কিশোর অপরাধে করণীয়

কিশোর অপরাধে করণীয়

আজকের শিশু বা কিশোররাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আজকে যারা কোমল শিশু, একদিন সে দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক হয়ে দেশ ও জাতির উন্নয়নের জন্য কাজ করবে।

বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একটি সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সেটি হলো কিশোর অপরাধ। কিশোরদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চুরি, হত্যা, আত্মহত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, পকেটমার, মাদক সেবন, ইভ টিজিংসহ এমন সব অঘটন ঘটিয়ে চলছে এবং এমন লোমহর্ষক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, যা অকল্পনীয়।

সুনির্দিষ্টভাবে কত বছর বয়সসীমা পর্যন্ত অপরাধ কিশোর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত, তা নির্ভর করে সেই দেশের অপরাধ আইনের ওপর। কোনো কোনো সমাজে এটি ১৮ বছর এবং কোনো কোনো সমাজে আরো বেশি। তবে কোনো সমাজেই ২১ বছরের বেশি বয়স হলে কিশোর হিসেবে গণ্য করা হয় না।

সমাজকর্মী, মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে যে অবক্ষয় ঘটছে, তারই প্রভাবে শিশু-কিশোর অপরাধ বাড়ছে। পরিবার ও কর্মক্ষেত্রেও সনাতন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দুর্বল শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে।

শিশুকিশোর অপরাধের কারণ

মনস্তাত্ত্বিক কারণ: বয়ঃসন্ধিপ্রাপ্ত ছেলে-মেয়ের মধ্যে সহনশীলতার অভাব খুব প্রকট হয়ে ওঠে। এ সংকটের অন্যতম কারণ অপরিণত আবেগের বৃদ্ধি। সেই স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে যদি বাধা আসে, তাহলে সহনশীলতার অভাব ঘটতে বাধ্য। এই বিপর্যয়ই কৈশোরের অনেক বিতণ্ডার মূল।

শিশু-কিশোরদের আমরা অনেক কিছুই ঠিকমতো শেখাই না। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা সেভাবে সচেতন হয়ে উঠতে পারে না। জীবনে অনেক জিনিসই পাওয়া যায় না। এ না পাওয়ার ব্যাপারটা যে জীবনেরই অঙ্গ, আমরা তা শেখাই না।

কোনো কোনো ছেলে-মেয়েরা এ বয়সে অবাস্তব স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। মাতা-পিতার সঙ্গে যতবেশি মানসিক বিভেদ, বাড়িতে যত অশান্তি বাড়তে থাকে, ততই এ মিথ্যাচারও বাড়তে থাকে। অসম্ভব জেদি, রাগী, একগুঁয়ে, সন্দেহপ্রবণ হয়ে এমন একটা পর্যায়ে তারা ক্রমেই চলে যায়, শেষ পর্যন্ত জীবনবিমুখ হয়ে পড়ে। সব রকম আনন্দ, স্পৃহা, উৎসাহ থেকে দূরে চলে যায়।

স্বভাবগত কারণ: কিশোরদের অপরাধী হওয়ার নেপথ্যে কিছু স্বভাবগত কারণও রয়েছে। যেমন- সৃষ্টিজগতের প্রতি নির্দয় ব্যবহার, অতিরিক্ত অবাধ্যতা, স্কুল-পলায়ন, দেরিতে ঘরে ফেরা, বেঢক ও মলিন পোশাক পরিধান, শারীরিক অপরিচ্ছন্নতা, অকর্তিত কেশ, দুঃসাহসিকতা, অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়তা, অতিমাত্রায় ছায়াছবি প্রিয়তা ইত্যাদি।

কিশোর অপরাধের কারণ হিসেবে মাতাপিতা

কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাতা-পিতার কারণে কিশোররা অপরাধী হয়ে থাকে। যেমন-

সংসারত্যাগী বা পলাতক মাতা-পিতা। এরা সন্তানের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না করে পলাতক হয়েছেন। সন্তান তাঁদের স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত থাকে। অপরাধী মাতা-পিতা। এরা সন্তানকে পাপের মধ্যে রেখে বড় করেন। কখনো বা সন্তানের সহায়তায় পাপ করেন।

