এআই (AI) কী
মানুষের মন জন্মলগ্ন থেকেই অনুসন্ধিৎসু। চিন্তার অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষ তার কৌতূহল নিবৃত্ত করে জ্ঞান পিপাসা মেটায়। মানুষের মস্তিষ্ক চিন্তার মাধ্যমে নিজের সৃজনশীলতাকে আরও শাণিত করে তোলে। কিন্তু নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার সব সময় মানুষের চিন্তা-চেতনা ও আবেগকে প্রভাবিত করেছে। এআইও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে এর নেতিবাচক প্রভাব নির্ভর করে ব্যবহারকারী এটা কীভাবে ব্যবহার করছে তার ওপর। এআই হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা, যা মানুষের চিন্তাভাবনা, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়াকে সফটওয়্যারে অনুকরণ করে অর্থাৎ মস্তিষ্কের কাজগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে করিয়ে নেওয়ার একটি উপায়। এআই নিজে থেকে স্বল্প সময়ে বিশাল পরিমাণ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, প্যাটার্ন চিনতে পারে এবং অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারে। এটা সাধারণত জেনারেটিভ ও প্রথাগত, এই দুই ধরনের হয়ে থাকে। জেনারেটিভ এআই নতুন ধরনের কন্টেন্ট তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে চ্যাটজিপিটি বা গুগলের জেমিনির নাম উল্লেখ করা যায়। আর প্রথাগত এআই নির্দিষ্ট ডেটা বিশ্লেষণ, পূর্বাভাস দেওয়া এবং প্যাটার্ন শনাক্ত করার ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত নিয়ম ব্যবহার করে থাকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানব জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, রচনাচর্চা, যোগাযোগ, গবেষণা কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য সবখানেই এর সরব উপস্থিতি দৃশ্যমান। অল্প কিছু তথ্য-উপাত্ত দিলে এআই মুহূর্তের মধ্যেই প্রবন্ধ, গল্প, প্রতিবেদন কিংবা গবেষণার খসড়া তৈরি করে দিতে পারে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেকেই এটাকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করার পরিবর্তে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে তাদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও আবেগের প্রকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আরও দেখুন…
এআই (AI) মানুষের চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে
এআই মানুষের জন্য একটি শক্তিশালী সহায়ক উদ্ভাবন হলেও এটি মানুষের সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি এবং স্বাধীন চিন্তার বিকল্প নয়। সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে পৃথিবীকে সঠিকভাবে সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য মানুষের সৃজনশীলতা ও মৌলিক চিন্তার অনুশীলন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তুললেও এর অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের উদ্ভাবনীশক্তি, স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে গবেষকরা সতর্ক করছেন। কোনো মানুষ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করে, তখন তার নিজস্ব চিন্তার অনুশীলনের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়। ধরুন, প্রতিদিন আপনি জিমে গিয়ে নিজে না করে রোবট দিয়ে ভারোত্তোলন করলেন, তাহলে আপনার পেশি সুগঠিত ও শক্তিশালী হবে না। গবেষণা মতে, জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে মানুষের দিকনির্দেশনা মনে রাখার ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। অনুরূপভাবে সার্চইঞ্জিনের ব্যবহার মানুষের তথ্য মুখস্থ করা ও মনে রাখার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে মানুষ কোন জটিল কাজ আর মস্তিষ্ক খাটিয়ে করতে চায় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সে তার সমস্যার সমাধান করতে চায়। ফলে ধীরে ধীরে তার সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি ও দক্ষতা সংকুচিত হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত এআই নির্ভরশীলতা মানুষের মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতাকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিজস্ব মেধা ও প্রজ্ঞা ব্যবহারের পরিবর্তে নিয়মিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সমস্যার সমাধান করেন, তারা সৃজনশীল চিন্তার পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পেয়েছে। এআই কোনো বড়ো