একদিন চেম্বারে ৩-৪ জন লোক এসে হাজির। জানালেন ২৫-২৬ বছরের একজন যুবক অস্বাভাবিক আচরণ করছে। কিন্তু তাঁরা তাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসতে পারছেন না। সাহায্যের জন্য আবেদন জানালেন। স্কোয়াডের মাধ্যমে যুবকটিকে হাসপাতালে আনা হলো। ইতিহাস নিয়ে জানা গেল-খাবার টেবিলে আপন ভাইকে রডের আঘাতে খুন করেছে সে। কারণ কী? তার বদ্ধমূল ধারণা-ঐ ভাই ষড়যন্ত্র করে তাকে ঠকাচ্ছে।
সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি আরো এক রোগী। বয়স ৬৫ বছর। নিজেই নিজের পেটে ছুরি ঢুকিয়েছেন ও পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলেছেন। রেফার্ড কেস হিসেবে দেখতে যাই। ইতিহাস নিয়ে জানা গেল-অদৃশ্য শক্তি তার যৌনক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে তাই তিনি বাঁচতে চান না এবং যৌনাঙ্গটিও তিনি আর বহন করতে চান না। এরকম নিজেই নিজের গলা কেটে বা গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করা অনেক রোগীকেই আমাদের চিকিৎসা দিতে হয়।
আমরা পত্রিকার খবর থেকে জানতে পারি, গায়েবি আওয়াজে মাকে বেহেস্তে পাঠাতে তুরাগ নদীতে চুবিয়ে মারার ঘটনা। একইভাবে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হওয়ার আশায় মতিঝিলে এক মা তার পুত্র-কন্যাকে হত্যা করেছিল।
আমরা ইতিহাসের পাতা থেকে ম্যাগনটেন কর্তৃক ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী রবার্ট পিলকে গুলি করায় তাঁর ব্যক্তিগত সচিব এডওয়ার্ডের মৃত্যু এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রসেনজিৎ কর্তৃক তারাসোপকে হত্যার কাহিনি জানতে পারি।
পারিবারিক (familial): পারিবারিক অশান্তি, অর্থনৈতিক সমস্যা, এমনকি ডিভোর্সের মতো ঘটনাও ঘটে। শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে ডিভোর্সের ঘটনা ঘটে থাকে।
সামাজিক (socil): এ ধরনের রোগীরা সামাজিক নিয়ম-কানুন মানে না বা বেঝে না। তাই চলাফেরা, ঝগড়া-ঝাটি, মারামারি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করে।
অর্থনৈতিক (economical): এক দিকে রোগী নিজে উপার্জন ক্ষমতা হারায় অন্যদিকে এমন একটি জটিল দীর্ঘমেয়াদি অসুখের চিকিৎসা করতে গিয়ে অনেক পরিবারই চরম অর্থনৈতিক দুরবস্থায় পড়ে। এই অসুখের কারণে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
শারীরিক অসুখ (physical illness): এই অসুখের কারণে খাওয়া-দাওয়াসহ বিভিন্ন ব্যাপারে নিজের প্রতি অবহেলা, ধূমপান, মাদকাসক্তি ইত্যাদির কারণে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, লিভারের রোগ, স্মৃতিভ্রম, রোগসহ বিভিন্ন শারীরিক রোগের প্রবণতা বেড়ে যায়।
আইনগত (legal): এক সময় এই অসুখের কারণে অপরাধের শাস্তি হতো না। পরে শাস্তির পরিমাণ কমিয়ে আনা হয়েছে। এ অসুখের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তি বা দলিলাদি সম্পন্নের ব্যাপারেও জটিলতা দেখা দেয়।
ঔষধ (drugs): চিকিৎসা করতে গিয়ে ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়। তাই, আসুন আমরা সবাই মিলে-মিশে সিজেফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের প্রতি যত্নশীল হই এবং জটিলতার প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করি।
- অধ্যাপক ডা. মো. নিজাম উদ্দিন
- মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
- অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ,
- কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ

