দেশে জুলাই, ২৪ সহিংসতার ঘটনা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে বা ফেলতে পারে তা জানার আগে আবারো জেনে নেই ০ থেকে ১৮ বছর বয়সিদেরকেই শিশু বলা হয়। তারা দেখতে লম্বা চওড়ায় যতই আমার-আপনার মতো হোক না কেনো।
ধনি গরিব সকল শিশুদের কাছে আকাশে প্লেন কিম্বা হেলিকপ্টার উড়ে যাওয়া দেখা ভীষণ এক আনন্দের খেলা। কিন্তু সেই একই ঘটনা যখন গত জুলাই, ২৪ এর আন্দোলনে তীব্র আতংক সৃষ্টি করেছিলো তখন একজন শিশুর শৈশব এর আনন্দকে কেড়ে নিয়ে তাকে হুমকির মুখে ফেলা হয়েছিলো। কারফিউ, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন এ যেন গত করোনা মহামারির চেয়েও শিশুদের জন্য এক ভয়ংকর বন্দিদশার স্মৃতি। গত জুলাই-এ কোটা আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রচাত্রীদের সাথে যখন স্কুল কলেজের ছাত্রচাত্রীদেরও যোগ দিতে দেখা যায় তখন আন্দোলন থামাতে এক পর্যায়ে প্রশাসনের গুলি, বোমা, আগুন, সংঘর্ষ, অপহরণ কোনো কিছুই বাদ যায় নি। অনেকে হারিয়েছে প্রিয় বন্ধু, সহপাঠিকে। ঝরেছে অসংখ্য শিশু-কিশোরের তাজা প্রাণ। স্কুল ইউনিফর্ম পরিহিত শিশুর বুকে গুলি, বিক্রিত লাশের ছবি-ভিডিও ঘুরে বেড়িয়েছে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে। আবার একই সাথে মিডিয়ার অপপ্রচার ছিলো, সে সকল শিশু নেশাগ্রস্ত থাকায় তাদেরকে গুলি করা হয়েছিল। এই নির্মম, বর্বরতা একটি জাতির জন্য কলংকিত অধ্যায়। যে সকল শিশু আহত কিম্বা শহীদ হয়েছে তাদের পরিবারের অন্যান্য শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী। সহিংসতার অভিজ্ঞতা প্রথমত একজন শিশুর কোমলতা কেড়ে নেয়। ঘৃণা, ক্ষোভ, ভয়, আতংক, নিরাপত্তাহীনতা, আত্মবিশ্বাসহিনতা তৈরি করে। শিশুর শারীরিক এবং মানসিক ক্ষতির কারণে ব্যক্তিত্বে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। আবার একই সাথে যে শিশুরা আন্দোলনে যেতে পারেনি তাদের মাঝে গ্লানিবোধ, লজ্জা, ব্যার্থ মনোভাব তৈরি হতে দেখা গেছে। এ সহিংসতায় শিশুদের মাঝে মৃত্যুকে আলিংগন করার দুঃসাহসিকতা প্রকাশ পেয়েছে যা একই সাথে গর্বের আবার আশংকারও বটে।

এ থেকে ভবিষ্যতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে কোনো ঝুঁকি আছে কি-না?
সহিংসতার শিকার বা প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের পরবর্তী সময়ে ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস-অর্ডার’ (PTSD) রোগের ঝুঁকি থাকে। ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কোনো শব্দ, দৃশ্য বা আলোচনা, এমনকি নাটক সিনেমা ব্যক্তির মনে হঠাৎ করে পুরোনো স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে পারে। ব্যক্তি সেই সময়কার মতো একই রকম আতঙ্ক অনুভব করতে পারে। তৈরি হতে পারে বিষন্নতা এবং উদ্বেগ। ঘুমের সমস্যা, দু:স্বপ্ন দেখে জেগে ওঠা, শ্বাস কষ্ট হওয়া ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। যদি শিশুর মনে সহিংসতা নিয়ে কোনো গ্লানিবোধ থাকে, বিচার বিবেচনা বোধ লোপ পায় তবে তা থেকে আত্মহননের পথও বেঁছে নিতে পারে। সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো আমরা বড়রা যেমন সময় গেলে সব ভুলে স্বাভাবিক কাজে মন দিতে পারি শিশুদের ক্ষেত্রে তা হয় না, সহিংসতার অভিজ্ঞতা শিশু-কিশোরদের মধ্যে সহিংস মনোভাব বাড়িয়ে দেয় যা তাদেরকে প্রতিশোধ পরায়ণ করে তুলতে পারে এবং সমাজে সহিংস অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি করতে পারে। “We are Gen-G kid” এই ট্যাগ লাগিয়ে ভবিষ্যতে ভাইরাল হবার জন্য না ভেবেই হুট হাট কিছু করে বসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়।

করণীয় কী?
শিশুদের এ সময়ে মানসিক সমস্যা উত্তরণের জন্য সবার আগে করনীয় পরিবার এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করা। তাদেরকে সমাজ এবং দেশের কাঠামো সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেয়া। তাদের সামনে পুরো জীবন পড়ে আছে, তাই তাদের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তারা জাতি এবং দেশের সম্পদ তাই তাদেরকে জ্ঞ্যান অর্জন তথা পড়ালেখায় মনোনিবেশে উদবুদ্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে একক, দলগত কাউন্সিলিং সেবা নেয়া যেতে পারে। নিজের এলাকায় আগের দিনের মতো পাড়া, মহল্লা সংস্কৃতি তৈরি করে মাসিক পাঠ চক্র, আলোচনা সভা, সেবা দান কর্মসুচি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদির আয়োজন করা যেতে পারে। বর্তমানে ঘটে যাওয়া সহিংসতার প্রেক্ষিতে একজন শিশুকে আপনি জ্ঞ্যান দিয়ে বোঝাতে যাবেন তার করনীয় কি-তবে সেটা হতে পারে একটি ভুল উদ্যোগ। কারণ তারা যা করে দেখিয়েছে তা আমরা পারি নি। সুতরাং এই মুহুর্তে শুধু মৌখিক পরামর্শ নয় বরং শিশুদেরকে নিয়ে যে আমরা গর্বিত সেটা বোঝাতে হবে। সব শেষে “শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ” এই ধ্রুব সত্য যেন আমরা ভুলে না যাই সে ব্যাবস্থা সুদৃঢ় করতে হবে। অপরাধ প্রবনতা দেখা দিলে অবশ্যই শিশুদের রিহ্যাবিলিটেশন এর সুযোগ দিতে হবে। শিশু অধিকার আইন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়ার ব্যবস্থা করা বাধ্যতামূলক হতে হবে।
ফারজানা ফাতেমা (রুমী)
মনোবিজ্ঞানী
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
সিরিয়ালের জন্য ভিজিট করুন- এপোয়েন্টমেন্ট
আরও পড়ুন:


