দিনের শুরুতে মনটা হয়ত ভালোই ছিল, কিন্তু হঠাৎ মনে হলো ‘মন ভালো নেই’। কিংবা কোনো কাজ স্বাভাবিকভাবেই করছিলেন, হঠাৎ মনে হচ্ছে ভালো লাগছে না বা বিরক্ত লাগছে। এই যে মেজাজের এই দ্রুত পরিবর্তন, এটিকেই আমরা মুড সুইং (Mood Swing) বলি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মুড ডিজঅর্ডার’।
মুড সুইং কী?
মুড সুইং বা আবেগের দ্রুত ও অস্বাভাবিক পরিবর্তন একটি সাধারণ উপসর্গ, যা স্বল্প সময়ের মধ্যে আনন্দ, দুঃখ, রাগ, উৎকণ্ঠা বা উত্তেজনার মধ্যে ওঠানামা বোঝায়। স্বাভাবিক জীবনে সামান্য মুড পরিবর্তন স্বাভাবিক হলেও ঘনঘন, তীব্র বা নিয়ন্ত্রণহীন মুড সুইং প্রায়ই কোনো মানসিক বা শারীরিক রোগের ইঙ্গিত বহন করে।
মুড সুইংয়ের কারণ ও লক্ষণ:
আবেগের দ্রুত পরিবর্তন: মুড সুইংয়ের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো আবেগের দ্রুত পরিবর্তন। এতে মানুষ এক মুহূর্তে খুবই খুশি থাকতে পারে এবং পরের মুহূর্তে হতাশ, রাগান্বিত বা দুঃখিত হয়ে পড়তে পারে। এই পরিবর্তন মনের স্থিরতা নষ্ট করে দেয়।
মানসিক অসুস্থতা: ডিপ্রেশন (Depression), বাইপোলার ডিজঅর্ডার, অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার, নেশা বা মাদকাসক্তি, বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার এবং প্রিমেন্সট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিজঅর্ডার (PMDD)-এর মতো মানসিক অসুস্থতায় তীব্র মুড সুইং হতে পারে।
আরও পড়ুন…
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ: মানসিক চাপ মুড সুইংয়ের আরেকটি প্রধান কারণ। দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা, কাজের চাপ, সম্পর্কের সমস্যা এবং আর্থিক সংকটের কারণে মানসিক অবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। চাপের কারণে শরীরে কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায়, যা মুড সুইংয়ের জন্য দায়ী।
প্রজনন চক্র: মাসিক চক্রের বিভিন্ন সময়ে হরমোনের পরিবর্তন মুড সুইং তৈরি করতে পারে। বিশেষত, প্রিমেন্সট্রুয়াল সিন্ড্রোম (PMS) এবং প্রিমেন্সট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিজঅর্ডার (PMDD)-এ মুড সুইং হয়। এছাড়া গর্ভাবস্থায় বা প্রেগন্যান্সিতেও মুড সুইং হয়ে থাকে।
শারীরিক রোগ: কিছু শারীরিক অসুস্থতায় মুড সুইং হয়, যেমন-থাইরয়েডজনিত রোগ (হাইপো বা হাইপার থাইরয়েডিজম), মৃগী রোগ, পারকিনসন রোগ, স্ট্রোক, ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি বা ব্রেইন টিউমার ইত্যাদি। গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন এবং মিনারেল (যেমন: ভিটামিন B1, B12 ভিটামিন ID ইত্যাদি)-এর অভাবেও মুড সুইং হতে পারে।
শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে: ADHD, কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডার বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারেও আবেগের অস্থিরতা দেখা দেয়।
উপসংহার: মুড সুইং নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়, বরং এটি বহু মানসিক ও শারীরিক সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ। সঠিক ইতিহাস এবং মানসিক ও শারীরিক মূল্যায়নের মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে এই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব।
- ডা. মো. সামীউল আলম
- এমবিবিএস, এমডি (সাইকিয়াট্রি)
- সহকারী অধ্যাপক, মার্কস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।


