-
মুশফিকুর রহমান নিপু
- শিক্ষার্থী, দ্বাদশ শ্রেণি
মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ‘মনের খবরের মৌলিক এজেন্ডা। মনের খবর চায় সব মানুষ তার নিজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন থাকুক। এজন্য সাধারণ মানুষের মাঝে আদৌ মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে কিনা সেটা জানতে মনের খবর প্রায়ই একেবারে প্রান্তিক মানুষের মুখোমুখি হয়। এবার আমরা দ্বাদশ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীর মুখোমুখি হয়েছিলাম। তার কাছে জানতে চেয়েছি মানসিক স্বাস্থ্যের খুঁটিনাটি নানা বিষয়। দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মুশফিকুর রহমান নিপুর বাড়ি নরসিংদীতে । বয়স মাত্র ১৯। বর্তমানে সে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার পাশাপাশি একটি ছোট চাকরি করে। তার সাথে কথা বলেছেন, মনের খবর প্রতিবেদক।
মনের খবর: আপনার নাম কী?
মুশফিকুর রহমান নিপু: আমার নাম মুশফিকুর রহমান নিপু?
মনের খবর: আপনি এখন কোন শ্রেণিতে অধ্যয়নরত আছেন?
মুশফিকুর রহমান নিপু: আমি এখন দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত আছি।
মনের খবর: আপনি যেখানে পড়াশোনা করেন, সেই প্রতিষ্ঠানটার নাম কী?
মুশফিকুর রহমান নিপু: হাড়িসাংগান কারিগরি মহাবিদ্যালয়।
মনের খবর: আচ্ছা, কারিগরি লাইনে পড়াশোনা করে আপনার কি ওই ধরনের চাকরিতে যাওয়ার ইচ্ছা আছে? নাকি অন্য কিছুতে কাজ করবেন?
মুশফিকুর রহমান নিপু: ভাইয়া, বিদেশ যাওয়ার ইচ্ছা আছে।
মনের খবর: ও আচ্ছা, তাহলে বিদেশ যাওয়ার জন্যই এটা চালিয়ে রেখেছেন?
মুশফিকুর রহমান নিপু: না, এমনি না। আমার ওই জায়গার সার্টিফিকেট দরকার। ওই সার্টিফিকেট দিয়ে আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স ইম্প্রুভ করতে হবে। বিআরটিসি (BRTC) থেকে প্রথম কারিগরি টিটিসি (TTC) তে ড্রাইভিং লাইসেন্স দরকার, পরে আমার বিআরটিসি-র ড্রাইভিং লাইসেন্স দরকার। এই দুইটা ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াও আরেকটা জানি কী সরকারি লাইসেন্স আছে—ওইটা বের করে মোট তিনটা লাইসেন্স দরকার।
মনের খবর: এগুলো করিয়ে তারপর বিদেশ যাবেন?
মুশফিকুর রহমান নিপু: হ্যাঁ, তিনটা লাইসেন্স দিয়ে এরপরে।
মনের খবর: আচ্ছা, আপনার পড়াশোনার ক্ষেত্রে কি কোনো চাপ বা প্রেসার অনুভব করেন?
মুশফিকুর রহমান নিপু: না, আমার পড়াশোনার ক্ষেত্রে ওইরকম কোনো চাপ নেই।
মনের খবর: মানে স্বাভাবিকভাবেই পড়াশোনা করছেন?
মুশফিকুর রহমান নিপু: হ্যাঁ।
মনের খবর: আপনি কী পড়াশোনার পাশাপাশি কোন চাকরি করেন?
মুশফিকুর রহমান নিপু: হ্যা, এক জায়গায় একটা জব করি।
মনের খবর: তো পড়াশোনা আর চাকরি—দুইটা একসাথে সামলাতে কি কষ্ট হয় না?
