মাদকাসক্তি ও প্যানিক ডিজঅর্ডার

0
9
শেয়ার করুন, সাথে থাকুন। সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে।

মাদকাসক্তি ও প্যানিক আট্যাক

মাদকাসক্তি ও প্যানিক আট্যাক দুটি ভিন্ন রোগ এবং একটির কারণে যে অন্যটি হবে এমনটি ভাববার অবকাশ নেই। তবে রোগের কোন কোন পর্যায়ে উপসর্গের কিছুটা মিল থাকার কারণে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এবং চিকিৎসার বিষয়ে চিকিৎসককে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। নিচের আলোচনার মাধ্যমে পৃথকভাবে দুটি বিষয় বুঝতে ও এর মধ্যে যোগসাজশ খুজে পেতে সুবিধা হবে।

আসক্তি ও মাদকাসক্তি:

জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার জন্য মানুষ যখন কোন কাজ করে, মস্তিষ্ক তখন সেই কাজে প্রেরণা যোগায় বা উৎসাহ যোগাতে সাহায্য করে ডোপামিন নামক এক প্রকার রাসায়নিক উপাদান ক্ষরণের মাধ্যমে। ফলে মানুষ আনন্দ ও লাভ করে। এই বিশেষ আনন্দের অনুভূতি ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয় এবং একসময় মানুষ নিজের সেই আকাঙ্ক্ষার উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ মানসিক বা শারীরিক এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়, যার ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতা জন্মানোর কারণে মানুষ সেই কাজটি বারবার করে। মানুষের এই আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতাই হলো আসক্তি।

সভ্যতার উন্নতিতে মারাত্মক ধরনের অন্তরায় হলো মাদকাসক্তি। মাদকাসক্তির ফলে সমাজ কলুষিত হয়, মানুষের কার্যকারিতা কমে যায়, যুবসমাজ অকর্মণ্য হয়ে পড়ে। বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য শরীরের ওপর প্রয়োগ করার ফলে মস্তিষ্ক দ্বারা ডোপামিন ক্ষরণের মাধ্যমে আনন্দের অনুভূতি লাভ করাই হলো মাদকাসক্তি। আর যেসব দ্রব্য শরীরে প্রয়োগ করলে অতি-প্রাকৃতিক আনন্দ বোধ হয় এবং আসক্তি জন্মায় সেগুলিকেই বলে মাদকদ্রব্য। মাদকদ্রব্য গ্রহণের কারণে শরীর ও মনের মধ্যে নেতিবাচক পরিবর্তনের ফলে ওই বিশেষ দ্রব্যটির ওপর নির্ভরশীলতার পাশাপাশি দ্রব্যটি গ্রহণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং এক সময় দ্রব্যটি গ্রহণের উপর তার নিজের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

মাদকের প্রকারভেদ:

প্রাচীনকাল হতেই পৃথিবব্যাপী বিভিন্নরকম ভেষজ উপাদান মাদক হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এগুলির মধ্যে গাঁজা, আফিম, তামাক, ভাং অন্যতম। তবে সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে মানুষ উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে তৈরি করেছে নতুন নতুন কৃত্তিম মাদকদ্রব্য। এর মধ্যে রয়েছে মদ, হেরোইন, মরফিন, কোডেইন, পেথিডিন, মেথাডোন, এল.এস.ডি, কোকেন, এমফিটামিন, ঘুমের ওষুধ ইত্যাদি। বাংলাদেশে যুব সমাজের মধ্যে গাঁজা, ইয়াবা (এমফিটামিন), এলকোহল, ফেনসিডিল ও হেরোইন সেবনের প্রবনতা বেশী।

মাদক শরীরে কিভাবে কাজ করে?   

মাদক গ্রহণের ফলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন জায়গায় অতিদ্রুত ডোপামিন নামে এক প্রকার নিউরোট্রান্সমিটার ক্ষরিত হয় এবং GABA নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যকারিতা বেড়ে যায়। ফলে মানুষ অতি প্রাকৃতিক আনন্দ লাভ করে। ধীরে ধীরে আনন্দের প্রতি আকাঙ্ক্ষা জন্মায় এবং সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই মানুষ পরবর্তীতে পুনরায় মাদক গ্রহণে উৎসাহিত হয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে মাদকে আসক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ডোপামিন তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে এবং GABA, মাদক ও রিসেপ্টরের মধ্যে একটি ভারসাম্য অবস্থা তৈরি হয়। ফলে পূর্বের ডোজে আগের মতো আর কাজ হয় না এবং ক্রমাগত মাদক নেওয়ার পরিমান বাড়তে থাকে, এটাকে বলে টলারেন্স। এই পর্যায়ে সে আর আনন্দ প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে নয় বরং মাদক না নিলে তার নানা রকম সমস্যা হয়, যেমন- ঘুম না হওয়া, মাংসপেশিতে টান ধরা, শরীর কাঁপা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, গা ঘাম ঝরা, বুক ধড়ফড় করা, বমি ভাব হওয়া, ডায়রিয়া হওয়া, নাক ও চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং শরীরের তাপমাত্রা অনিয়ন্ত্রিত হওয়া ইত্যাদি। এগুলোকে বলে উইথড্রল সিনড্রোম। পরবর্তীতে এই উইথড্রল সিনড্রোম হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং তার স্বাভাবিক জীবনকে সচল রাখার জন্য সে মাদক গ্রহণ  করে থাকে।

কারা মাদকাসক্তির শিকার হয়?  

মাদকাসক্তির কারণ বহুমুখী। অনেক সময় মাদকাসক্ত বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গের কারণে বহু অনাসক্ত ব্যক্তি মাদকের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে।

অজানা অনুভূতির প্রতি অদম্য উৎসাহ বা শুধুমাত্র কৌতূহল থেকে বহু যুবক-যুবতী মাদক গ্রহণে প্রবৃত্ত হয়।

পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ, প্রেমে ব্যর্থতা, পেশাগত জীবনে অশান্তি, কিংবা লোকসান থেকে মুক্তি পেতে অনেকে মাদক গ্রহণের প্রতি ঝুকে পড়ে।

সাফল্য প্রত্যাশী মানুষ কখনো ব্যর্থ হলে ব্যর্থতার গ্লানি হতে মুক্তির পাওয়ার জন্য এবং ব্যর্থতার কষ্ট ভুলে থাকার জন্য মাদকের আশ্রয় নেয় ।

ফুটপাত, বস্তি, স্টেশনে থাকা লোকজন ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী বেশী মাদক গ্রহণের ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তারা না বুঝে বা অনেক সময় মানসিক কষ্ট থেকে পরিত্রান পেতে মাদক সেবন করে।

যৌনতা মানুষের একটি মৌলিক চাহিদা। তরুণদের মধ্যে যৌনতা নিয়ে কৌতূহল বেশী থাকে এবং সঠিক বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান না থাকার ফলে অনেক সময় ভুল বিজ্ঞাপন বা অসাধু চক্রের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে মাদক গ্রহন করে।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অসাধু চক্র ক্রমাগত নিজেদের ব্যবসায়িক সমৃদ্ধি এবং আর্থিক লাভের জন্য বিভিন্ন কথা বলে মানুষকে মাদক নিতে উদ্বুদ্ধ করে।

মাদকের কুফলঃ

যেকোনো ধরনের মাদক শরীর তথা মনের উপর ক্ষণস্থায়ী এবং দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি করে। মাদক গ্রহণের মাধ্যমে ব্যক্তি সাময়িক আনন্দ লাভ করলেও ধীরে ধীরে যখন তা কারোর আসক্তি হয়ে দাঁড়ায় তখন তা শরীরে নানা ধরনের জটিল সমস্যার সৃষ্টি করে। যেমন- উচ্চরক্তচাপ, তন্দ্রাচ্ছন্নতা, মানসিক অপ্রকৃতিস্থতা, মেজাজ খিটখিটে, লিভার সিরোসিস, ফ্যাটি লিভার, ডায়াবেটিস, হার্ট আট্যাক, স্ট্রোক ইত্যাদি। দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবহারের ফলে মানুষের চোখ মুখেও আসক্তির স্পষ্ট ছাপ পড়ে।

