বিভিন্ন সামাজিক স্তরের মধ্যে মানসিক অস্থিরতার প্রভাব” একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিস্তৃত আলোচনার বিষয়। মানসিক অস্থিরতা বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলি বিভিন্ন সামাজিক স্তরের মানুষের মধ্যে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে এবং এটি অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, ও সামাজিক অবস্থা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়।
সামাজিক স্তরকে আমরা মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি যথা-
▶ নিম্ন সামাজিক স্তর অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণি :
নিম্ন আয়ের মানুষ অধিকাংশ সময়ই মানসিক চাপ, উদ্বেগ, হতাশা এবং দুশ্চিন্তার শিকার হন। এটি মূলত তাদের জীবনের আর্থিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য সেবায় অপ্রতুলতা, বাসস্থানের সমস্যা এবং পারিবারিক সহায়তার অভাবের কারণে ঘটে।
নিম্ন সামাজিক স্তরের মানুষের মধ্যে কিছু সাধারণ মানসিক সমস্যা হল:
১. দুশ্চিন্তা (Anxiety)
২. হতাশা (Depression)
৩. দৈহিক এবং মানসিক চাপ (Stress)
৪. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা (Social Isolation)
৫. আত্মসম্মান বা আত্মবিশ্বাসের অভাব (Low Self-esteem)
৬. আত্মহত্যার প্রবণতা (Suicidal Ideation)
৭. অত্যধিক ক্রোধ বা আগ্রাসন (Aggression)
৮. নির্বাণ বা হতাশাগ্রস্ত মনোভাব (Apathy) .
▶ মধ্যবিত্ত শ্রেণি:
মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সাধারণত আর্থিকভাবে স্থিতিশীল হলেও, তারা অন্য ধরনের মানসিক চাপের সম্মুখীন হয়ে থাকে যেমন-
- কর্মসংস্থান এবং ক্যারিয়ার চাপ: উচ্চাকাঙ্খা, ক্যারিয়ার সাফল্য, এবং পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার চাপ তাদের মানসিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
- পারিবারিক সমস্যা: পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা, সন্তানদের শিক্ষা বা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা এবং জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার তাগিদ তাদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
- সামাজিক প্রত্যাশা: সমাজের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামাজিক স্ট্যাটাস বজায় রাখার চাপও মানসিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
▶ উচ্চ সামাজিক স্তর অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল বা অভিজ্ঞানী শ্রেণি :
অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল এবং উচ্চ সমাজের লোকেরা বেশিরভাগ সময় মানসিক অস্থিরতার জন্য অন্য ধরনের চাপের মুখোমুখি হন যেমন-
- আত্ম-সম্মান এবং সামাজিক অবস্থান: উচ্চতর সামাজিক স্তরের লোকদের মাঝে প্রায়ই নিজেকে আরও ভালোভাবে প্রমাণ করার তাগিদ থাকে, যা মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
- পারিবারিক চাপ: উচ্চ সমাজে পারিবারিক সম্পর্ক, বিবাহ, এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা অনেক সময় অত্যধিক চাপের কারণ হতে পারে।
- বিছিন্নতা: যদিও তাদের আর্থিক সুবিধা থাকে, তবে অনেক সময় একাকীত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও মানসিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক সময় তাদের ব্যক্তি সম্পর্কগুলো পারিবারিক বা সামাজিক আশঙ্কার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এছাড়াও, আরো কিছু ফ্যাক্টর যা বিভিন্ন সামাজিক স্তরের মধ্যে মানসিক অস্থিরতার প্রভাব সৃষ্টি করে তাহলো-
➡সম্প্রদায়িক বা জাতিগত বৈষম্য যা মানুষের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং কখনো কখনো আত্মহত্যার প্রবণতা সৃষ্টি করে।
➡মাঝারি আয়ের দেশে পুরুষ বনাম নারী দৃষ্টিভঙ্গি ; কিছু সমাজে নারীরা এখনও সমাজে অবহেলিত, তারা প্রায়ই মানসিক চাপ এবং সহিংসতার শিকার হন। নারীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলি প্রায়শই অবহেলিত হয়, বিশেষ করে গৃহস্থালি সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং অন্যান্য সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে।
