বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশনকে কখনোই মস্তিষ্কের রোগ মনে করবেন না। বিষণ্নতার কারণেই মস্তিষ্কে বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিক সক্রিয়তা তৈরি হয়। অনেকের ক্ষেত্রে এই বিষণ্নতার প্রভাবে হার্টবিট বেড়ে যায়, ঘাম হতে থাকে, শরীর কাঁপে, প্রস্রাবের চাপ বেড়ে যায়—এমনকি সব ধরনের ইমোশনাল অ্যাক্টিভিটিতেও গতি বৃদ্ধি পায়। ফলে মানুষ অত্যন্ত চাপের মধ্যে থাকে।বিষণ্নতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে, তার মধ্য থেকে আজ যেটি নিয়ে কথা বলছি তা কিছুটা তাত্ত্বিক হলেও অত্যন্ত জরুরি।
একজন স্বাভাবিক মানুষের ঘুম দুটি ধাপে হয়—
- র্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) স্লিপ
- নন–র্যাপিড আই মুভমেন্ট (NREM) বা স্লো–ওয়েভ স্লিপ
রেম স্লিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ ঘুমের শুরুতে প্রায় ৯০ মিনিটের মতো ডিপ স্লিপ (NREM)–এ থাকে। এরপর অল্প সময়ের জন্য রেম স্লিপে যায়। রাত যত গভীর হয়, NREM স্লিপ কমে এবং রেম স্লিপ বাড়তে থাকে। ফলে ভোরের দিকে স্বপ্ন বেশি দেখা যায়।
বিষণ্নতার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ঘুম আসে না। মানুষ ঘুমের শুরুতেই ডিপ স্লিপে ঢুকতে পারে না, আর যদি ঢোকে, খুব দ্রুতই সেখান থেকে উঠে যায়। ফলে পুরো রাতজুড়ে রেম স্লিপ বেড়ে যায় এবং NREM স্লিপ কমে যায়। বারবার রেম স্লিপের এপিসোড চলতে থাকে।
রেম স্লিপে মস্তিষ্কের ইলেকট্রিক্যাল অ্যাক্টিভিটি ঠিক জাগ্রত অবস্থার মতো হয়। তাই মানুষ সারারাত ঘুমালেও রিল্যাক্স বা রিচার্জ হতে পারে না। এই কারণে বিষণ্ন মানুষ ঘুম থেকে উঠে বলে— “আমি একটুও ঘুমাইনি।” তাদের সারাদিন ক্লান্তি, অবসাদ, অবসন্নতা থাকে। রেম স্লিপের স্বপ্ন সাধারণত ইমোশনভিত্তিক ভয়, দুঃখ, না-পারা ইত্যাদি। রাত যত বাড়ে দুঃস্বপ্নও বাড়ে। অনেক সময় দুঃস্বপ্ন মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয় এবং আবার ঘুমাতে বাধা সৃষ্টি করে। কখনো এটা ভয়াবহ চিৎকার বা আচরণে পরিণত হয় এটাই নাইটমেয়ার।
কারণ ঘুমের শুরুতে যে ডিপ স্লিপে রিল্যাক্সেশন হওয়া দরকার ছিল, বিষণ্নতায় সেখানে সারারাত রেম স্লিপ চলে। মস্তিষ্ক তখন সারাক্ষণ ইলেকট্রিক্যাল অ্যাক্টিভিটির মধ্যে থাকে। ফলে মানুষ কখনোই পুরোপুরি রিফ্রেশড, রিচার্জড বা উদ্যমী হতে পারে না।
রেম স্লিপের দুঃস্বপ্নে প্যাসিমিস্টিক বা নেগেটিভ থিংকিং আরও তীব্র হয়। কখনো এটি ভয়ঙ্কর মানসিক চাপ তৈরি করে।
এর বিপরীতে NREM স্লিপে যে “নাইট টেরর” হয়, তা অন্য ধরনের বিষয়—আজ সেটা নিয়ে আলোচনা করছি না।
মনে রাখবেন—
মস্তিষ্কের ইলেকট্রিক্যাল অ্যাক্টিভিটি বিষণ্নতার কারণে বাড়ে। এটি নিজে মস্তিষ্কের রোগ নয়। হার্টবিট বাড়া, ঘামা, শরীর কাঁপা। এসবই ইমোশনাল অ্যাক্টিভিটির শারীরিক প্রতিক্রিয়া। অনেকে মনে করেন তাঁদের হার্টের রোগ হয়েছে, আসলে এটি বিষণ্নতার প্রভাব।
বিষণ্নতার ঘুমের সমস্যা, হার্টবিট, দুর্বলতা এসব আলাদা আলাদা উপসর্গ ভেবে ওষুধ খাওয়া ভুল। এতে উপসর্গ আরও জটিল হয়। সঠিক চিকিৎসা হলো— পুরো বিষণ্নতার সার্বিক চিকিৎসা।
যদি আমরা বুঝতে পারি বিষণ্নতায় ঘুমের প্যাটার্ন কীভাবে বদলে যায়, তাহলে তাকে আলাদা সিম্পটম ধরে নয়—সম্পূর্ণ একটি মানসিক রোগ হিসেবে চিকিৎসা করা সহজ হবে। সবাই ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
অধ্যাপক ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব
চেয়ারম্যান, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
ভিডিও দেখুন-
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
সিরিয়ালের জন্য ভিজিট করুন- এপোয়েন্টমেন্ট
আরও দেখুন-



