প্রশ্ন: আদাব স্যার। আমি একজন ছেলে। আমার বয়স ২০ বছর। বর্তমানে অনার্সে পড়াশোনা করছি। আমি ছোটোবেলায় ভালো ছাত্র ছিলাম। আমার মূল সমস্যা শুরু হয় ক্লাস টেন থেকে। ছোটোখাটো বিষয়, বইয়ের বিষয়বস্তু ভুলে যেতাম। যতই দিন যাচ্ছিল আমার পড়ার আগ্রহ, ততই কমে যাচ্ছিল। এর মধ্যে ক্লাস টেনে থাকা অবস্থায় আমার বাবা মারা যায়। আমি পরিবারের একমাত্র ছেলে হওয়ার কারণে সকল দায়িত্ব ও পারিবারিক চিন্তা আমার কাঁধে এসে পড়ে। আমার পড়াশোনারও দিন দিন অবনতি হতে থাকে। তবে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতিত্বের সাথে পাশ করি।
আরও দেখুন…
- কোনো কথা, ছবি, গান বা ঘটনা একবার মাথায় ঢুকলে সেটা আর বের করতে পারি না।
- আমি তাকে পছন্দ করি কিন্তু তার প্রতি কোনো শারীরিক আকর্ষণবোধ করি না
কলেজে ওঠার পর আমার মানসিক স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হয়। পড়ার টেবিলে বসলেই আমার চোখ অন্ধকার হয়ে মাথা চক্কর দেয়। মানসিকভাবে বিষণ্ণতা ও হতাশা বোধ করি। কলেজের রেজাল্টও খারাপ করতে শুরু করি। কিছুতেই আমি পড়াশোনায় মন বসাতে পারছিলাম না। মন খারাপ হলে মনে হয় যেন আমার শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে নিজেকে নেশাগ্রস্ত মনে হয়, মাথা কাজ করে না, চলার সময় ভারসাম্যহীনতা বোধ করি। কি করবো কিছুই বুঝতে পারি না। এইরকম চলতে থাকে। এরপর এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.৭৯ পাই।
এরপর আমি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করি। আমি বারবার পড়া রিভিশন দেই। কিন্তু সব ভুলে যাই। পরীক্ষার হলে আমার মাথা কাজ করে না। পারা প্রশ্নও তখন অচেনা লাগে, সব ভুলে যাই। সব ভর্তি পরীক্ষায় আমি অকৃতকার্য হই। কিন্তু আমি যথেষ্ট পরিশ্রম করেছিলাম।
বর্তমানে খুবই হতাশায় আছি। যেই আমি ছোটোবেলায় এত ভালো ছিলাম, তার এই অবস্থা কেন? আগে সৃজনশীল চিন্তা-ভাবনা ও সাহিত্য সৃষ্টিতে খুব পারদর্শী ছিলাম। এখন যেন মাথা কাজ করে না, কোনো চাপ নিতে পারি না। দিন দিন কেমন যেন চিন্তা, বিবেক বুদ্ধি হারিয়ে বোকা হয়ে যাচ্ছি। কোন সময় কী করতে হবে সেই বুদ্ধি লোপ পাচ্ছে। দৈনন্দিন কাজ সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আর বিষণ্ণতা ও বিরক্তি আমায় গ্রাস করছে।

জিৎ পোদ্দার
পরামর্শ: তোমাকে ধন্যবাদ আমাদেরকে প্রশ্ন করার জন্য, আমাদেরকে বিশ্বাস করার জন্য। তোমার পুরো প্রশ্নটা পড়লাম। অনেক কিছুই লিখেছো। তোমার প্রশ্ন পড়ে যেটা বুঝা গেল সেটা হলো, তুমি এক ধরনের হতাশা এবং অ্যাংজাইটিতে ভুগছো। এটা বোধহয় ডায়াগনস্টিক ক্রাইটেরিয়া অর্থাৎ রোগ বলার কাছাকাছি পর্যায়ে চলে গেছে। সামনাসামনি দেখা হলে কথা বললে হয়ত আরও একটু বেশি বুঝা যেত।