বিষয়ের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য দ্রুত সংক্ষিপ্ত করে প্রকাশ করার কারণে এখন মানুষের দীর্ঘ লেখা পড়ে বোঝার ধৈর্য এবং জটিল বিষয় নিয়ে চিন্তা করার অভ্যাস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় এআই ভুল তথ্য দিলেও ব্যক্তি তার নিজের বিচার বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে এআইয়ের উপরই বেশি ভরসা করছেন। এটা এক ধরনের ‘কগনিটিভ সারেন্ডার’ বা চিন্তাশক্তির আত্মসমর্পণ যা সৃজনশীলতা তৈরির পথে মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এআই নির্ভর উপাত্তগুলো সাধারণত বেশি অনুমানযোগ্য এবং কম মৌলিক হয়। কেননা মানব মস্তিষ্কের মতো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও আবেগের সমন্বয়ে নতুন ধারণা তৈরি করতে পারে না এআই। এটি শুধু বিদ্যমান তথ্যের ভিত্তিতে নতুন বাক্য নির্মাণ, তথ্য সন্নিবেশ ও ভাষা পরিমার্জন করতে পারে। তাই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক অনুশীলন অব্যাহত রাখাটা জরুরি। শেখার ক্ষেত্রে আগেই এআইয়ের সাহায্য না নিয়ে সময় নিয়ে জেনে বুঝে ও বই পড়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করলে মস্তিষ্ক বিকল্প চিন্তা করার সুযোগ পায়। সমস্যা নিরসনে প্রথমে নিজের চিন্তা ও বিশ্লেষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিলে ফলাফল আরও বেশি নির্ভুল হয়। একজন লেখক যখন লেখেন, সেখানে তার আবেগ-অনুভূতি, চিন্তাশক্তি, তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণ, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নিজের ভাবনার সামঞ্জস্য বিধান করার প্রয়াস থাকে যা তার সৃজনশীলতাকে আরও প্রখর করে তোলে। লেখালেখি কেবলমাত্র শব্দের সমষ্টি নয়, এটি চিন্তা, চেতনা, অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের বহিঃপ্রকাশ। এআই-নির্ভর লেখাগুলোর ভাষা অনেক ক্ষেত্রে চমৎকার হলেও সেখানে চিন্তার গভীরতা ও আবেগ অনুভূতির স্পর্শ থাকে না।
এআই ব্যবহারের আরেকটি সমস্যা হলো ভাষার উপস্থাপনে বৈচিত্র্যহীনতা। একই ধরনের এআই টুল সাধারণত হাজারো লেখা একই রকম ভাষায় উপস্থাপন করে থাকে। এতে সৃজনশীল লেখালেখির ক্ষেত্রে ভাষার বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একজন লেখকের নিজস্ব ভাষাশৈলী তাকে অনেকের মধ্যে আলাদা করে তোলে। ইদানীং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংবাদ মাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এআই-নির্ভর কন্টেন্ট বেড়ে যাচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী ও গবেষক বর্তমানে এআই থেকে তাদের লেখা তৈরি করে নিচ্ছে। ফলে তাদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস, তথ্য যাচাইয়ের প্রবণতা এবং ভাষায় দক্ষতা অর্জনের আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে এআই-নির্ভর একটি প্রজন্ম তৈরি হতে যাচ্ছে যারা শুধু তথ্য উপস্থাপন করতে পারবে কিন্তু নতুন ধারণা সৃষ্টি করতে পারবে না।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারে করণীয়
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কাজের গতি বাড়াতে অবশ্যই প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে উৎসাহিত করতে হবে। প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে এআই ব্যবহারে নতুন ধরনের সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা বিকাশের ওপর জোর দিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি হবে আমাদের আবেগ ও চিন্তার সৃজনশীলতা সৃষ্টির সহায়ক এবং অবশ্যই তা চিন্তাশক্তির বিকল্প নয়। অপরের কল্যাণে কিছু সিদ্ধান্ত অবশ্যই মানুষকে নিতে হবে। মানুষের দক্ষতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে ভারসাম্যমূলক সহাবস্থানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মস্তিষ্কের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অনুশীলন আরও বাড়াতে হবে। আমরা নিজেকে ভালোবাসবো এবং অন্যের সমস্যায় ভালোবেসে পাশে দাঁড়াব। এআই তৈরি করেছে মানুষ, সুতরাং মানুষই এটি নিয়ন্ত্রণ করবে। পরিবর্তিত বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদেরকে যেন আবেগহীন রোবটে পরিণত না করে, সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।
- ডা. মো. আব্দুল মতিন
- সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
- মানসিক রোগ বিভাগ
- রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।