প্রথম পর্যায়ে মাদক এতটাই আনন্দ অনুভুতি দেয় যে খাদ্য, যৌনতার মত স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় উপকরণগুলিও আসক্ত ব্যক্তির কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে। ফলে শরীরে অপুষ্টিজনিত রোগ বাসা বাঁধে, দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি হয়।

ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক নিলে ইনজেকশনের স্থানে ক্ষত, ইনফেকশন, রক্তবাহিত রোগ, যেমন হেপাটাইটিস, এইডস ও যৌন রোগ হতে পারে।

কখনো বেশি পরিমাণে মাদক গ্রহণ করার কারণে শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা এমন কি কারো মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

মাদক আসক্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ক স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপে ব্যর্থ হয় এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে তার চেতনা লুপ্ত হয় ও পারিপার্শ্বিক উপলব্ধির ক্ষমতার হ্রাস পায়।

মাদক গ্রহণের ফলে দৈনন্দিন কাজকর্মের প্রতি উদাসীনতা তৈরি হয়, ফলে লেখাপড়া, চাকরি, ব্যাবসা বাণিজ্যে ক্রমাগত নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। উদাসীনতার কারণে সন্তান-সন্ততির প্রতি খেয়াল কমে যায়, ফলশ্রুতিতে ছেলে-মেয়েরাও অনেক সময় খারাপ পথে পা বাড়ায়।

মাদক গ্রহণের ফলে ভালো বন্ধু-বান্ধব দূরে সরে যায় এবং ব্যক্তি ধীরে ধীরে মাদকাসক্ত সঙ্গী বেষ্টিত হয়ে পড়ে।

মাদকের খরচ যোগাতে আর্থিক দেওলিয়াত্ব তৈরি হয়। অনেক সময় আসক্ত ব্যক্তি মাদকের অর্থ জোগাড় করার জন্য চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অসাধু কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

কখনো বা অপরাধমুলক কাজ করতে গিয়ে মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ে। ফলে জেল হাজতবাস সহ বিভিন্ন আইনগত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

যে সন্তানকে নিয়ে এক সময় বাব-মা অনেক স্বপ্ন দেখত, সেই সন্তান ধীরে ধীরে দানবে পরিণত হয়, বাবা-মার স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়, পরিবারের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে সে পরিবারের বোঝায় পরিণত হয়।

মাদকাসক্তি থেকে প্রতিকারের উপায়ঃ

অন্যান্য রোগের মতো মাদকাসক্তিও একটি রোগ। সুতরাং বিজ্ঞানসম্মত ভাবে মাদকাসক্তির চিকিৎসা করলে সে সুস্থ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে রোগীকে শুধুমাত্র কয়েকটি ওষুধ দিলেই সে সুস্থ হবে না। তাকে একটি সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে।

মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে রোগী ও তার অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে। রোগীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে সে এর ছোবল থেকে মুক্ত হতে চায়।

পরিবারের সদস্যদের রোগীর প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। তাকে অবজ্ঞা না করে তাকে বেশী সময় দিতে হবে। তাহলে সে পরিবারের লোকজনের সাথে সময় কাটাতে আগ্রহী হবে। বরং পারিবারিক অসহযোগিতা, অবহেলা তাকে আরও মাদকের দিকে ধাবিত করবে।

কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে রোগীর মনোবল বাড়াতে হবে, মানসিক চাপ সামলানোর কৌশল শেখাতে হবে। সমস্যায় পড়লে খারাপ পথ পরিহার করে কিভাবে সুস্থ উপায়ে তা সমাধান করা যায়, সেই কৌশল রোগীকে শেখাতে হবে।