তোমার দেশের বাড়ি কোথায়? তুমি কোথায় থাকো?—এটা বুঝা গেল না। এটা বুঝা গেলে তোমাকে বলতাম যে, কষ্ট করে তুমি তোমার কাছাকাছি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আছে এরকম কোনো হাসপাতাল বা মেডিক্যাল কলেজে যোগাযোগ করো।
আর যদি তুমি ঢাকায় থাকো, তাহলে তুমি আমাদের বিএমইউ (BMU), বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির আউটডোরে আসতে পারো। যে কাউকেই দেখাতে পারো, তারা সবাই ভালো। প্রতিদিনই দেখাতে পারো এবং এখানে তোমার ওষুধ বা চিকিৎসা যা যা দরকার সবকিছুর ব্যবস্থা আছে। পাশাপাশি সাইকোথেরাপিরও যদি দরকার হয়, সেটারও ব্যবস্থা আছে। যদি তুমি মনে করো ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ যেটা শেরেবাংলা নগর, সেখানেও তুমি যেতে পারো।
আর আমি ব্যক্তিগতভাবে আউটডোরে হলে গিয়ে প্রত্যেক মাসের একদিন বা দুইদিন বসি। সেটা এই যে মনের খবরের নিউজ আকারেও আমরা দিয়ে দেই যে কোন দিন আউটডোরে কোন ডাক্তার বসবে। সেখানেও দেখাতে পারো অথবা একটু আউটডোরে খবর নিতে পারো।
আর তোমার রোগের ব্যাপারে যেটা বলছি, সেটা হলো, তুমি এক ধরনের অ্যাংজাইটি এবং ডিপ্রেশনে ভুগছো। তোমাকে যেটা করতে হবে সেটা হলো, পিছনের কথা বাদ দিবে। অর্থাৎ চেষ্টা করবে পিছনের কথাগুলা না মনে রাখার জন্য। তোমাকে অনেকগুলো ঝামেলার মধ্যে দিয়ে কষ্ট করে এতদূর পর্যন্ত আসতে হয়েছে, সেটা বুঝা গেল। তো আজকে তুমি যেখানে আছো, এখান থেকে সামনে কীভাবে এগোবে, কীভাবে জীবনটাকে গড়বে, তুমি এখন থেকে সেই চিন্তা করবে। কী করতে পারতাম, কী করা উচিত ছিল—এগুলো চিন্তা করা যাবে না। এগুলোর দিকে না চিন্তা করে তুমি চিন্তা করো যে, আমার এখন যা আছে, সেটাকে আমি কীভাবে কাজে লাগাবো।
এখন থেকে তুমি ভালোভাবে ঘুমানোর চেষ্টা করবে। যতটুকু সময় হাতে পাও, সেটাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করো। যেহেতু বাবা নেই এবং অনেকগুলা দায়িত্ব তোমার কাঁধে, অনেকগুলো দায়িত্ব তুমি তখনই সঠিকভাবে পালন করতে পারবে, যদি তুমি মেন্টালি ও ফিজিক্যালি ফিট থাকো। ফিট না থাকলে তোমার স্ট্রেসের কারণে ফিটনেস কমে যায়, ফিটনেসের কারণে কিন্তু আবার তোমার স্ট্রেস তৈরি হয়। এটা একটা সাইকেলের মতো।
সুতরাং যা আছে, সেটা নিয়ে চিন্তা করো এবং তোমার ডেইলি লাইফটাকে একটিভ রাখতে পারলে ভালো। আপাতত তুমি প্রতিদিন সকালবেলা একটা ট্যাবলেট খেতে পারো, Esita-5 mg। সকালের নাস্তার পর একটা করে খাও। এটা আপাতত খাও। এটা খেলে কয়েকদিন লাগবে তোমার অ্যাংজাইটি শরীরে অ্যাডজাস্ট হতে। অ্যাডজাস্ট হওয়ার পর থেকে তোমার অ্যাংজাইটি কমা শুরু করবে। আর যদি সম্ভব হয় আমাদের কারো সাথে সরাসরি দেখা করো। ভালো থাকো, প্রয়োজনে যোগাযোগ করো।
পরামর্শ দিয়েছেন
- অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব
- অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ,
- বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।