নারীদের মধ্যে কিছু মানসিক সমস্যা সাধারণত বেশি দেখা যায়, তবে এটি পুরোপুরি ব্যক্তিগত এবং সামাজিক পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। তবে, কিছু সাধারণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- অন্তর্মুখীতা ও উদ্বেগ: নারীরা উদ্বেগ, স্ট্রেস, এবং হতাশায় বেশি আক্রান্ত হতে পারে, বিশেষ করে সমাজে নারীর প্রতি নির্দিষ্ট প্রত্যাশা বা চাপের কারণে।
- হতাশা ও বিষণ্নতা: বিশেষ করে জীবনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ বা সম্পর্কের জটিলতার কারণে নারীরা বিষণ্নতার শিকার হতে পারেন।
- আত্মবিশ্বাসের অভাব: কিছু নারীর মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা যায়, যা তাদের নিজের ক্ষমতা বা সম্ভাবনার প্রতি সন্দেহ সৃষ্টি করে।
- শরীরের প্রতি অসন্তুষ্টি: নারীদের মাঝে শারীরিক চেহারা বা ওজন নিয়ে উদ্বেগ অনেকটাই বেশি দেখা যায়, যা দেহের প্রতি নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করতে পারে।
- হরমোনাল পরিবর্তন ও মানসিক অবস্থা: বিশেষ করে গর্ভাবস্থা, মেনোপজ বা মাসিক চক্রের সময় নারীদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে।
- পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD): নারীরা কখনও কখনও শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, যা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার এর সৃষ্টি করতে পারে।
এগুলো সবই সাম্প্রতিক মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা, যা নারীদের মধ্যে কিছুটা বেশি লক্ষ্য করা যায়, কিন্তু এর সঙ্গে লিঙ্গের বৈশিষ্ট্য এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটও সম্পর্কিত।
➡তরুণদের মানসিক অস্থিরতার কারণ গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো-সামাজিক সম্পর্কের চাপ, শৈশবের অস্থিরতা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, অপরাধ প্রবণতা, মাদকাসক্তি, আত্মহত্যার প্রবণতা ইত্যাদি।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেশ কিছু সাধারণ মানসিক রোগ বেশি দেখা যায়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো:
- অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার (Anxiety Disorder): তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ বা ভয়ের অনুভূতি বেশি দেখা যায়। পরীক্ষার চাপ, সামাজিক অবস্থা বা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা তাদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
- ডিপ্রেশন (Depression): হতাশা, মনোযোগের অভাব, উদ্বেগ এবং শোকগ্রস্ত অনুভূতি তরুণদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে তুলনা, একাকীত্ব বা পরিবারের অস্থিরতা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।
- অ্যাটেনশন ডিফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার (ADHD): তরুণদের মধ্যে মনোযোগের অভাব এবং অতিরিক্ত সক্রিয়তা (হাইপারঅ্যাকটিভিটি) একটি সাধারণ মানসিক সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
- ইটিং ডিসঅর্ডার (Eating Disorders): যেমন আনরেক্সিয়া, বুলিমিয়া বা কম্পালসিভ ইটিং, যা শারীরিক চিত্র নিয়ে উদ্বেগের কারণে ঘটে থাকে। সামাজিক বা মিডিয়ার চাপ তরুণদের মধ্যে এই ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
- সোশ্যাল অ্যানজাইটি (Social Anxiety): সামাজিক পরিস্থিতিতে ভীতি, অস্বস্তি বা ভয় অনুভব করা তরুণদের মধ্যে সাধারণ। এই সমস্যা তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বড় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
- সেলফ-হান্ট (Self-harm): নিজের শরীরকে আঘাত করা, যেমন কাটাছেড়া বা অন্য কোনো আঘাত দেয়া, এক ধরনের মানসিক চাপ বা হতাশার ফল হতে পারে।
- সাইকলোজিক্যাল ট্রমা (Psychological Trauma): পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যার কারণে, যেমন দুর্ঘটনা, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, তরুণদের মধ্যে মানসিক আঘাত বা ট্রমা দেখা দিতে পারে।
