মানসিক রোগ মানেই পাগল—এ ধারণা এখনও অনেকের মনেই রয়ে গেছে। অথচ এটি ঠিক ততটাই চিকিৎসাযোগ্য রোগ, যতটা ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপ। রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল-এর মানসিক রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মতিন মনে করেন, এই ভুল ধারণাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় বাধা।
‘ঝাড়ফুঁক নয়, সঠিক চিকিৎসাই রোগীর জীবন বদলে দিতে পারে’—এই বিশ্বাস নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে তিনি কাজ করছেন। সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তাঁর ব্যক্তিগত যাত্রা, চিকিৎসক জীবনের চ্যালেঞ্জ ও সাফল্য, আধুনিক থেরাপির সুযোগ-সুবিধা, সরকারি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং আগামী দিনের পরিকল্পনা। পাশাপাশি তিনি তরুণ চিকিৎসকদের প্রতি বার্তা দিয়েছেন—পেশায় দায়িত্বশীলতা, রোগীর প্রতি আন্তরিকতা আর মানবিকতাকেই হতে হবে প্রধান হাতিয়ার।
মনের খবর: কেমন আছেন আপনি?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
মনের খবর: পেশাগত বা ব্যক্তিগত পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক সময়টা আপনার কেমন যাচ্ছে?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: সাম্প্রতিক সময়টা বেশ চ্যালেঞ্জিং। বর্তমান পৃথিবী একটা অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রেই মানুষের মাঝে কেমন যেন অস্থিরতা বিরাজমান। পরমতসহিষ্ণুতা ও সহনশীলতা দিন দিন কমে যাচ্ছে মানুষের মন থেকে। আগের চেয়ে এখন মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। মানসিক রোগ চিকিৎসায় মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে দায়িত্বশীলতার সাথে আমরা কাজ করে যাচ্ছি এবং সামনের দিনগুলোতেও চেষ্টা করে যাব ইনশাল্লাহ।
মনের খবর: মানসিক রোগ চিকিৎসার প্রতি আপনার আগ্রহের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: এমবিবিএস পড়ার সময় বা পাশ করার পর প্রথমদিকে আমার মানসিক রোগ নিয়ে পড়ার কোন আগ্রহ বা পরিকল্পনা ছিল না। এমবিবিএস পাশ করার পর পরই পরিবারকে সাপোর্ট দেওয়াটা বেশ জরুরী হয়ে পড়ে। পোস্ট-গ্রাজুয়েশনের কথা যখন ভাবতে শুরু করলাম তখন অলরেডি সাত আট বছর পার হয়ে গেছে। আমার ব্যাচের অনেকেই তখন উচ্চতর ডিগ্রী কমপ্লিট করে ফেলেছে। মানুষের মাঝে যেভাবে মানসিক সমস্যা বাড়ছে, সে তুলনায় বাংলাদেশে মনোরোগ চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই নগন্য। ভাবলাম, সাইকিয়াট্রিতে পোস্ট-গ্রাজুয়েশন করা যায়। এরই মধ্যে আমার এক বোনকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের নিকট দেখাতে নিয়ে যায়। উনার চেম্বারে রোগীদের প্রচণ্ড ভিড় এবং নানারকম সমস্যা দেখে এই বিষয়ে পড়ার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। বাসায় এসে কাছের অনেকের সাথে আলোচনা করে ফাইনালি মনোরোগ নিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।
মনের খবর: পেশাগত জীবনে আপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি কোনটি বলে আপনি মনে করেন?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: পেশাগত জীবনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষকে মানসিক রোগ সম্পর্কে বিশ্বাস করানো। এদেশের বেশির ভাগ মানুষই মানসিক রোগ সম্পর্কে তেমন সচেতন নয়। মানসিক রোগ মানে জীন ভুতের আছর বা তাবিজ কবজের প্রভাব বলে তারা বিশ্বাস করে। তাদেরকে অনেক বেশি সময় ও ধৈর্য নিয়ে বুঝাতে হয়। আর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো মানুষের ভালোবাসা। সবাই যখন বলে, স্যার আপনার কাছে আসলে আপনার কথা শুনতে ভাল লাগে বা আপনি অনেক সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন, আপনি ভাল থাকবেন, তখন মনটা ভালো হয়ে যায়, কাজের প্রতি ভালোলাগা অনেকগুন বেড়ে যায়।
মনের খবর: রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগ বর্তমানে কি কি ধরনের সেবা ও চিকিৎসা পদ্ধতি দিচ্ছে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাচ্ছিলাম।
ডা. মো. আব্দুল মতিন: রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরবঙ্গের মানুষের চিকিৎসার জন্য একটি ভরসার নাম। রংপুর বিভাগের ৮টি জেলা ছাড়াও আশেপাশের অনেক জেলা থেকে এখানে রোগী আসে চিকিৎসা নিতে। বহির্বিভাগে আগত মানসিক রোগীদের জন্য বহির্বিভাগ চিকিৎসা সেবা চালু আছে। সরকারি ছুটির দিন ব্যতীত সপ্তাহে প্রতিদিন মানসিক বহির্বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চিকিৎসা প্রদান করেন। বেশি অসুস্থ্য, মারমুখী ও ওষুধ খেতে অনিচ্ছুক রোগীদের ইনডোরে ভর্তি করে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। প্রতিদিন অন্যান্য বিভাগ হতে আগত অনকলের রোগী দেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছাড়া রোগীদের নিয়মিত কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপী প্রদান করা হয়। মেডিকেল স্টুডেন্টদের বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় কাউন্সেলিং করার জন্য স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং কর্নার চালু আছে।
মনের খবর: আপনি কি মনে করেন, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে মানসিক রোগ বিষয়ে সচেতনতা বা মনোভাব গত পরিবর্তন এসেছে? নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কতটা বদলেছে?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: মানসিক রোগ নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে প্রচুর ভ্রান্ত ধারনা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, মানসিক রোগ মানেই পাগল বা এ ধরনের কিছু একটা। তাই তারা ডিপ্রেশন, এঞ্জাইটি, প্যানিক ডিসঅর্ডার, ওসিডি, সোমাটোফর্ম ডিসঅর্ডার, মাদকাসক্তি সহ নানারকম মানসিক রোগে ভুগলেও মনোরোগ বিশেষজ্ঞের নিকট যেতে চায় না। অনেকে মানসিক রোগকে যাদুটোনা বা জীন ভুতের আছর ভেবে কবিরাজি, ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজ প্রভৃতি অপচিকিৎসার পিছনে সময় নষ্ট করে রোগটিকে আরও জটিল করে ফেলে। মানসিক রোগ একবার হলে আর ভালো হয় না, মানসিক রোগের ওষুধ খাওয়া শুরু করলে আর বাদ দেওয়া যায় না বা ওষুধ শরীরের জন্য ক্ষতিকর, এমন ভ্রান্ত ধারনাও বিদ্যমান। এসব ভুল ধারনার কারণে অনেকে চিকিৎসা নিতে বা ওষুধ সেবন করতে চায় না। তবে আশার কথা হল, মানুষ আস্তে আস্তে সচেতন হচ্ছে। সাইকিয়াট্রিস্ট ও সাইকোলজিস্টরা বিভিন্ন ফোরামে সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রোগী ও তাদের স্বজনেরা সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন পেইজ থেকে মানসিক রোগ সম্পর্কে জানছে ও চিকিৎসার জন্য আসছে। আগামীতে মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আরও বদলাবে বলে আমি মনে করি।
মনের খবর: রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মনোরোগবিদ্যা বিভাগের আওতায় বর্তমানে কোন কোন ধরণের রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: রংপুর মেডিকেল কলেজে মানসিক রোগ বিভাগে সব ধরনের মানসিক রোগের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, ডিপ্রেশন, এঞ্জাইটি ডিসঅর্ডার, ওসিডি, ইন্সম্নিয়া, মনোযৌন রোগ, মাদকাসক্তি, শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা, অটিজম, এডিএইচডি সহ সকল প্রকার মানসিক রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রোগী ও অভিভাবকদের কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি দেওয়া হয়।