মাদকাসক্ত সঙ্গীদের সঙ্গ পরিত্যাগ করে সুস্থধারার বন্ধু-বান্ধবের সাথে সখ্যতা বাড়াতে হবে। নিজের ভালোলাগা কাজগুলো নিয়ে বেশী বেশী সময় কাটাতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললেও তা অনেক সময় মাদক থেকে মুক্ত হতে সহায়ক ভুমিকা পালন করে।

রোগীকে মানসিক শক্তি ধরে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাদক না নিলে যে উইথড্রল সিনড্রোম হয় তা সাময়িক সময়ের জন্য। দুই সপ্তাহ উইথড্রল সিনড্রোম বেশী থাকতে পারে, তবে ধীরে ধীরে তা এক মাসের মধ্যে কমে আসবে। এক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে কিছু ওষুধ খাওয়া যেতে পারে যা উইথড্রল সিনড্রোম কমাতে সাহায্য করবে।

মাদক ছেড়ে দেওয়ার পরও মাঝে মাঝে হঠাৎ করে মাদক নেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা মনে আসতে পারে, তা থাকে মন সরিয়ে নেয়ার কৌশল রোগীকে রপ্ত করতে হবে।

পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ভাবে রোগীকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাকে বিভিন্ন বৃত্তিমুলক কাজে প্রশিক্ষণ দিতে হবে যাতে করে সে সুস্থ হয়ে কাজ করার মাধ্যমে উপার্জনও করতে পারে আবার সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে পারে।

মাদকাসক্ত ব্যক্তির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে উঠলে তবেই সে সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসতে চাইবে। সে জন্য সমাজের সর্বস্তরে যোগব্যায়াম, জিমনাস্টিক, ধ্যানচর্চা ইত্যাদি শরীর গঠনমূলক কার্যক্রমের ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে।

মাদকাসক্তি ও প্রতিরোধঃ

সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। মাদক দ্রব্যের ক্ষতিকর দিকগুলি মানুষের কাছে আরো বেশি করে তুলে ধরতে হবে। পাড়ায় মহল্লায় স্কুলশিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, ইমাম, মুয়াজ্জিন সহ সবশ্রেণির লোকজনকে সম্পৃক্ত করে গ্রুপ আলোচনার মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

গঠনমূলক কর্মমুখী শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে। তরুণদের জন্য বেশী করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সুস্থ বিনোদনকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন প্রজন্মকে নেশার হাতছানি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে।

আধুনিক গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে এই সচেতনতামুলক অনুষ্ঠান বেশী বেশী প্রচার করতে হবে।

যেসব ওষুধ দ্বারা মানুষ নেশা করতে পারে, সেসব ওষুধ কোন রোগের জন্য প্রেসক্রিপশন করার ব্যাপারে চিকিৎসকদের আরও সচেতন হতে হবে।

মাদক যাতে অবাধে না পাওয়া যায় সে জন্য যত্রতত্র মাদকের অবাধ প্রাপ্তির ও ক্রয়বিক্রয় বন্ধ করতে হবে। মাদক ব্যবসা এবং মাদক চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে।

এল.এস.ডি বা কোকেনের মতো ভয়ঙ্কর মাদকদ্রব্য তৈরিতে বিজ্ঞানের ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।

মাদক নিরাময় কেন্দ্র বাড়াতে হবে এবং হটলাইন সেবা সহজলভ্য করতে হবে যাতে কেউ সমস্যায় পড়লে সে বা তার পরিবারের লোকজন সহজে হেল্প পেতে পারে।

প্যানিক অ্যাটাক কি?