মুশফিকুর রহমান নিপু: না, এই জায়গায় আমি অনেক অবসর সময় পাই। ওই অবসর সময়ে আমি পড়াশোনাগুলো কাভার করি।
মনের খবর: ও আচ্ছা, দুইটা মিলিয়ে মোটামুটি ভালোভাবেই চালিয়ে যাচ্ছেন। আচ্ছা, বাড়ি থেকে কি পড়াশোনায় ভালো রেজাল্ট করার জন্য কোনো চাপ বা প্রেসার দেয়?
মুশফিকুর রহমান নিপু: হ্যাঁ অবশ্যই, এটা তো বলবেই। সবার বাড়ি থেকেই তো এটা বলে যে ভালো রেজাল্ট করতে হবে।
মনের খবর: মানসিক স্বাস্থ্য বলতে আপনি কী বুঝেন? বা মানুষ কেনো মানসিক ডাক্তারের কাছে যায় বলে আপনি মনে করেন?
মুশফিকুর রহমান নিপু: মানসিক স্বাস্থ্য বলতে মানসিক সুস্থতা বোঝায়। অর্থাৎ একজন মানুষ যখন হতাসা, দুশ্চিন্তা ইত্যাদিতে অতিরিক্ত চাপ অনুভাব করে এবং সেই চাপ তার নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যায় তখন আমরা তাকে মানসিক অসুস্থতা বলতে পারি। অনেকে হতাশায় ভোগে, হতাশাগ্ৰস্ত হয়ে অনেকে ডিপ্রেশনে চলে যায়, মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। পড়াশোনার চাপে হতাশ হয়ে যায়, আবার চাকরি-বাকরি না পেয়েও ডিপ্রেশনে চলে যায়। আর এই ডিপ্রেশন থেকেই তো মাদকাসক্তির দিকে চলে যায়। এগুলো থেকে মুক্তির জন্যই মানুষ মূলত মানসিক ডাক্তারের কাছে যায় ।
মনের খবর: আচ্ছা, আপনার বন্ধু-বান্ধব বা ক্লাসমেটদের মাঝে কি কাউকে দেখেছেন—যারা পড়াশোনা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় বা হতাশায় আছে?
মুশফিকুর রহমান নিপু: হ্যাঁ, এরকম অনেকেই আছে। পড়াশোনা নিয়ে সেই প্রেসারে থাকে। আমার এক বন্ধু ছিলো, ও নরসিংদীর। ২০২৪ সালে আমরা একসাথে এসএসসি দিয়েছি। ও নরসিংদীতে তিন নাম্বার হয়েছিল। কিন্তু এখন হতাশায় মাদকাশক্তিতে জড়িয়ে গিয়েছে।
মনের খবর: আচ্ছা, যারা পড়াশোনা নিয়ে অতি চিন্তা বা হতাশার মধ্যে থাকে, তাদেরকে কি আপনাদের কলেজের শিক্ষকেরা মানসিক সাপোর্ট দেন?
মুশফিকুর রহমান নিপু: হ্যাঁ অবশ্যই, শিক্ষকেরা তো মোটামুটি মানসিক সাপোর্ট দিবেনই।
মনের খবর: আপনাদের কলেজ তো মোটামুটি বড়, তাই না? কতজন ছাত্র-ছাত্রী আছে?
মুশফিকুর রহমান নিপু: আমাদের কলেজে ১৮০ জন ছাত্র-ছাত্রী আছে। শিক্ষকেরা এদের মোটামুটি অনেকটাই সাপোর্ট দেন।
মনের খবর: আপনি দিনে মোবাইল বা ফেসবুক কেমন ব্যবহার করেন? কাজের মধ্যে কি চালানোর সময় পান?
মুশফিকুর রহমান নিপু: বলতে গেলে আমার কাজে তো ওইরকম চাপ নেই। আমি মোটামুটি অনেকক্ষণ মোবাইল দেখি। স্ক্রিন টাইম প্রায় ১২ ঘণ্টার উপরে।
মনের খবর: কী বলেন! ১২ ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম?
মুশফিকুর রহমান নিপু: আমি দেখিই প্রায় ৮ ঘণ্টার উপরে। আমার কাজটা অনেকটা রিল্যাক্সিং টাইপের।
মনের খবর: কিন্তু এই যে বেশি মোবাইল চালালে মাথার মধ্যে কোনো খারাপ লাগা বা অশান্তি কাজ করে না?