মনের খবর: আধুনিক কোন কোন থেরাপি বা চিকিৎসা পদ্ধতি বর্তমানে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগবিদ্যা বিভাগে চালু রয়েছে?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরা সাধারণত কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপি দিয়ে থাকেন। মনোরোগ বিভাগে সাইকোলজিস্টের ১টি পদ থাকলেও এখন পর্যন্ত সেটি শূন্য আছে। তারপরও আমরা রোগের ধরন অনুযায়ী কগ্নিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি, কাপল থেরাপি, ইন্টারপার্সোনাল সাইকোথেরাপি, একপোজার এন্ড রেসপন্স প্রিভেনশন থেরাপি, স্ট্রেস কপিং ট্রেনিং, এঙ্গার মেনেজমেন্ট, রিলাক্সেশন ট্রেনিং ও কাউন্সেলিং সেবা নিয়মিত দিয়ে থাকি। ইসিটি মেশিন না থাকায় এখানে ইসিটি দেওয়া হয় না।
মনের খবর: সরকারি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোতে আপনি সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা কোনটি বলে মনে করেন?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: সকল জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সহ কিছু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এখন পর্যন্ত কোন মনোরোগ চিকিৎসকের পদ নাই। দু-একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ব্যতীত অন্য কোথাও সাইকোলজিস্ট নাই। যেসব মেডিকেল কলেজে মানসিক চিকিৎসা সেবা চালু আছে, তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আলাদা ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত বেড নাই। মানসিক রোগী হঠাৎ করেই উগ্র আচরণ করতে পারে এবং নিজের বা অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করতে পারে। তাই আলাদা ব্যবস্থাপনা না থাকলে কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদানে বেশ সমস্যা হয়।

মনের খবর: সমাজে প্রচলিত মানসিক রোগ সংক্রান্ত ভুল ধারণা ও কুসংস্কার কীভাবে চিকিৎসা গ্রহণে বাধা তৈরি করছে বলে আপনি মনে করেন?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: ভুল ধারনা ও কুসংস্কার নানাভাবে মানসিক রোগ চিকিৎসায় বাঁধা তৈরি করে। ভুল ধারনার কারণে তারা প্রথমত- চিকিৎসা নিতে দেরি করে ফেলে। দ্বিতীয়ত- কবিরাজি, ঝাড়ফুঁক, পানিপড়া ইত্যাদি অপচিকিৎসার পিছনে ছুটে সময় নষ্ট করে ও রোগটি আরও জটিল করে ফেলে। তৃতীয়ত- সঠিক সময়ে রোগটি নির্ণয় ও চিকিৎসা হলে যত তাড়াতাড়ি আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা থাকে, তা অনেক বিলম্বিত হয়। চতুর্থত- বিলম্বে আসার ফলে রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ভার অনেক বেড়ে যায়। পঞ্চমত- ভ্রান্ত ধারনার কারণে রোগীরা ওষুধ খেতে অনীহা প্রকাশ করে ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসককে না জানিয়ে ওষুধ সেবন বন্ধ করে দেয়। ফলে রোগটি আবার বেড়ে যায়।
মনের খবর: আপনি ব্যক্তিগত ও পেশাগত ভাবে কীভাবে এই সামাজিক বাধাগুলো ভাঙতে কাজ করে যাচ্ছেন?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: মানসিক রোগ নিয়ে মানুষের ভ্রান্ত ধারনা ও সামাজিক কুসংস্কার দূর করতে আমরা ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক ভাবে কাজ করে যাচ্ছি। বহির্বিভাগে ও অন্তবিভাগে আগত সকল রোগী ও তাদের অভিভাবককে আমরা নিয়মিত কাউন্সেলিং করি এবং রোগ চিকিৎসায় কুসংস্কারের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করি। ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের নিয়ে বিভিন্ন দিবস গুলোতে সচেতনতামূলক সেমিনার ও র্যালী করা হয়। ব্যক্তি পর্যায়েও আমরা কুসংস্কার ও অপচিকিৎসা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করি। এছাড়া একাডেমিক সেশন গুলোতে মানসিক রোগ নিয়ে সেমিনার সিম্পোজিয়াম করে থাকি।
মনের খবর: মানসিক চিকিৎসা সেবায় জনবল, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে আপনি কোন কোন সমস্যার সম্মুখীন হন?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: মানসিক চিকিৎসা সেবায় জনবল, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। সেগুলো সমাধানের জন্য আমরা কর্তৃপক্ষের সাথে বারবার কথা বলেছি। এখানে একই ওয়ার্ডে মানসিক রোগীর সাথে অন্য বিভাগের রোগী থাকে। মানসিক রোগীর জন্য আলাদা ওয়ার্ড হলে সেবা কার্যক্রম আরও সহজ হবে। এছাড়া প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি ও শূন্য পদগুলোতে জনবল নিয়োগ দিলে সেবাগ্রহী জনসাধারণ আরও বেশি উপকৃত হবে।
মনের খবর: আপনি কী মনে করেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় রংপুর মেডিকেল কলেজ কীভাবে একটি রোল মডেল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় রংপুর মেডিকেল কলেজ অবশ্যই একটি রোল মডেল হতে পারে। সেজন্য আমাদের আরও বেশি দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করতে হবে এবং রোগীদের জন্য সেবাগ্রহণ আরও সহজ করতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও আলাদা ব্যবস্থাপনা করতে পারলে এটা বাস্তবায়ন সহজতর হবে। সর্বোপরি মানসিক রোগ নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার দূর করতে ও সতেচনতা বাড়াতে আমাদের আরও বেশি কাজ করতে হবে।
মনের খবর: বিভাগীয় প্রধান হিসেবে আপনার তত্ত্বাবধানে কী কী উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: এখানে ভর্তি রোগীদের জন্য বরাদ্ধকৃত বেড সংখ্যা খুব সীমিত। বেড সংখ্যা বাড়ানোর জন্য আমরা কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগিদ দিয়েছি। নির্মাণাধীন ভবনটি সম্পন্ন হলে আরও কিছু বেড দেওয়া হবে বলে আমরা আশ্বাস পেয়েছি। মানসিক বহির্বিভাগের রুমটি অব্যবহিত অবস্থায় ছিল। সেটি ব্যবহার উপযোগী করে বহির্বিভাগে আগত মানসিক রোগীদের প্রতিদিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। মেডিকেল স্টুডেন্টদের জন্য একটি কাউন্সেলিং কর্নার চালু করা হয়েছে। চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের নিয়মিত কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপী সেবা দেওয়া হচ্ছে। জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্য বিভাগ হতে পাঠানো অনকল রোগী নিয়মিত দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মনের খবর: ভবিষ্যতে মনোরোগবিদ্যা বিভাগের উন্নয়নের জন্য আপনার পরিকল্পনা বা লক্ষ্য কী?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: রোগ চিকিৎসায় সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন একটি পরিপূর্ণ মানসিক রোগ বিভাগ আমার চাওয়া, যেখানে সাধারণ জনগন সহজেই তাদের কাঙ্খিত সেবাটি নিতে পারবে। এছাড়া আগামিতে শিক্ষার্থীরা যেন এখান থেকেই পোস্ট গ্রাজুয়েশন করতে পারে এবং মানসিক রোগ নিয়ে গবেষণা করতে পারে সেভাবে বিভাগকে গড়ে তোলা।
মনের খবর: বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর করতে হলে সরকারের কোন কোন স্তরে নীতিগত পরিবর্তন বা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে আপনি মনে করেন?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর করতে হলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সাথে এটি সম্পৃক্ত করা উচিত। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত পদ সৃষ্টি করে তাতে জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করা উচিত। মানসিক রোগ চিকিৎসায় নিয়োজিত সবাইকে সরকারিভাবে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। মেডিকেল পাঠ্যসূচীতে এটিকে আরও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত। অবকাঠামো উন্নয়ন ও সর্বোপরি মানসিক স্বাস্থ্যে সরকারি বাজেট আরও বাড়ানো জরুরী।

