বাংলাদেশে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চারটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করেছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। এই বাধাগুলো হলো— দক্ষ জনবল সংকট, পর্যাপ্ত বাজেটের অভাব, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং সামাজিক কুসংস্কার বা ‘স্টিগমা’। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিসেবার সামগ্রিক চিত্র’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বিএমইউ-এর মনোরোগবিদ্যা বিভাগ এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট হেলথ (বিএসিএএমএইচ) যৌথভাবে এই কর্মশালার আয়োজন করে। কর্মশালায় ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত পরিচালিত একটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, দেশে মানসিক রোগে আক্রান্ত বিশাল সংখ্যক শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সেবা দেওয়ার জন্য মাত্র ২১ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট) রয়েছেন, যেখানে সাধারণ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ৫০০-এর বেশি।
গবেষনাটি CAMHSAN (শিশু ও কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য দক্ষিণ এশিয়ান নেটওয়ার্ক) কর্মপরিকল্পনার অংশ ছিল। CAMHSAN হলো দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক, যা ২০২৩ সালে ইউনিসেফ (UNICEF)-এর সহায়তায় যাত্রা শুরু করে। এর মূল লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলের শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য চাহিদা পূরণে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা। ইউনিসেফের সহযোগীতায় গবেষনা কার্যক্রমটি ৩ মাস পরিচালিত হয়। গবেষনা কার্যক্রমটি পরিচালনায় অংশগ্রহনকারী সদস্যাগন হলেন –
- অধ্যাপক ডা. নাহিদ মাহজাবিন মোর্শেদ
- অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ প্রফেসর ড
- অধ্যাপক ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব
- সহকারী অধ্যাপক ডা. সিফাত ই সৈয়দ
- ডা. আ হ ম মোস্তফা কামাল সৈকত
- ডা. ফাতেমা তুজ জোহোরা জোতি
- ডা. সাবরিনা রাফি
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের বরাত দিয়ে জানানো হয়:
- দেশের মোট জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।
- শিশুদের মধ্যে এই হার ১২.৬ শতাংশ।
- সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো— মানসিক রোগীদের ৯৪.৩ শতাংশই কোনো ধরনের চিকিৎসার আওতায় নেই।
বিএমইউ-এর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, “মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো ১৪ বছর বয়সের মধ্যেই দেখা দেয় এবং ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে তা ২৪ বছর বয়সের আগে শুরু হয়। তাই এই বয়সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, “আমাদের কাছে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে ডাটা সংরক্ষণ ও নিয়মিত জরিপ প্রয়োজন। এছাড়া স্কুল পর্যায়ে পাঠ্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।”
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মো. নিজাম উদ্দিন এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুর রহমান উভয়েই পরিবেশগত অবক্ষয় এবং ইউনিয়ন পর্যায় থেকে প্রাথমিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কর্মশালায় শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করা হয়েছে:
১. আইন ও নীতি বাস্তবায়ন: বিদ্যমান শিশু ও কিশোর-কিশোরী সম্পর্কিত নীতি, আইন এবং কর্মপরিকল্পনা দ্রুত কার্যকর করা।
২. বাজেট বরাদ্দ: মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং তার সঠিক ব্যবহার।
৩. বহু-ক্ষেত্রীয় সহযোগিতা: বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ।
৪. তৃণমূল পর্যায়ে প্রশিক্ষণ: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৫. পাঠ্যক্রম সংশোধন: স্বাস্থ্য শিক্ষার পাঠ্যসূচিতে শিশু ও কিশোর মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা।
৬. উদ্ভাবনী পদক্ষেপ: আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা শনাক্তে আধুনিক ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার।
৭. সচেতনতা বৃদ্ধি: সামাজিক কলঙ্ক কমাতে চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রান্তিক পর্যায়ের হাজার হাজার মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই বৈষম্য দূর করতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প নেই।
আরও দেখুন-


