তিনি একজন প্রিয় বন্ধু, অসাধারণ নেতা, মানবদরদী ও সফল রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। গত ছয় দশক ধরে তাকে প্রিয় বন্ধু বলার সম্মান ও সুযোগ আমি পেয়েছি। কিন্তু অসাধারণ ঘটনা হলো, লাখ লাখ মানুষ যারা তাকে কখনো দেখেননি, তাদের কাছেও তিনি ছিলেন প্রিয় বন্ধু। এই কথাগুলো বলে স্মৃতিচারণ করেছিলেন আমেরিকার সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি জিমি কার্টার প্রসঙ্গে এই কথাগুলো বলেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের উদ্দেশে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করে বলেন, জিমি কার্টার আমেরিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তিনি সেই সময় সকল চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করেছেন দৃঢ়তার সাথে। তিনি আমেরিকার মানুষের জীবনমান উন্নত করতে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছেন। তার জন্য আমরা কার্টারের কাছে ঋণী।
এই মহান মানুষটি ১৯২৪ সালের ১লা অক্টোবর জর্জিয়ার প্লেইন্স শহরে জন্মগ্রহণ করেন। জেমস আর্ল কার্টার জুনিয়র ছিলেন একজন অনরমুখী ও পরিশ্রমী মানুষ। তিনি তার গভীরভাবে খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসী এবং বর্ণবাদে বিভক্ত আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে শৈশব থেকে শেখা শিক্ষার উপর জীবন গড়ে তোলেন। তার জীবনের সবচেয়ে কাছের সাথী ছিলেন স্ত্রী রোজালিন, যাকে তিনি ১৯৪৬ সালে বিয়ে করেন। তাদের বিবাহিত জীবনের মেয়াদ ছিল ৭৭ বছর, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ। তার বাবা চিনাবাদামের খামারের মালিক ছিলেন এবং তার মা ছিলেন একজন নিবন্ধিত নার্স। জুনিয়র কার্টার মেরিল্যান্ডের ইউ.এস নেভাল একাডেমিতে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৫৩ সালে তার পিতার মৃত্যু হলে তিনি চাকরি ছেড়ে জর্জিয়ায় ফিরে আসেন এবং পরিবারের চিনাবাদামের ব্যবসা পরিচালনা করেন। এই কারণে তাকে “বাদামচাষী থেকে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি” এই অভিধায় অভিহিত করা হয়।
তার মানসিক নৈতিকতা এবং দৃঢ়তাবোধ তাকে রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে নিয়ে আসে। ১৯৬২ সালে রাজ্য রাজনীতিতে প্রবেশ করেন কার্টার। জিমি কার্টার শুরুতে নাগরিক অধিকার সংগ্রামের একজন সমর্থক ছিলেন। কিশোর বয়স থেকেই গার্ভদান ব্যাপ্টিস্ট সানডে স্কুলের শিক্ষক ছিলেন জিমি কার্টার। তার এই শিক্ষকতা জীবনের আদর্শই তাকে দায়িত্ব পালনে ও নৈতিকতার চেতনা ধারণে পরবর্তী জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সহায়তা করে।
তাই তিনি রাগঢাক ছাড়াই নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়টি প্রকাশ করতেন। ১৯৬২ এবং ১৯৬৪ সালে জর্জিয়ার সিনেটে ডেমোক্র্যাট হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে জর্জিয়ার গভর্নরের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, কিন্তু হেরে যান। বিষণ্ণতা তাকে সাময়িকভাবে ঘিরে ধরে। কিন্তু তিনি নিজেকে গুটিয়ে রাখার মতো নিভৃতচারী মানুষ ছিলেন না। তিনি ১৯৭০ সালে আবার গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং এইবার জিমি কার্টার জয়ী হন। উদ্বোধনী ভাষণে তিনি জাতিগত বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান। তিনি আফ্রিকান আমেরিকান এবং মহিলাদের সরাসরি সরকারি অফিসে নিয়োগ দেন।
কার্টার পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ১৯৭৬ সালের জুলাইয়ে ডেমোক্র্যাটিক মনোনয়ন জিতেছিলেন। তিনি সিনেটর ওয়াল্টার এফ. মন্ডেলকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করেন। ১৯৭৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিমি কার্টার একটি সুসংগঠিত প্রচারণা চালিয়ে সহজেই বিজয়ী হন। এই প্রচারণা জনগণের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর ওয়াশিংটনের প্রতি তৈরি হওয়া আস্থার সংকটকে কাজে লাগিয়েছিল। এই কেলেঙ্কারির কারণে রিচার্ড নিক্সন ১৯৭৪ সালে পদত্যাগ করেছিলেন। তার প্রশান্ত হাসি, অকপট ভালোবাসার জন্য তিনি হোয়াইট হাউসে নতুন হাওয়া বইয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। তারই সফলতার ফসল হিসেবে ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে তিনি রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড আর. ফোর্ডের বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ১৯৭৭ সালে তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে কার্টার তার মেয়াদের প্রথম বছরে একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পানামা খালের ব্যবস্থাপনা পানামার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর কার্টার ও পানামার জাতীয়তাবাদী নেতা ওমর তোরিজোস পানামা খাল চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির শর্ত মেনে ১৯৯৯ সালে পানামার কাছে খালটির নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তির স্বাক্ষরের সময় কার্টার বলেছিলেন, “বিশ্বের দেশগুলোর সাথে চুক্তির কেন্দ্রে থাকা উচিত ন্যায়বিচার, বলপ্রয়োগ নয়।”
মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি পুনঃস্থাপনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে কার্টার তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন ও মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্প ডেভিডে আমন্ত্রণ জানান। কার্টারের মধ্যস্থতায় ১৩ দিনের গোপন আলোচনার পর দুটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন।
হোয়াইট হাউস থেকে বিদায়ের পর তিনি ও তার স্ত্রী রোজালিন কার্টার চ্যারিটি কর্মসূচি শুরু করেন। তারা চার হাজারের বেশি বাড়ি সংস্কারে সহায়তা করেন। একই সাথে মারানাথা ব্যাপ্টিস্ট চার্চে শিক্ষকতা অব্যাহত রাখেন। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষে উত্তর কোরিয়ায় শান্তি মিশনে যান তিনি। আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ে কাজ করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তার এই স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন। ইতিহাসের এই অবিসংবাদিত নেতা ২০২৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর জর্জিয়ার প্লেইন্সে নিজ বাড়িতে ১০০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
তার রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যে যেমন উদারপন্থার ছাপ ছিল, তেমনি তিনি আবার ধর্মবিশ্বাস থেকেও সরে যাননি। তিনি বলতেন, “আপনি ধর্মবিশ্বাস ও জনসেবা আলাদা করতে পারেন না। আমি কখনো ঈশ্বরের ইচ্ছা আর আমার রাজনৈতিক দায়িত্বের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখিনি। আপনি একটি লঙ্ঘন করলে, আরেকটিও লঙ্ঘিত হবে।”
ডা. মনিশংকর বালা
এমডি -সাইকিয়াট্রি (বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়)
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও দেখুন-