অতিরিক্ত মানসিক চাপ থেকে অনেকেই মানসিক অবসাদে ভুগেন, হতাশ হয়ে পড়েন। মানসিক চাপের কারণে নানা রকম সমস্যার মধ্যে যেটি সবচেয়ে বেশি হয় তা হলো প্যানিক অ্যাটাক। প্যানিক অ্যাটাক হঠাৎ করেই শুরু হয়, রোগী প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়, তার মনে হতে পারে এই বুঝি হার্ট আট্যাক হচ্ছে বা এই  বুঝি সে মারা যাচ্ছে।  কোন কিছু দেখে বা বিশেষ কোন কারণে যে প্যানিক আট্যাক হবে ব্যাপারটি তা নয়। যদি কোন কারণ ছাড়াই প্যানিক আট্যাক বার বার হতে থাকে এবং একবার প্যানিক আট্যাক হওয়ার পর যদি ৪ সপ্তাহ বা তার বেশী সময় ধরে পুনরায় প্যানিক আট্যাক হওয়ার ভয় মনের মধ্যে চলতে থাকে এবং এর ফলে তার স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যহত হয় তাহলে তাকে প্যানিক আট্যাক না বলে প্যানিক ডিসঅর্ডার বলা হয়।

উপসর্গসমুহঃ

খুব দ্রুত হৃদস্পন্দন হওয়া, বুক ভারী হয়ে আসা

প্রচুর গা- ঘামা।

শরীর কাঁপতে থাকা। এই সময় নিজেকে অনেক দুর্বল বলে অনুভব হতে পারে।

শ্বাস-প্রশ্বাস ছোট হয়ে আসা। প্যানিক অ্যাটাক হলে শরীরে অক্সিজেন ঘাটতি দেখা যায়। তখন মানুষ দ্রুত শ্বাস নিতে থাকে কিন্তু মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা যায়।

গলায় কিছু আঁটকে গেছে মনে হওয়া

বুকে ব্যথা বা অস্বস্থি বোধ করা। এই অনুভুতিকে ওই সময়ে হার্ট অ্যাটাকের সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারে।

বমি বমি ভাব ও পেটে অস্বস্থি বোধ করা।

মাথা গুলিয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, হালকা অনুভূত হওয়া। মস্তিষ্ক অসামাঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করে।

শরীরে ঠাণ্ডা বা গরম অনুভূত হওয়া।

শরীরে ঝিনঝিন লাগা বা অবশ হয়ে আসা

নিজেকে ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অস্বাভাবিক লাগা

নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি বা পাগল হয়ে যাচ্ছি এমন অনুভূত হওয়া।

আসন্ন মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়া। মানুষের অবচেতন মনের গভীর ভয় গুলো এই সময় মানুষের মনে হান দেয় যা তার মধ্যে মৃত্যুভয় গ্রাস করে।

কোন আগাম বার্তা ছাড়া বা লক্ষণ প্রকাশ করা ছাড়াই হঠাৎ করে প্রচণ্ড ভয় এবং সেই সাথে উপরের উপসর্গের ৪ টি বা তার বেশী উপসর্গ থাকলে তা প্যানিক আট্যাক। প্যানিক অ্যাটাক ৫-১০ মিনিট স্থায়ী হয় কিন্তু এই অনুভুতিটা প্রায় ঘন্টা খানেক থাকতে পারে। পুরুষদের তুলনায় নারীদের ক্ষেত্রে এটি বেশ হয়ে থাকে।

প্যানিক আট্যাক কেন হয়?

বংশগত কারণে প্যানিক অ্যাটাক হতে পারে। যাদের প্যানিক ডিসঅর্ডার আছে অনুজদের মধ্যে এটি হওয়ার ঝুকি বেশী। কিছু কিছু জিন এর জন্য দায়ী।

সেরোটোনিন রিসেপ্টর, নর অ্যাড্রেনালিন ও GABA নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যকারিতার মধ্যে অসামজস্যতার কারনে প্যানিক অ্যাটাক হতে পারে।

স্নায়বিক কিছু কারনে অ্যামিগডালা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং অ্যামিগডাল হলো মস্তিষ্কের সেই অংশ যেটি আকস্মিক প্রতিক্রিয়া কিংবা ভয় এর প্রতিক্রিয়া দিয়ে থাকে। এই কারনে হৃদ স্পন্দন বৃদ্ধি পায় এবং এ সময় ব্যাক্তির মনে হয় যে তার হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে।

