আমরা যখন জন্মাই, তখন আমাদের কোনো লক্ষ্য থাকে না। ক্ষুধা লাগলে কাঁদি, অসুখ হলে মাকে আঁকড়ে ধরি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে শুরু করি-জীবন শুধু খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো আর খেলা নয়; বরং জীবন একটি চলমান যাত্রা। এই যাত্রার পথ হারিয়ে ফেললে মানুষ অস্থির হয়, হতাশায় ভোগে, কিংবা ভুল পথে চলে যায়। ঠিক তখনই আমাদের প্রয়োজন হয় একটিমাত্র জিনিস-লক্ষ্য। লক্ষ্য আমাদের জীবনের মানচিত্র। মানচিত্র ছাড়া যেমন একজন ভ্রমণকারী গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না, তেমনি লক্ষ্য ছাড়া একজন মানুষ তার সামর্থ্যের সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছাতে পারে না। লক্ষ্য আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়, দিক নির্দেশনা দেয়, আর সবশেষে আমাদের জীবনে অর্থ যোগ করে।
আরও পড়ুন…
লক্ষ্য’ শব্দটির অর্থ হলো-কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, অভীষ্ট বা গন্তব্য। আর লক্ষ্য নির্ধারণ মানে হলো নিজের জীবনে কী চাই, কোথায় পৌঁছাতে চাই এবং তার জন্য কীভাবে এগোতে চাই তা স্পষ্টভাবে ঠিক করে নেওয়া। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী এডউইন লক (Edwin Locke) ও গ্যারি লাথাম (Gary Latham) তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন-যারা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য স্থির করেন, তারা লক্ষ্যহীন মানুষের তুলনায় বহুগুণ বেশি সফল হন। সোজা কথায়, লক্ষ্য নির্ধারণ মানে নিজের জীবনের রোডম্যাপ তৈরি করা।
লক্ষ্য ছাড়া জীবন হলো বন্দরহীন নৌকার মতো, যা ঢেউয়ের উপর ভাসতে থাকে কিন্তু কোথাও পৌঁছাতে পারে না। লক্ষ্যহীন জীবন মানে দিকহীন জীবন। এতে কিছু সমস্যার উদাহরণ দিই। লক্ষ্যহীনতা অনেক সময় অলসতা, আসক্তি, ঘুমের ব্যাঘাত, খাদ্যাভ্যাসের অনিয়ম তৈরি করে। লক্ষ্য না থাকলে মানুষ জানে না সে কী করছে এবং কেন করছে। এর ফলে হতাশা, উদ্বেগ, এমনকি ডিপ্রেশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। লক্ষ্যহীন মানুষ ছোটোখাটো কাজে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু বড়ো কোনো অর্জন করে না। লক্ষ্যপূরণ করলে মানুষ গর্বিত হয়, আত্মবিশ্বাস বাড়ে। লক্ষ্য না থাকলে সে কখনোই সাফল্যের স্বাদ পায় না। অর্থাৎ, লক্ষ্য না থাকলে জীবনকে উপভোগ করা যায় না।
ইংরেজিতে লক্ষ্যকে বলা হয় Goal, আর লক্ষ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে বলা হয় Goal Setting। কীভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করবেন? লক্ষ্য নির্ধারণের সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো SMART Goal Method ।
S = Specific (নির্দিষ্ট)-লক্ষ্যকে হওয়া উচিত একেবারে সুনির্দিষ্ট। যেমন: ‘আমি জীবনে অনেক বড়ো কিছু হতে চাই” এর পরিবর্তে লক্ষ্য হবে “আমি পদার্থবিদ্যার একজন বিজ্ঞানী হতে চাই”। এতে করে মঃনসংযোগ থেকে শুরু করে কীভাবে কী করবে সেটার একটা ধারণা করা সহজ হয়।
◆ M = Measurable (পরিমাপযোগ্য)-লক্ষ্য হবে পরিমাপযোগ্য। অর্থাৎ সময়ে সময়ে বুঝা যাবে কতটুকু অর্জিত হলো, কতটুকু আগালাম। যেমন: “শুরুর ১০ দিন আমি টানা ৩০ মিনিট হাঁটব, এরপর থেকে আমি প্রতিদিন ১ ঘণ্টা হাঁটব।”
◆ A = Achievable (অর্জনযোগ্য)-আমরা শুরুতেই এমন আকাশচুম্বী লক্ষ্য স্থির করে ফেলি, যেটা সহজে অর্জন করা যায় না, অথবা আদৌ অর্জন করা সম্ভব নয়। ফলে একসময় আমাদের কিছুই আর অর্জন হয় না, লক্ষ্যে পৌঁছান হয় না। তাই, অবাস্তব লক্ষ্য নয়, লক্ষ্য হবে বাস্তবে অর্জনযোগ্য। যেমন-“আমি এই মাসেই দশ কেজি ওজন কমিয়ে ফেলবো”, “আমি আমার প্রথম গবেষণাতেই বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিবো”।
