আজকাল আমরা এতটাই প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি যে প্রযুক্তি নাকি মানসিক স্বাস্থ্য কোনটাকে আগে প্রাধান্য দেওয়া উচিত তাই হয়ত গুলিয়ে ফেলছি। আজকাল ইয়োগা অ্যাপ, মেডিটেশন অ্যাপ, হেলথকেয়ার অ্যাপ, ফুড নিউট্রিশন অ্যাপ, ল্যাংগুয়েজ লার্নিং অ্যাপ কত রকম অ্যাপ্সের ছড়াছড়ি! এখন আধুনিক জীবনযাপনের জন্য নানাদিক দিয়ে মানুষ প্রযুক্তিকেই বেছে নিচ্ছে। হাঁটার সময় ফুট স্টেপ কাউন্ট করা, খাবারের প্লেটের উপর মোবাইল বা ট্যাব দিয়ে স্ক্যান করলে খাবারের ক্যালরি জানিয়ে দেয়া, শরীর অসুস্থ হলে AI কে প্রশ্ন করে শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করা, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা জানিয়ে পরামর্শ চাইলেও AI চমৎকার পরামর্শ দিয়ে দেয়।
আরও দেখুন…
এরকম অবস্থায় সত্যিই কি আমরা প্রযুক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে জীবনযাপন করতে চাই নাকি প্রযুক্তি নির্ভর না হলে আপনার নিজেকে আদিম যুগের মানুষ মনে হয়।
এই ভারসাম্য বজায় রাখতে স্ক্রিন-ফ্রি সময় নির্ধারণ, ডিজিটাল বাউন্ডারি বা সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং অফলাইনে শখের চর্চা অত্যন্ত জরুরি। তাতে হয়ত নিজেকে আপনার কিছুটা প্রাচীন আমলের মানুষ বলে মনে হতে পারে তবে যুগের ট্রেন্ডে গা না ভাসিয়ে সত্যিকার জীবন উপভোগ করার অনুশীলন করাই শ্রেয়। নিজের মানসিক সুস্থতা অক্ষুণ্ণ রাখতে নিচের কার্যকর কৌশলগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে।
১। স্ক্রিন-ফ্রি রুটিন তৈরি করা
সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানায় শুয়ে মোবাইল দেখা আমাদের অনেকেরই নিয়মিত অভ্যাস। সোশ্যাল মিডিয়া আপডেট, নিউজ আপডেট দেখে তারপর বিছানা ছাড়া এমনকি অনেকে এখন ওয়াশরুমে বসেও ডিভাইস দেখে সময় কাটায়। এরকম অভ্যাসগুলোকে ভালো বা খারাপ বলে অহেতুক তর্ক না করে আমরা কি ঘুম ভাঙার পর অন্তত ৩০ মিনিট মোবাইল বা কোনো স্ক্রিন থেকে দূরে থাকতে পারি?
এ সময় মেডিটেশন, হালকা ব্যায়াম বা প্রার্থনা করতে পারি, নিজের জন্য চা-কফি হাল্কা নাশতা বানাতে পারি, বারান্দায় সবুজ প্রকৃতির মাঝে বসে থাকতে পারি, আয়নায় নিজেকে দেখে সময় নিয়ে রেডি হতে পারি। বাড়ির বাকি লোকদের ঘুম ভেঙেছে কিনা খোঁজ নিতে পারি।
একটা সময় টিভি প্রোগ্রাম দেখতে দেখতে খাওয়ার প্রচলন ছিল, এরপর ডিভাইসের যুগে ছোটো-বড়ো অনেকেই এক হাতে খায় তো আরেক হাতে স্কিন স্ক্রল করে যায়। আমরা জানি এতে আমাদের মস্তিষ্কে খাবার খাওয়ার আনন্দের সিগনাল পর্যাপ্তভাবে পৌঁছাতে পারে না ফলে একটু পর আবার ক্ষুধা পায় এবং বারবার খেয়েও মনে হয় কিছুই তো খেলাম না। তাই খাবার সময় টিভি, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল ছোটো-বড়ো সকলের এড়িয়ে চলা উচিত। ঘুমানোর ১-২ ঘণ্টা আগে সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস বন্ধ রাখা গেলে ভালো ঘুম হবে। প্রয়োজনে ওয়াইফাই রাউটার বন্ধ রাখতে হবে।
২। সোশ্যাল মিডিয়া ও অ্যাপ নিয়ন্ত্রণ
অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে, যাতে বারবার ফোনের দিকে নজর না যায়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে প্রয়োজনে আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে।
স্মার্টফোনের বিল্ট-ইন স্ক্রিন টাইম ফিচার ব্যবহার করে বিভিন্ন অ্যাপের জন্য দৈনিক সময়সীমা নির্ধারণ করে নেয়া সম্ভব।
সপ্তাহে অন্তত একদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য বা কোনো ছুটির দিনে নিজেকে পুরোপুরি প্রযুক্তি-বিচ্ছিন্ন রাখুন (ডিজিটাল ডিটক্স)। আপনার ব্যবহৃত ডিভাইসটি কোথাও লক করে রেখে অন্য কিছুতে সময় কাটান।
৩। ইতিবাচক পরিবেশ গঠন ও মাইন্ডফুলনেস
যে পেজ বা অ্যাকাউন্টগুলো আপনার মানসিক অস্বস্তি বা বিষণ্ণতা বাড়ায়, যেমন দামি শাড়ির লাইভ, রাজনৈতিক পেইজ, এক্সক্লুসিভ প্যাকেজ, বিলাসবহুল কোনো কিছু যা আপনার সামর্থ্যের বাইরে, জুয়া কিংবা পর্নোগ্রাফি ইত্যাদি আনফলো, আনসাবস্ক্রাইব বা মিউট করা যেতে পারে।
যখনই মনে হবে অতিরিক্ত স্ক্রল করছেন, তখন গভীরশ্বাস বা ডিপ ব্রিদিং অনুশীলন করুন। বই পড়া, বাগান করা, ছবি আঁকা বা শরীরচর্চার মতো গঠনমূলক কাজে সময় দিন।
৪। পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করুন
সময়ের সাথে সাথে আমাদের বন্ধু এবং সামাজিক সম্পর্কগুলো বদলে যায়। তবে সারাজীবনের জন্য কিছু নন-জাজমেন্টাল বন্ধু তৈরি করতে হবে যারা আপনার বিপদে পাশে থাকবে। ভার্চুয়াল যোগাযোগের পাশাপাশি পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সরাসরি, সামনাসামনি দেখা করা ও আড্ডা দেওয়ার সময় বাড়ানো জরুরি।
উপরে উল্লেখিত পরামর্শগুলো সবটাই হয়ত আপনার জানা আছে কিন্তু বাস্তব জীবনে এগুলোর প্রয়োগ নেই। হয়ত স্ক্রিন টাইম লিমিট করবেন অনেকবার ভেবেছেন কিন্তু হয়ে উঠছে না। কারণ আপনি নিজেকে বারবারই বলেছেন যে, “আমার স্ক্রিন টাইম কমাতে হবে”। কিন্তু আবার ভেবেছেন, সবই তো প্রয়োজনেই করছেন তাহলে কমিয়ে কি লাভ। তাই আপনি আজ থেকে শুধু এটাই ভাবুন যে, “আজকে থেকে আমি প্রযুক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে ব্যালেন্স করে চলবো।” এতে আপনার শরীর ও মন দুটোই সুস্থ থাকবে।
- ফারজানা ফাতেমা (রুমী)
- মনোবিজ্ঞানী

