আধুনিক সমাজে গ্যাম্বলিং বা জুয়া একটি অতি পরিচিত শব্দ। এটি শুধুমাত্র ক্যাসিনো বা লটারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং খেলার মাঠ থেকে শুরু করে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। গ্যাম্বলিং আসক্তি হলো এমন একটি মানসিক অবস্থা যেখানে ব্যক্তি জুয়া খেলার প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ অনুভব করে, যা তার জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এটিকে একটি আসক্তির রোগ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এই আসক্তি দ্রুত বাড়ছে, বিশেষ করে কিশোর ও যুবকদের মধ্যে। খেলার মাঠে বাজি রাখা থেকে অনলাইন বেটিং অ্যাপস পর্যন্ত, এটি একটি সামাজিক মহামারির রূপ নিয়েছে।
গ্যাম্বলিং আসক্তির উত্থান: খেলার মাঠ থেকে শুরু
গ্যাম্বলিং আসক্তির শিকড় অনেক সময় খেলার মাঠে পাওয়া যায়। শৈশবে বা কৈশোরে খেলার সময় বন্ধুদের সাথে ছোটোখাটো বাজি রাখা, যেমন ক্রিকেট ম্যাচে কে জিতবে সেটা নিয়ে টাকা বাজি ধরা, এটি একটি সাধারণ দৃশ্য। বাংলাদেশে গ্রামীণ এলাকায় ফুটবল বা কাবাডি খেলায় বাজি রাখা একটি বহু পুরাতন সাংস্কৃতিক অভ্যাস।
এই ছোটো ছোটো বাজি থেকে আসক্তির বীজ রোপিত হয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, জয়ের আনন্দে ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ হয়, যা ব্যক্তিকে আরও খেলতে উদ্বুদ্ধ করে।
যখন এই আসক্তি বড়ো হয়, তখন এটি পেশাদার স্তরে চলে যায়। উদাহরণস্বরূপ, আইপিএল বা বিপিএল ম্যাচগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাজি রাখে। খেলার মাঠে দর্শকদের মধ্যে অবৈধ বুকিং চলে, যা আসক্তিকে আরও গভীর করে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতে প্রতি বছর ক্রীড়া-সংশ্লিষ্ট গ্যাম্বলিংয়ে ৮০০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়, এবং এর মধ্যে ৩০% যুবকরা। বাংলাদেশেও এই প্রবণতা বাড়ছে, যেখানে খেলার মাঠগুলো আসক্তির প্রথম স্তর হিসেবে কাজ করে। এখান থেকে অনেকে অনলাইন গ্যাম্বলিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে, কারণ এটি আরও সহজলভ্য।
অনলাইন গ্যাম্বলিং: সর্বব্যাপী আসক্তির নতুন মুখ
আজকের ডিজিটাল যুগে গ্যাম্বলিং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়েছে। স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায়, বিভিন্নরকম অ্যাপস বা স্থানীয় অবৈধ সাইটগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ জুয়া খেলছে। বাংলাদেশে অনলাইন গ্যাম্বলিং অবৈধ হলেও, VPN ব্যবহার করে লোকেরা এতে যুক্ত হয়। এই আসক্তির একটি বড়ো কারণ হলো সহজ প্রবেশাধিকার। একটি ক্লিকেই বাজি রাখা যায়, এবং লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে খেলা দেখতে দেখতে জুয়া খেলা হয়।
অনলাইন গ্যাম্বলিংয়ের আসক্তি খেলার মাঠের চেয়ে আরও বিপজ্জনক। যুবকরা ক্লাস চলাকালীন বা রাত্রে না ঘুমিয়ে জুয়া খেলে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১৮-২৫ বছর বয়সিদের মধ্যে ১৫% অনলাইন গ্যাম্বলিংয়ে আসক্ত। এর পিছনে রয়েছে বিজ্ঞাপনের প্রভাব। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেলিব্রিটিরা প্রমোট করে, যা যুবকদের আকর্ষণ করে। উদাহরণস্বরূপ, ক্রিকেটাররা অনলাইন বেটিং অ্যাপের বিজ্ঞাপন দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করে, কিন্তু এতে যুবকরা আসক্ত হয়ে পড়ে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গেমিফিকেশন, যেমন পয়েন্ট সিস্টেম বা বোনাস, আসক্তিকে বাড়িয়ে তোলে। ফলে, অনেকে ঋণ করে জুয়া খেলে, যা পরিবারকে ধ্বংস করে।
আসক্তির কারণ এবং প্রভাব
গ্যাম্বলিং আসক্তির মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মানসিক চাপ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক প্রভাব। অনেকে দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভে জুয়া শুরু করে। খেলার মাঠে এটি বন্ধুত্বের অংশ হিসেবে শুরু হয়, কিন্তু অনলাইনে এটি একাকিত্বের সমাধান হয়ে ওঠে।
প্রভাবগুলো বহুমুখী। মানসিকভাবে, এটি উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ায়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গ্যাম্বলিং আসক্তদের মধ্যে ২০% আত্মহত্যার চেষ্টা করে। অর্থনৈতিকভাবে, এটি পরিবারের ধ্বংস ঘটায়। বাংলাদেশে অনেক যুবক ঋণ করে জুয়া খেলে, যা বাড়ি বিক্রি বা চুরির দিকে নিয়ে যায়। সামাজিকভাবে, এটি সম্পর্ক ভাঙে; বিবাহবিচ্ছেদের হার বাড়ায়। খেলার মাঠে আসক্তি কিশোরদের পড়াশোনা নষ্ট করে, আর অনলাইনে এটি সাইবার ক্রাইমের সাথে যুক্ত হয়, যেমন অবৈধ অ্যাপস থেকে ডেটা চুরি পর্যন্ত গড়াতে পারে।
সমাধানের উপায়: সচেতনতা এবং নিয়ন্ত্রণ
গ্যাম্বলিং আসক্তি মোকাবিলায় প্রথমে সচেতনতা দরকার। স্কুল এবং কলেজে এর ক্ষতিকর দিক নিয়ে শিক্ষা দেওয়া উচিত। সরকারকে অনলাইন গ্যাম্বলিং সাইট ব্লক করতে এবং অবৈধ বুকিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকরা যুবকদের অনলাইন কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করবেন এবং খেলার মাঠে বাজি রাখা নিরুৎসাহিত করবেন। চিকিৎসায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, কাউন্সেলিং এবং সাইকোথেরাপি কার্যকর। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়িয়ে, যুবকদের চাকরি বা উদ্যোগীতায় উৎসাহিত করলে আসক্তি কমবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে দায়িত্বশীল করতে হবে। যেমন, বয়স যাচাই এবং লিমিট সেটিং। ক্রীড়া সংস্থাগুলো বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করবে।
গ্যাম্বলিং আসক্তি খেলার মাঠ থেকে অনলাইন পর্যন্ত একটি বিস্তৃত সমস্যা, যা যুবসমাজকে ধ্বংস করছে। এর কারণগুলো বোঝা এবং প্রভাব মোকাবিলা করা জরুরি। সচেতনতা, আইনি নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আমরা যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করি, তাহলে একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
- ডা. মৃত্যুঞ্জয় কুমার সরদার
- মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