এছাড়া, মাদকদ্রব্য বা অ্যালকোহলের অপব্যবহার, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা সম্পর্কের সমস্যা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই ধরনের সমস্যাগুলি সমাধান করতে, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতনতা বাড়ানো এবং পেশাদার সহায়তা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
➡মধ্যবয়সী বা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা সাধারণত কর্ম, পারিবারিক দায়িত্ব এবং আর্থিক নিরাপত্তা, একাকীত্ব , দীর্ঘস্থায়ী রোগ ইত্যাদি নিয়ে মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন।
➡মেন্টাললি হেলদি (মানসিকভাবে সুস্থ) মানুষদেরও কখনো কখনো মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। যেমন-কাজের চাপ, জীবনের গতির পরিবর্তন, আত্মসম্মান বা আত্মবিশ্বাসের অভাব, মনের ক্লান্তি বা অবসাদ, দাম্পত্য সম্পর্ক বা সন্তানদের সমস্যা, সাফল্য নিয়ে সন্দেহ ইত্যাদি।
➡শারীরিকভাবে দুর্বল বা অসুস্থ মানুষদের মধ্যে অনেক সময় মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে যেমন-স্বাস্থ্য অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ, পরিবারের দায়িত্ব, অর্থনৈতিক চাপ, দৈনন্দিন কাজের প্রতি অসমর্থতা, নিজের অক্ষমতা নিয়ে ক্রোধ ইত্যাদি।
- এছাড়াও, অফিসে কর্মীদের মধ্যে কিছু সাধারণ মানসিক রোগের প্রবণতা থাকে, যেগুলি মূলত কাজের চাপ, অতিরিক্ত চাপ, দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম, ও মানসিক চাপের কারণে উদ্ভূত হয়। এর মধ্যে কিছু সাধারণ মানসিক সমস্যা হল:
- স্ট্রেস (Stress): অফিসের কাজের চাপ, কর্মক্ষেত্রে সম্পর্কের সমস্যার কারণে স্ট্রেস হতে পারে। স্ট্রেসের ফলে অনিদ্রা, মানসিক ক্লান্তি, এবং অন্যান শারীরিক অসুস্থতা দেখে দিতে পারে।
- অ্যাংজাইটি: কাজের চাপ বা ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগ অনেক অফিস কর্মীর মধ্যে দেখা যায়। এটি ঘন ঘন উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, এবং একাগ্রতার অভাব সৃষ্টি করতে পারে।
- ডিপ্রেশন (Depression): কাজের পরিবেশ বা ব্যক্তিগত জীবনের কারণে কর্মীরা মাঝে মাঝে বিষণ্ণতার শিকার হন। এটি একাকীত্ব, আগ্রহের অভাব, এবং শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির সৃষ্টি করতে পারে।
- বর্ধিত কাজের চাপ (Burnout): একটানা কাজের চাপ, ছুটি না নেওয়া, এবং কাজের মধ্যে বিরতি না নেওয়ার কারণে “বর্নআউট” বা সম্পূর্ণ ক্লান্তি হতে পারে। এতে কর্মক্ষমতা কমে যায় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে।
- ওয়ার্কহোলিজম (Workaholism): অতিরিক্ত কাজের প্রতি আসক্তি অফিস কর্মীদের মধ্যে দেখা দিতে পারে, যার ফলে তারা শারীরিক এবং মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
- সোশ্যাল অ্যানডাক্সি (Social Anxiety): কিছু কর্মী অফিসের সামাজিক পরিবেশে অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন, যার কারণে তারা দলীয় কাজ বা সভা থেকে বিরত থাকেন।
এই সমস্যাগুলির প্রতিকার হতে পারে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, সময়মতো বিশ্রাম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, এবং অফিস পরিবেশের উন্নতির মাধ্যমে।
সব শেষে বলা যায় সামাজিক স্তর এবং মানসিক অস্থিরতার মধ্যে একটি জটিল সম্পর্ক বিদ্যমান, যেখানে ব্যক্তির আর্থিক, সাংস্কৃতিক, এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট তার মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ বিভিন্ন ধরনের মানসিক চাপ ও অস্থিরতার সম্মুখীন হন, এবং এই চাপগুলি দূর করতে সমাজের সমান সুযোগ এবং সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. রুবাইয়াৎ ফেরদৌস
সহকারী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি বিভাগ।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
সিরিয়ালের জন্য ভিজিট করুন- এপোয়েন্টমেন্ট
আরও দেখুন-




