কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা (Artificial Intelligence) বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম আলোচিত প্রযুক্তি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে AI-এর ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানসিক রোগ চিকিৎসাও এর বাইরে নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে AI-ভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তি মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
AI মূলত বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট ধরন বা প্যাটার্ন শনাক্ত করতে পারে। রোগীর উপসর্গ, আচরণগত পরিবর্তন, ভাষার ব্যবহার, ঘুমের ধরন, চিকিৎসার ইতিহাস এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে এটি চিকিৎসককে রোগ সম্পর্কে আরও তথ্যসমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে।
মানসিক রোগের ক্ষেত্রে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, বাইপোলার ডিজঅর্ডার, সাইকোসিস এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি মূল্যায়নে AI-ভিত্তিক বিভিন্ন গবেষণা আশাব্যঞ্জক ফলাফল দেখিয়েছে। এছাড়া ইলেকট্রনিক মেডিক্যাল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করা, চিকিৎসার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা এবং রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরিতেও AI সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
আরও দেখুন…
বর্তমানে AI-সমর্থিত চ্যাটবট এবং ডিজিটাল মানসিক স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য প্রদান, প্রাথমিক কাউন্সেলিং, সাইকোএডুকেশন এবং নিয়মিত ফলো-আপে সহায়তা করছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা রয়েছে, সেখানে এই প্রযুক্তি প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শিশু ও কিশোর মনোরোগবিদ্যায় AI-এর সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্য। আচরণগত পরিবর্তন, শিক্ষাগত অগ্রগতি, ঘুমের সমস্যা এবং অন্যান্য ক্লিনিক্যাল তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকির প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করতে AI সহায়তা করতে পারে। তবে এসব তথ্য কখনোই একজন প্রশিক্ষিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নের বিকল্প হতে পারে না।
যদিও AI-এর সম্ভাবনা অনেক, তবুও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মানসিক রোগ চিকিৎসা কেবল তথ্য বিশ্লেষণের বিষয় নয়; এটি রোগীর আবেগ, ব্যক্তিত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একজন রোগীর অনুভূতি, সহমর্মিতার প্রয়োজন কিংবা জটিল পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট AI সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করতে পারে না। এছাড়া রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপত্তা, অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত (algorithmic bias) এবং প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদার তুলনায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা সীমিত, সেখানে AI-সমর্থিত স্ক্রিনিং, টেলি-সাইকিয়াট্রি এবং ডিজিটাল মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এবং নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে হওয়া উচিত।
ভবিষ্যতের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় AI ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। AI তথ্য বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি শনাক্তকরণে সহায়তা করবে, আর চিকিৎসক তাঁর ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সহমর্মিতার মাধ্যমে রোগীর জন্য সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করবেন।
প্রযুক্তির অগ্রগতির এই সময়ে AI-কে প্রতিযোগী নয়, বরং একটি শক্তিশালী সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পথ। সঠিক ব্যবহার, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং চিকিৎসকের দক্ষতার সমন্বয়ে AI ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য, নির্ভুল এবং রোগীকেন্দ্রিক করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
- ডা. মিউরিন হোসেন
- এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য)
- এমডি (চাইল্ড এ্যান্ড এডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রি)
- সাইকিয়াট্রিস্ট
- শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।