মুশফিকুর রহমান নিপু: হ্যাঁ, অনেক খারাপ লাগতো। ঈদের আগ থেকে ফোন চালানো খুব কমিয়ে দিয়েছি। এখন স্ক্রিন টাইম ৪ ঘণ্টাও না। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে চোখ কেমন যেন হয়ে যায়।
মনের খবর: আচ্ছা, আপনার কখনো এমন সময় এসেছে, যখন আপনি অনেক চিন্তায় বা ঝামেলায় ছিলেন? সেটা পড়াশোনা বা পারিবারিক যেকোনো সমস্যা হতে পারে?
মুশফিকুর রহমান নিপু: হ্যাঁ, অনেক সময়ই তো চিন্তা আসে। প্রায়ই চিন্তা আসে, এক ঘণ্টা-দেড় ঘণ্টা ধরে আমি চিন্তা করি যে আমি জীবনে কী করব?
মনের খবর: মানে জীবন নিয়ে চিন্তা, নাকি কোনো পারিবারিক বা আর্থিক সমস্যা নিয়ে?
মুশফিকুর রহমান নিপু: না, পারিবারিক বা আর্থিক কোনো সমস্যা আমার নেই। আমার চিন্তা হচ্ছে সামনে কী করতে হবে, কীভাবে এগোতে হবে—সেটা নিয়ে।
মনের খবর: ওই সময় চিন্তা থামে কীভাবে? এক-দেড় ঘণ্টা চিন্তা করার পর সেটা বন্ধ হয় কীভাবে?
মুশফিকুর রহমান নিপু: এই তো, রাত্রে চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে যাই। অথবা দুপুর বা বিকেলে চিন্তা করার সময় কেউ ফোন দিলে বা মানুষের সাথে কথা বললে চিন্তা কেটে যায়। আমার বেশিরভাগ চিন্তাটা হয় রাতে ঘুমানোর আগে। বন্ধু-বান্ধব বা মানুষের সাথে কথাবার্তা বললে মোটামুটি অনেকটাই রিল্যাক্স লাগে।
মনের খবর: বন্ধু-বান্ধবের সাথে কি কথা বলেন ওই সময়? এমন কোনো বন্ধু আছে যার সাথে কথা বললে ভালো লাগে?
মুশফিকুর রহমান নিপু: হ্যাঁ, আছে। এরকম বন্ধুও আছে। ওরে যদি রাত ২টা বা ৩টার সময়ও কল দেই, ও কল ধরবে। ওদের সাথে কথা বললে অনেকটা রিল্যাক্স লাগে।
মনের খবর: আপনার ওই বন্ধুও কি আপনার মতো ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক চিন্তা করে?
মুশফিকুর রহমান নিপু: হুম, আমার চেয়ে বেশিই করে।
মনের খবর: আপনার ফ্রেন্ড সার্কেল কি অনেক বড়?
মুশফিকুর রহমান নিপু: না, আমার ফ্রেন্ড সার্কেল খুব ছোট। আমি এক-দুইজনের বেশি কারও সাথে ওভাবে চলি না। যারা আছে তারা কলিজার মতন। রাত ২টা বা ৩টায় যদি বলি “মামা, একটা বিপদে পড়ছি, দৌড় দে,” ওরা চলে আসবে।
মনের খবর: আচ্ছা, এই যে যুবসমাজের মাঝে চিন্তা বা হতাশা—এগুলো মূলত কেন বাড়ছে বলে আপনার মনে হয়?
মুশফিকুর রহমান নিপু: সবারই জীবনে কিছু একটা করতে হবে। ফিউচার (ভবিষ্যৎ) নিয়ে, কী করলে কী হবে, কোন জায়গায় গেলে ভালো হবে—এসব নিয়েই মূলত সবাই চিন্তিত থাকে।
মনের খবর: ঠিক আছে, নিপু ভাই। ধন্যবাদ আপনাকে।
মুশফিকুর রহমান নিপু: আপনাকেও ধন্যবাদ।

