কেস স্টাডি –১ : ৭৩ বছর বয়সি আব্দুর রহমান সাহেবের নাতনী স্নেহার জন্মদিনের প্রোগ্রামের শেষে পরিবারের সবাই আড্ডায় ব্যস্ত। তখন হঠাৎই চেঁচামেচির শব্দে দৌড়ে গিয়ে দেখা গেলো আব্দুর রহমান সাহেব চিল্লাচ্ছেন? তার হাতঘড়ি কে যেন নিয়ে গেছে। তার সন্দেহ কাজের লোকদের ওপর। আব্দুর রহমান সাহেবের কর্মকাণ্ডে উনার স্ত্রী ভীষণ লজ্জিত হলেন। বললেন, ঘড়ি পাওয়া যাবে, উনিই কোথাও রেখেছেন। গত কয়েকমাস থেকেই তিনি এমন করছেন, সন্দেহ আর সন্দেহ। এ তার এটা নিয়ে গেছে, ও সেটা নিয়ে গেছে। সাথে আছে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা। ছেলে-মেয়েরা চিন্তায় পড়ে গেল। কি হলো বাবার? ডাক্তার দেখাবে? দেখালে কোন বিষয়ের ডাক্তার?
কেস স্টাডি–২: ষাটোর্ধ্ব মোহসিন সাহেব ব্যাংক জবে কৃতিত্বের সাথে কাজ করে এখন আবার রিটায়ারমেন্টের পর পরামর্শক হিসেবে ব্যাংকে কাজ করছেন। ইদানীং কলিগরা লক্ষ্য করছেন কেমন যেন গুটিয়ে থাকেন তিনি। কেমন ভয়ার্ত চেহারা। কাছের সহকর্মী ইদ্রিস সাহেব সেদিন জিজ্ঞেস করায় ভীষণ মন খারাপ করে বললেন, সবাই তাকে নিয়ে কথা বলে। ওরা তার ক্ষতি করতে চায়, মেরে ফেলতে চায়। তার ভীষণ ভয় লাগে। বললেন, ‘ইদ্রিস সাহেব আমাকে বাঁচান, আমাকে ওরা মেরে ফেলবে। দিন-রাত আমার পেছনে লেগে থাকে তারা। আমি ঘুমোতে পারি না।’ ইদ্রিস সাহেব অবাক হয়ে গেলেন। এমন চৌকস অফিসারের এ কি অবস্থা! কোনো অবস্থাতেই তাকে বোঝানো গেলো না এটা তার মনের ভুল। চিন্তিত হয়ে তিনি ভাবলেন, আচ্ছা এটা মোহসিন সাহেবের কোনো
মানসিক রোগের কারণে হচ্ছে না তো? আসলে কী হয়েছিল জনাব রহমান বা মোহসিন সাহেবের? তারা কি মানসিক কোনো সমস্যায় ভুগছেন? চলুন জেনে নেই।
প্রাকৃতিক নিয়মেই বয়স বাড়তে থাকে। এক সময়ের পরাক্রমশালী, কর্মঠ মানুষজনও বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে যায়, এবং কিছুটা অসহায়ও হয়ে পড়ে। এ সময়ে শারীরিক সমস্যায় শরীর নড়বড়ে হয়ে যেতে থাকে, সাথে যদি মানসিক সমস্যা যুক্ত হয় তবে সেটা ব্যক্তির নিজের সাথে সাথে পরিবারের জন্যও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৬৫ বছর বয়সি বা তদূর্ধ্বদের প্রবীণ বা বয়স্ক ব্যক্তি বলা যায়।
কয়েক দশকের গবেষণায় দেখা গেছে যে বয়স্ক ব্যক্তিরা মানসিক রোগের যথেষ্ট ঝুঁকিতে থাকেন। যার মধ্যে রয়েছে সাইকোসিস, ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, নেশা দ্রব্য ব্যবহার ইত্যাদি। সাইকোসিসের মধ্যে ডিলুশন বা বিভ্রম, হ্যালুসিনেশন বা ভ্রান্তি বা আচরণগত সমস্যা নিয়ে প্রেজেন্ট করে। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে সাইকোসিসের মধ্যে প্রবীণরা সাধারণত ডিলুশনে বেশি ভুগে থাকেন।
নিশ্চয়ই অনেকের সাইকোসিস, ডিলুশন, বিভ্রম শব্দগুলো বুঝতে একটু সমস্যা হচ্ছে। চলুন ব্যাপারগুলো বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি।