মনের খবর: মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা এবং আগ্রহ বাড়াতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: মানসিক স্বাস্থ্য বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ্যতা সম্ভব নয়। জরিপমতে, দেশে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ কোন না কোন মানসিক সমস্যায় ভুগছে। ক্রমান্বয়ে এই সংখ্যা আরও বাড়ছে। মেডিকেল শিক্ষার্থীরা যদি এই বিষয় না পড়ে তাহলে জনসাধারণের একটা বড় অংশ তাদের সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। মেডিকেল কারিকুলামে মানসিক রোগকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রফেশনাল পরীক্ষায় মানসিক রোগের উপর আলাদা বোর্ড বাধ্যতামূলক করতে হবে। অনেকে কঠিন ভেবে এই সাবজেক্ট পড়তে ভয় পায়। আমাদের কাজ, তাদের ভয় দূর করা, পড়ার আগ্রহ তৈরি করা এবং এই বিষয়টি তাদের কাছে আরও সহজভাবে উপস্থাপন করা।
মনের খবর: মানসিক রোগ প্রতিরোধ এবং সচেতনতায় মিডিয়া, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: মানসিক রোগ নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ার যথেষ্ট ভুমিকা রয়েছে। সন্তান তার পিতামাতাকে অনুসরন করে, তাই পিতামাতাকে আগে সৎ ও আদর্শবান হতে হবে। সন্তানকে ভালো মানুষ হতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মাদক ও অন্যান্য আসক্তি থেকে তারা যেন দূরে থাকে সে ব্যাপারে সচেতন করবে এবং সমস্যায় পড়লে তা সমাধানের কৌশল শেখাবে। শিক্ষা কারিকুলামে নৈতিকতা বিষয়ে পাঠদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শরীরচর্চা, পরিমিত ঘুম, সুস্থ্য বিনোদন সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। কুসংস্কার, মাদকের ভয়াবহতা ও অপসংস্কৃতি সহ নানারকম মানসিক ও আচরণগত সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন রকম সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে মিডিয়া জনগণকে সচেতন করতে ব্যাপক ভুমিকা রাখতে পারে।
মনের খবর: একজন চিকিৎসক ও শিক্ষক হিসেবে নতুন প্রজন্মের মনোরোগ চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে আপনার কী বার্তা থাকবে?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: একটি পরিবারে একজন মানসিক রোগী থাকলে ওই পরিবারের সদস্যদের কষ্টের অন্ত থাকে না। নতুন প্রজন্মের মনোরোগ চিকিৎসকদের কাছে আমার চাওয়া হল- আপনারা সবাই স্ব-স্ব কর্মস্থলে নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবেন। চিকিৎসা নিতে এসে রোগীরা যেন কোন প্রকার অবহেলা বা ভোগান্তির শিকার না হয় সে ব্যাপারে আমরা যেন সচেষ্ট ও আন্তরিক থাকি।
মনের খবর: “মনের খবর” পত্রিকার পাঠকদের উদ্দেশ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে আপনি কিছু বলুন।
ডা. মো. আব্দুল মতিন: “মনের খবর” পত্রিকায় বিভিন্ন মানসিক সমস্যা নিয়ে দেশের প্রথিতযশা মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা লেখেন নিয়মিত। পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনারা নিয়মিত এই পত্রিকাটি পড়ে মানসিক সমস্যা ও তার প্রতিকার সম্পর্কে নিজে সচেতন হবেন এবং অন্যদেরকে এটি পড়তে ও সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করবেন।
মনের খবর: আপনি “মনের খবর”–এর কার্যক্রমকে মানসিক স্বাস্থ্য প্রচার ও সচেতনতায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন? কোনো পরামর্শ আছে কি?
ডা. মো. আব্দুল মতিন: “মনের খবর” এর দুটি ভার্সন রয়েছে- একটি পত্রিকা, অন্যটি অনলাইন পোর্টাল। পত্রিকা পড়ে যেমন দেশের অগণিত মানুষ মানসিক রোগ ও তা সমাধানের উপায় সম্বন্ধে জানতে পারছে, তেমনি অনলাইন পোর্টালে প্রচারিত বিভিন্ন টকশো ও সেমিনার দেখে তারা উপকৃত হচ্ছেন। পত্রিকা ও অনলাইনে একইসাথে অনেক বেশি মানুষকে অল্প সময়ে কোন বিষয়ে জানানো যায়। সুতরাং দেশের আপাময় জনসাধারণকে মানসিক রোগের ব্যাপারে সচেতন করার ক্ষেত্রে “মনের খবর” অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে বলে আমি মনে করি। পরামর্শ হল- আরও বেশি মানুষকে মনের খবরের সাথে সম্পৃক্ত করা এবং তাদের নিকট এটি সহজলভ্য করা।
“বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে আমরা ধারাবাহিকভাবে বিশেষ সাক্ষাৎকার নিচ্ছি। সেই ধারারই অংশ আজকের এই আলাপচারিতা।”
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও দেখুন-

