সাভারের আলোচিত সিরিয়াল কিলার মশিউর রহমান খান সম্রাটের (৪০) মৃত্যু হয়েছে। গত ২৩ মার্চ ২০২৬, সোমবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকাকালীন বুকে ব্যথা অনুভব করলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। ৭টি হত্যা মামলাসহ অসংখ্য অপরাধের চার্জশিটভুক্ত আসামি ছিলেন এই ‘সম্রাট’।
আইনের চোখে তিনি একজন ভয়ংকর অপরাধী—এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক: কীভাবে একজন মানুষ দিনের পর দিন এমন নৃশংস অপরাধের সাথে যুক্ত থাকতে পারে?
অপরাধ নাকি মানসিক ব্যাধি?
রাগ বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনার বশে কেউ অপরাধ করে ফেলে, কেউ বা সম্পদ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে খুনের পথ বেছে নেয়। প্রেম, বিয়ে বা সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকেও খুনের ঘটনা আমরা অহরহ দেখি। কিন্তু সম্রাটের মতো একজন মানুষ, যিনি ঠান্ডা মাথায় একের পর এক খুন করে লাশ গুম করা বা পুড়িয়ে ফেলার মতো কাজ করেছেন, তা কোনো সাধারণ সমীকরণ দিয়ে মেলানো কঠিন।
অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় এর ব্যাখ্যা কী?
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে:
-
অ্যান্টিসোশ্যাল পারসোনালিটি ডিজর্ডার: যেখানে মানুষের প্রতি কোনো সহমর্মিতা থাকে না।
-
ডিলুশনাল ডিজর্ডার ও সিজোফ্রেনিয়া: হ্যালুসিনেশন বা ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারণে অপরাধপ্রবণতা।
-
মাদকাসক্তি: যা মানুষের হিতাহিত জ্ঞান লোপ করে।
-
নিউরোলজিক্যাল সমস্যা: মস্তিষ্কের গঠনগত কোনো ত্রুটি যা আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
কেন মানসিক পরীক্ষা জরুরি?
পেশাদার খুনিরাও সাধারণত কোনো না কোনো অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যে খুন করে। কিন্তু মোটিভ ছাড়া বা তুচ্ছ কারণে একের পর এক খুন করা কি সুস্থ মস্তিষ্কের কাজ? এখানেই প্রশ্ন আসে অপরাধীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার।
১. মূল কারণ উদ্ঘাটন: কেন একজন মানুষ অপরাধী হয়ে উঠছে, তা বুঝতে পারলে ভবিষ্যতে এমন অপরাধ ঠেকানো সম্ভব।
২. দ্রুত হস্তক্ষেপ: যদি অপরাধীর মানসিক সমস্যা বা মাদকাসক্তি শনাক্ত করা যায়, তবে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে পরবর্তী বড় কোনো দুর্ঘটনা থেকে নিরপরাধ মানুষকে বাঁচানো সম্ভব।
আমাদের করণীয় কী?
সমাজে অপরাধ কমিয়ে আনতে কেবল শাস্তিতেই সমাধান সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
-
সচেতনতা বৃদ্ধি: কারও আচরণ বা চিন্তায় অস্বাভাবিকতা দেখলে দ্রুত পরিবার বা প্রশাসনকে অবহিত করা।
-
বিশেষায়িত ইউনিট: পুলিশ হাসপাতালগুলোতে অপরাধীদের মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত লোকবলসহ বিশেষ ইউনিট গঠন করা।
-
দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ: কেবল একবার দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, অপরাধীকে ভর্তির মাধ্যমে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা যাতে তার মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাগুলো পরিষ্কার বোঝা যায়।
আমাদের মনে রাখা দরকার, কেউ অপরাধী হয়ে জন্মায় না। পরিবেশ এবং মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা মানুষকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। যদি আমরা গোঁড়ায় গিয়ে কারণগুলো বুঝতে পারি, তবে প্রতিকারের পথ অনেকটাই সহজ হবে।
আসুন, সচেতন হই। সুস্থ থাকুন মনে ও প্রাণে।