সাইকোসিস বলতে মানসিক রোগের এই অবস্থা বোঝায় যা বাস্তব এবং অবাস্তবের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। সাইকোসিস একজন ব্যক্তির পাঁচটি ইন্দ্রিয়, তাদের আচরণ এবং তাদের আবেগকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থাৎ সাইকোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তি বাস্তবতার সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে।
সাইকোসিসের লক্ষণগুলি ভিন্ন, তবে দুটি সাধারণ লক্ষণ হলো হ্যালুসিনেশন এবং ডিলুশন বা বিভ্রম। হ্যালুসিনেশন হচ্ছে কেউ কিছু শুনবে, অনুভব করবে বা দেখবে যা আসলে বাস্তব নয়।
হ্যালুসিনেশনের যদিও বাস্তবে কোনো ভিত্তি নেই, কিন্তু যারা কোনো আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে, তাদের জন্য সেটি খুব ভীতিকর। একইভাবে বিভ্রান্তি বা ডিলুশন হলো যখন একজন ব্যক্তি এমন কিছুতে দৃঢ় বিশ্বাস বজায় রাখে যার আসলে বাস্তবে কোনো ভিত্তি নেই। এই বিশ্বাসগুলি ব্যক্তি এবং তার আশেপাশের মানুষের জন্য দৈনন্দিন জীবনে ভীতিজনক, বিভ্রান্তিকর এবং স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হতে পারে। তাই হ্যালুসিনেশন বা ডিলুশন রোগীর সাথে সাথে তার পরিবারের জন্যও কষ্টকর ও বিড়ম্বনার। যেসব কারণে হতে পারে ডিলুশন:-
প্রবীণদের বিভ্রম বা ডিলুশনের কারণ
১. ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশজনিত রোগ।
২. ডিলুশনাল ডিজঅর্ডার
৩. ডেলিরিয়াম, যা সাধারণত কোনো সংক্রমণ কিংবা
অপারেশন পরবর্তী সময়ে হয়ে থাকে।
৪. কোনো ওষুধের ইফেক্টে।
৫. নেশাদ্রব্য গ্রহণে
৬. শারীরিক রোগের কারণে, যেমন মাল্টিপল স্কেরোসিস, পারকিনসন্স ডিজিজ।
৭. ডিপ্রেশনে সাইকোসিস হলে।
৮. সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার বা অন্য কোনো গুরুতর মানসিক রোগের সাথে।
সাধারণত দেখা যায় বৃদ্ধ বয়সে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের কগনিটিভ কর্মক্ষমতা কমে যায়। সাথে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হলে কগনিটিভ বিপর্যয়ের সাথে সাথে স্মৃতি ভ্রংশতার কারণে প্যারানয়েড ডিলুশন দেখা দেয়। এভাবে নেশাদ্রব্য, কোনো ওষুধ কিংবা ওপরে বর্ণিত মানসিক বা শারীরিক অন্যান্য কারণেও ডিলুশন দেখা দেয়।
এখন এই প্রশ্ন আসবে, এই ডিলুশনের কি চিকিৎসা আছে? উত্তর হবে হ্যাঁ, অবশ্যই চিকিৎসা আছে। প্রথমেই আপনার সঠিক রোগ নির্ণয় করতে হবে এবং সে অনুযায়ী রোগের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে হবে। এজন্য রোগীকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাতে হবে। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে, সেই শিশু বয়সের মতোই বৃদ্ধ বয়সেও মানুষ অনেকটা অসহায় ও নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তাই তাদের কোনো অস্বাভাবিক আচরণে বিরক্ত বা রাগ না দেখিয়ে ধৈর্যের সাথে পরিবারের সবাই মিলে বিষয়টি মোকাবিলা ও পরিচালনা করতে হবে।
- ডা. রেজওয়ানা হাবীবা
- কনসালটেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট
- সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট।