লার্নিং বিহেভিয়ার বা বড়দের মধ্যে প্যানিক আট্যাক থাকলে তা দেখতে দেখতে ছোটরা বড় হয় এবং এক পর্যায়ে নিজের অজান্তে তার মধ্যে এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

প্যানিক অ্যাটাক ও মাদকাসক্তির মধ্যে কি সম্পর্কঃ  

দীর্ঘদিন মাদক সেবন করা ব্যাক্তি হঠাৎ করে মাদক নেওয়া বন্ধ করলে বা শরীরে মাদকের উপস্থিতি কমে গেলে যে উইথড্রল সিনড্রোম হয় তা প্যানিক অ্যাটাকের মতো মনে হতে পারে। আবার হঠাৎ বেশী মাদক সেবন করার ফলে শরীরে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ার লক্ষন হিসাবেও প্যানিক অ্যাটাকের উপসর্গের মতো মনে হতে পারে। এক্ষেত্রে রোগী ও তার অভিভাবক হতে ভালোভাবে ইতিহাস জানতে হবে তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া যাবে। তাছাড়া প্রয়োজন অনুসারে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।

 প্যানিক অ্যাটাক হলে কী করবেন?

আসলে কী হচ্ছে সে ব্যাপারে ভালো মতন বুঝার চেষ্টা করতে হবে। মাথায় প্যানিক এর লক্ষণগুলো মাথায় রাখতে হবে এবং বুঝতে হবে আপনার আসলে কোনটি হয়েছে। চিন্তা করতে থাকলে ভয় কেটে যাবে আস্তে আস্তে।

আস্তে আস্তে শ্বাস প্রশ্বাস নিতে হবে। এরকম অ্যাটাকে শ্বাস নেয়া কষ্ট হয়ে পড়ে তাই আস্তে আস্তে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করতে হবে এবং শ্বাস প্রশ্বাসের দিকে গভীরভাবে মনোযোগ দিয়ে রাখতে হবে। মনে মনে ১ হতে ৪ পর্যন্ত গুনতে থাকুন প্রত্যেক শ্বাস নেয়ার সময়।

শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে বা শরীরের বিভিন্ন মাংসপেশীর ব্যায়ামের মাধ্যমে শিথিলিকরন পদ্ধতি শিখতে হবে।  অ্যাটাক হওয়ার পর এই শিথিলকরণ পদ্ধতি স্বাভাবিক হতে সাহায্য করবে।

ম্যাডিটেশন ও মাইন্ডফুলনেশ নিয়ে কাজ করতে পারেন। প্যানিক অ্যাটাক যাদের হয় তাদের মন একাগ্র রাখার জন্যে এই পদ্ধতি বেশ কার্যকরী।

প্যানিক অ্যাটাক হতে মুক্ত থাকার জন্য- দৈনিক পরিমিত পরিমানে ঘুমাতে হবে, উদ্দিপকগুলো ব্যাপারে সচেতন হতে হবে, রোজ ব্যায়াম করতে হবে, আনন্দের কিছু করার জন্য রোজ সময় বের করতে হবে, মেডিটেশন, ইয়োগা ইত্যাদির মাধ্যমে শিথিলায়ন চর্চা করতে হবে এবং সাহায্য পাওয়া যায় এমন ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে।

প্রয়োজনে অল্প পরিমানে বেঞ্জডায়াজিপাইন ও বিষণ্ণতানাশক কিছু ওষুধ সাময়িক সময়ের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। সাইকথেরাপির সাথে একত্রে ওষুধ প্রয়োগের ফলে অনেক ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

লিখেছেনঃ ডা. মো. আব্দুল মতিন

সহকারী অধ্যাপক, মানসিক রোগ বিভাগ।

রংপুর মেডিকেল কলেজ, রংপুর।

সূত্রঃ মনের খবর মাসিক ম্যাগাজিন, ৪র্থ বর্ষ, ১০ম সংখ্যায় প্রকাশিত।

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে 

“মনের খবর” ম্যাগাজিন পেতে কল করুন ০১৮ ৬৫ ৪৬ ৬৫ ৯৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here