে করে-
# আইনকে নিজেদের জন্য প্রযোজ্য মনে করে না।
# নিজস্ব সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙ্গে।
# ক্ষমতার অপব্যবহার বা প্রতারণামূলক কাজ করতে পারে।
৭. অপজিশনাল ডিফায়েন্ট ডিসঅর্ডার (ODD):
বিশেষত শিশু ও কিশোরদের মধ্যে দেখা যায়-
# কর্তৃপক্ষের প্রতি ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা।
# নিয়ম-কানুনের প্রতি অবজ্ঞা।
# দায়িত্বশীল ব্যক্তির আদেশ অমান্য করা।
ODD যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং চিকিৎসা না হয়, তবে এটি ভবিষ্যতে ASPD-তে রূপ নিতে পারে।
৮. ইম্পালস কন্ট্রোল ডিসঅর্ডার:
যেমন: ক্লেপটোম্যানিয়া (চুরি করার অপ্রতিরোধ্য তাগিদ), পাইরোম্যানিয়া (আগুন লাগানোর প্রবণতা) ইত্যাদি।
# এই রোগীরা নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আইন ভাঙ্গে।
#:আচরণ পরবর্তীতে অনুশোচনা সৃষ্টি করলেও, ঘটনাকালে তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়।
৯. পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD):
ভয়াবহ ট্রমার পর-
# ব্যক্তি সহজেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে।
# আইন ভঙ্গের মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে জড়িয়ে পড়তে পারে।
# বিশেষত নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বা হঠাৎ ভয়ের প্রতিক্রিয়ায় সহিংস আচরণ হতে পারে।
১০. মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (MDD):
গভীর হতাশায়-
# কিছু ব্যক্তি আত্মঘাতী চিন্তায় আক্রান্ত হয়।
# সমাজের নিয়মকে মূল্যহীন মনে করে।
# আত্মবিনাশী কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে আইন লঙ্ঘন করতে পারে (যেমন: জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কার্যকলাপ)।
সামাজিক, পারিবারিক ও পরিবেশগত প্রভাব
শুধু মানসিক রোগই নয়, পরিবার, সমাজ ও পরিবেশও আইনভঙ্গের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়:
* শিশুকালীন নির্যাতন ও অবহেলা
* দারিদ্র্য ও অপরাধপ্রবণ সমাজে বসবাস
* অশান্ত পারিবারিক পরিবেশ
* সহিংসতা বা অপরাধে সামাজিক অনুকরণ
এসব কারণ ব্যক্তি বিশেষের মানসিক দুর্বলতা আরো বাড়িয়ে দেয় এবং নিয়ম ভাঙার প্রবণতা তৈরি করে।
আইন, বিচার ও মানসিক স্বাস্থ্য: সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি:
Mental Health Courts (বিশেষ আদালত) তৈরি হয়েছে অনেক দেশে, যেখানে মানসিক রোগী অপরাধীদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশসহ অনেক দেশে মানসিক স্বাস্থ্য আইন রোগীদের অধিকার সংরক্ষণ এবং জোরপূর্বক চিকিৎসার বিধান দেয়।
অপরাধী মানসিক রোগী হলে শুধুমাত্র শাস্তি নয়, তার চিকিৎসাও নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে অপরাধ পুনরাবৃত্তি না হয়।
প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ:
১. প্রারম্ভিক মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং – শিশুকাল থেকেই মানসিক সমস্যা চিহ্নিত করা।
২. জনসচেতনতা বৃদ্ধি – মানসিক রোগ নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার দূর করা।
৩. সুলভ ও সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা – সকল স্তরের মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া।
৪. পুনর্বাসন ও সাপোর্ট সিস্টেম – আইন ভেঙে ফেলা মানসিক রোগীদের জন্য পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু রাখা।
মানসিক রোগ এবং আইনভঙ্গ আচরণের মধ্যে গভীর ও জটিল সম্পর্ক রয়েছে। যদিও সব মানসিক রোগী অপরাধপ্রবণ নয়, তবে কিছু নির্দিষ্ট রোগে নিয়ম ভাঙার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এই বিষয়ে মানবিক, চিকিৎসাকেন্দ্রিক এবং আইনি সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কেবলমাত্র দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন এবং যথাযথ সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই আমরা মানসিক রোগীদের সুরক্ষা দিতে এবং সমাজে শান্তি বজায় রাখতে পারবো।
ডা. রুবাইয়াৎ ফেরদৌস
সহকারী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি বিভাগ , ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও দেখুন-