◆ R = Relevant (প্রাসঙ্গিক)-লক্ষ্য যেন জীবনের সাথে সম্পর্কিত হয়। নাহলে তা অর্জন করার ধৈর্য, আগ্রহ বেশিদিন ধরে রাখা যায় না। লক্ষ্য যেন আপনার বর্তমান জীবনের প্রয়োজন, অবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্যের সাথে মিল রাখে। ধরা যাক, ইউটিউবে ভিডিও দেখে মজা পাওয়াতে একজন মেডিক্যাল শিক্ষার্থী সিদ্ধান্ত নিল-“মেডিক্যালে পড়ার পাশাপাশি আমি এই বছর পাইলট হওয়ার জন্য ট্রেনিং নেব।” লক্ষ্যটি অসম্ভব কিছু না হয়ত, কিন্তু প্রাসঙ্গিক না বলে সেটার জন্য উৎসাহ ধরে রাখা, লক্ষ্যটা অর্জন করা কঠিন অনেক। “আমি এই বছর এমবিবিএসের সবগুলো বিষয় পাশ করার জন্য প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা পড়বো”-এই লক্ষ্যটা প্রাসঙ্গিক অনেক, অর্জন করার সম্ভাবনাও বেশি।
◆ T = Time-bound (সময়সীমা নির্ধারিত)- লক্ষ্য পূরণের জন্য থাকবে নির্ধারিত সময়সীমা। না হলে বিষয়টি দীর্ঘসূত্রিতায় পর্যবসিত হয়। যেমন: “আমি একটা বই লিখে ফেলবো”-এই লক্ষ্য আদৌ বাস্তবে পূরণ হবে কিনা সন্দেহ। এর পরিবর্তে “আমি আগামী ছয় মাসে আমার প্রথম বইয়ের খসড়া শেষ করব”-এটি পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এমনকি ছয় মাসে অর্জিত না হলেও কাছাকাছি কোনো সময়েও এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হতে পারে।
SMART Goal ঠিক করা হলে লক্ষ্য অর্জনে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়া যায়। তবে, এরপরেও লক্ষ্য অর্জনে কিছু বিষয় সাধারণত বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন-আলস্য। শুরুতে অনেক পরিকল্পনা করা হয়, মনে হয় যেন সেটা খুব সহজে এবং দ্রুতই করে ফেলবো। কিন্তু করতে গেলেই আলস্য ভর করে, কষ্ট করতে মন আগায় না, করছি-করবো করে আর করাই হয় না। অনেকে আবার ব্যর্থতার ভয়ে এমনই গুটিয়ে রাখেন যে, যুদ্ধ করা তো দূরের কথা, শুরুই করেন না। আবার কখনো আসে অতি প্রত্যাশার ভার। একলাফে গাছে উঠার মতো এমন এমন সব প্রত্যাশা থাকে বা এমনভাবে ফলাফল ভেবে নেয়া হয়, যেখানে মনে হয় যে কাজটা কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার। কিন্তু কোনো কাজই তো সহজসাধ্য নয়। তাই, কিছু দিন পর অল্পতেই ভেঙে পড়েন। আর লক্ষ্য নির্ধারণে নির্ধারিত সময়সীমার কথা আগেই বলা হয়েছে। কিন্তু, সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রায়ই হিমশিম খেতে হয় অনেককেই। পরিকল্পনা এবং সেটা বাস্তবায়ন-উভয় ক্ষেত্রেই সময় যখন এলোমেলো হয় যায়, তখন সেই লক্ষ্য পূরণ অনেক কঠিন হয়ে পড়ে; ফলাফলে মানসিক অবসাদগ্রস্ততা হতাশা, আত্মবিশ্বাস ঘাটতি।
তবে, লক্ষ্য অর্জনে বাধা বা সমস্যা যতই আসুক না কেন, কোনো না কোনো সমাধান ঠিকই আছে। যেমন-কাজকে ছোটো ছোটো ধাপে ভাগ করা। সেই ধাপগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হলে তখন মানসিক তৃপ্তি আসে, উদ্বিগ্নতা, বিষণ্নতা দূর হয়ে মনে আসে শক্তি। আমাদের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া যদি ইতিবাচক হয় তবে লক্ষ্য অর্জনে বাধা এড়ানো ও অধ্যবসায়ী হওয়া সহজ হয়। যেটা দিনশেষে লক্ষ্য অর্জনে আমাদের অনেক অনেক সহায়তা করে। আমরা লক্ষ্য অর্জনে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়সহ অন্যদের যদি সহায়তা নিই তবে আমাদের লক্ষ্য অর্জন সহজ হয়। কোনো একটা ঝামেলা নিয়ে হয়ত আমরা দিশেহারা, দেখা গেল আমারই কোনো স্বজন সেটার সহজ একটা সমাধান বাতলে দিতে পারেন। সবচেয়ে বড়ো আরেকটা বিষয় হচ্ছে নিয়মিত আত্ম-পর্যালোচনা করা, আত্মসমালোচনা করার অভ্যাস করা। এর ফলে আমরা বুঝতে পারি কোথায় কোনো খাঁদ থেকে যাচ্ছে কিনা।
সবশেষে বলতে হয়, লক্ষ্য নির্ধারণ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি আমাদের জীবনের মৌলিক প্রয়োজন। লক্ষ্য আমাদেরকে দিক নির্দেশনা দেয়, হতাশা থেকে বাঁচায়, সাফল্যের পথে নিয়ে যায়। আপনি শিশু হন, কিশোর হন, তরুণ হন, কিংবা প্রবীণ-আপনার জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে একটি করে লক্ষ্য থাকা জরুরি। আজই একটি কাগজ নিন, আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যটি লিখে ফেলুন। হয়ত এই একটি কাজই আপনার জীবনকে নতুন আলোয় আলোকিত করবে।
- ডা. পঞ্চানন আচার্য্য
- সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান,
- মনোরোগবিদ্যা বিভাগ
- চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।
আরও দেখুন…