অপকর্মে সহায়ক মাতা-পিতা। এরা সন্তানের অপরাধস্পৃহায় উৎসাহ দেন। অসচ্চরিত্র মাতা-পিতা। তাঁরা নির্বিচারে সন্তানের সামনেই নানা অসামাজিক কাজ করেন ও কথা বলেন। অযোগ্য মাতা-পিতা। এরা সন্তানকে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাদানে অমনোযোগী বা অপারগ।

আধুনিককালে শহরগুলোতে দেখা যায়, মা-বাবা উভয়ে ঘরের বাইরে কাজ করছেন। ফলে সন্তান তাঁদের উপযুক্ত স্নেহ-শাসন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা আচরণে বিদ্রোহধর্মী হয়ে যাচ্ছে। এমনটিও দেখা যায় যে মৃত্যু বা বিবাহবিচ্ছেদের ফলে কোনো কোনো কিশোর মা অথবা বাবাকে হারাচ্ছে। এ কারণেও কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশে সমস্যা দেখা দেয়। তারা সমাজবিরোধী কাজকর্মে লিপ্ত হয়।

পরিবার হলো সমাজের প্রাণকেন্দ্র। সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি ও বৃদ্ধি হয় পরিবারকে কেন্দ্র করে। মানবজাতির প্রথম ঐক্যের ভিত্তি হলো পরিবার। পরিবারকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা উন্নত সংস্কৃতির কারণে পশ্চিমা অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ মানসিক দিক থেকে অনেক সুখী। ভোগবাদী মানসিকতা ও পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থার কারণে বর্তমানে সে সুখের জায়গায় চিড় ধরেছে। অনেক ক্ষেত্রে অসৎ সঙ্গকেও কিশোর অপরাধের জন্য দায়ী করা হয়

দারিদ্র্য: দারিদ্র্য যে অপরাধের জন্য দায়ী, তা বলাই বাহুল্য। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত পরিবারে কিশোর-কিশোরী তার নিত্যদিনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে ব্যর্থ হয়। ফলে তার মধ্যে কিশোর অপরাধমূলক আচরণ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে এরা ছোটখাটো চুরি বা ছিনতাইয়ে অংশগ্রহণ করে। দারিদ্র্যের কারণে আত্মহত্যা বা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করতেও বাধ্য হয় অনেক কিশোর-কিশোরী।

মানুষের নৈতিকতা সুরক্ষার্থে করণীয়:

কিশোরদের সংশোধন, তাদের মন পবিত্র ও পরিশুদ্ধকরণ এবং তাকে নির্মলভাবে লালন ও প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নত চরিত্রে বিভূষিত করে তুলতে হবে। তার অন্তরে ঈমানের বীজ বপন করে তাকে কল্যাণমুখী বানাতে হবে। তার মধ্যে অপরাধবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করতে হবে।

নিষিদ্ধ কাজ করা থেকে দূরে রাখার জন্য খারাপ পরিণতির ভয় প্রদর্শন করতে হবে। সে খারাপ পরিণতি মানুষের সম্মুখে ভয়াবহরূপে চিত্রিত করে পেশ করা হয়েছে। যা স্বভাবতই মানবমনে এমন তীব্র ভীতির সঞ্চার করে, সে কিছুতেই সেই খারাপ কাজের দিকে পা বাড়াতে সাহস করে না।

ভালো কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা, পারস্পরিক কল্যাণ কামনা, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ, ধৈর্য অবলম্বনের উপদেশ এবং সব পাপ, সীমালঙ্ঘনমূলক কাজ, অন্যায়, জুলুম ও বিপর্যয় প্রতিরোধের নির্দেশ দেওয়া উচিত।

মানুষের মন পবিত্রকরণ, আত্মা বিশুদ্ধকরণ এবং তাদের পাপ ও অভিশপ্ত কাজে জড়িত হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

এভাবে মানবজীবনকে শৈশব-কৈশোর থেকে সব ধরনের অনাচার, পাপ ও পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করা গেলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অপরাধজনক কাজ থেকে দূরে সরে থাকবে।

Previous articleআকস্মিক রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়
Next articleযৌন মিলনের আগে যা করা ঠিক নয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here