পেশায় আমি একজন মনোবিজ্ঞানী। শিশুদের মনোজগৎ নিয়ে কাজ করাই আমার জীবনের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য থেকেই একবার সুযোগ হয়েছিল পাচার হয়ে যাওয়া শিশুদের নিয়ে কাজ করার। যারা শৈশবেই সীমান্ত পেরিয়ে ভিনদেশে পাচার হয়ে গিয়েছিল, তাদের সেই অন্ধকার দিনগুলোর গল্প শোনার অভিজ্ঞতা থেকেই আজ কিছু কথা বলতে চাই।
শিশুর কাঁধে যখন বড়দের বোঝা
আমাদের সমাজে একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করেছি। চৌদ্দ, পনেরো বা ষোলো বছর বয়সী মেয়েদের সমাজ আর ‘শিশু’ মনে করে না। মনে করা হয়, তারা এখন অর্থ উপার্জন করবে, সংসার চালাবে নয়তো তাদের বিয়ে দিতে হবে। এইটুকু বয়সেই জীবনের কত শত দায়িত্ব এসে পড়ে তাদের কাঁধে! যেন তারা ভীষণ পরিণত কোনো মানুষ!
তাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, কেউ প্রেমিকের সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্নে বর্ডার পার হয়েছিল। কেউ কাজের মিথ্যা প্রলোভনে অচেনা কোনো মোবাইল নাম্বারের নির্দেশনায় ঘর ছেড়েছিল। আবার কেউ বাবা-মায়ের মতেই চেনা মানুষের সাথে গিয়েছিল কাজের আশায়। কিন্তু গিয়ে দেখে সবই ছিল মরীচিকা! ফিরে আসে একরাশ অন্ধকার অভিজ্ঞতা নিয়ে। আর তখন ঘরের মানুষরাও যেন তাদের পর হয়ে যায়। তখন ঘরে ফেরা আর বেঁচে থাকার লড়াই—দুটোই লড়তে হয় একসাথে।
শোনা এবং বোঝার লড়াই
আমার কাজ ছিল শুধু তাদের কথা শোনা। প্রত্যেকের সাথে কমপক্ষে ২-৩ বার করে কথা হয়েছে। এই সময়ে আমাকে নিয়মিত মনিটরিং করতেন যুক্তরাজ্যের একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, যাতে কথা বলতে গিয়ে সারভাইভাররা নতুন করে ট্রমাটাইজড না হয়ে পড়েন।
পেশাগত কারণে আমি সব সময় ‘নন-জাজমেন্টাল’ থাকার চেষ্টা করেছি। আমি চাইতাম তারা যেন আমার ওপর আস্থা রাখতে পারে। আমি কখনো তাদের প্রশ্ন করিনি— “কেন টাকার লোভে অচেনা লোকের সাথে গেলেন?” বা “পরিবারের চেয়ে সেই প্রেমিককে কেন আপন মনে হলো?” কেউ লম্বা সময় চুপ থাকত, কেউবা অনেক কথা বলত। কেউ একজন বলেছিল, “আপু, এই কথাগুলো আজ প্রথম আপনাকে বললাম!”
শেল্টার হোমের ‘মা-বাবা’ এবং একটি জীবন
কাজটি করতে গিয়ে চিনেছি অসংখ্য এনজিও এবং শেল্টার হোম। সেখানে পাচার থেকে ফিরে আসা শিশুরা এক নতুন জীবন গড়ে নিয়েছে। হোমে তাদের ‘মা’ আছেন, ‘বাবা’ আছেন যারা রাতদিন দেখভাল করেন। কেউ কেউ পুরো সময় হোমে থাকে, আবার কেউ সারাদিন বাইরে কাজ করে শুধু রাতে সেখানে ঘুমাতে আসে।
সব শিশুর স্বপ্ন এক
আমি শহরের আলিশান দালান থেকে শুরু করে বস্তি, সুবিধাবঞ্চিত বা পাচার হওয়া—সব ধরণের শিশুর সাথেই কথা বলেছি। কী অদ্ভুত ব্যাপার, সব শিশুই কিন্তু একই রকম স্বপ্ন দেখে! তারা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা পাইলট হতে চায়; মানুষের সেবা করতে চায়। আর সবচেয়ে বড় কথা—সব শিশুরাই কেবল ভালোবাসা খোঁজে।
চলে আসার সময় কেউ যখন বলত, “আপু, আমাদের সাথে খেয়ে যান,” তখন নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হতো। কারণ আমি তাদের বলতে পারিনি যে, তাদের সাথে দেখা করার জন্য আমাকে কত জায়গা থেকে অনুমতি নিয়ে আসতে হয়েছে।
এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা
সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুর সত্য হলো, আমরা কাজ পাই বলেই তাদের যন্ত্রণার কথাগুলো মন দিয়ে শুনি। সমাজসেবা যেমন প্রয়োজন, আমাদেরও তো অর্থ উপার্জনের পথ সচল রাখতে হয়। তাই আমরা প্রশ্ন করতে পারি না— “কারা শিশুদের পাচার করে? কেন নেয়? যারা আর ফিরে আসতে পারে না তাদের কী হয়?”
শুধু একজনের একটা কথা আজও কানে বাজে— “দুনিয়াতে যদি দোজখ বলে কিছু থাকে আপু, তাহলে আমি সেটা দেখে আসছি।”
আমি শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলি। বলতে পারি না যে আমারও খুব মন খারাপ হয়! মনে প্রশ্ন জাগে— সত্যিই কি এই পৃথিবীতে আমাদের কন্যারা নিরাপদ?
শর্টকাটের মোহে অন্ধকার নয়
পরিশেষে, স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই—আমরা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মন খারাপ করি, ঝগড়া করি, এমনকি আত্মহত্যার কথা ভাবি। পৃথিবীর বাইরের চাকচিক্য অনেক সুন্দর মনে হতে পারে, কিন্তু যতই সামনে আগাবেন ততই জীবনের কঠিন বাস্তবতা দেখতে পাবেন।
আমি বারবার বলি, জীবনের জন্য কোনো ‘শর্টকাট’ নেই। শর্টকাটের মোহে নিজের জীবন কারো হাতে তুলে দিয়ে আমরা যেন অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে না যাই।
শুভ কামনা।
-ফারজানা ফাতেমা।(রুমী)
-মনোবিজ্ঞানী
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও দেখুন-


