ভালো কাজ করলে মানুষ ভালোবাসবেই: সুফি মোস্তাফিজুর রহমান

0
47
সুফি মোস্তাফিজুর রহমান
শেয়ার করুন, সাথে থাকুন। সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে।

বটেশ্বরে যে হাজার বছরের ইতিহাস বেরিয়ে আসছে সে কার্যক্রমের মূল মানুষ বা নায়ক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ব বিভাগের অধ্যাপক এবং এদেশের একজন প্রধান প্রত্নতাত্বিক গবেষক। তাঁর মনের খবর নিয়েছেন মুতাসিম বিল্লাহ নাসির।

মনের খবর: কেমন আছেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: ভালো আছি।

মনের খবর: কেন ভালো আছেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: গবেষণার কাজ সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে পারছি, সেজন্য ভালো আছি।

মনের খবর: ভালো থাকাটা জরুরি?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: খুবই জরুরি। ভালো না থাকলে তো ভালো কাজ করা যাবে না। ভালো কাজ করার জন্য ভালো থাকবে হবে।

মনের খবর: এজন্য কোন কোন বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: ভালো থাকাটা কঠিন। কাজটাকে সামনে রেখেই ভালো থাকার চেষ্টা করি।

মনের খবর: সেজন্য প্রতিটা দিন জরুরি নাকি অন্য কোনো পরিকল্পনা করেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: পরিকল্পনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভালো পরিকল্পনা থাকলে ভালো থাকা যায়।

মনের খবর: মন খারাপ হয়?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: কখনো কখনো।

মনের খবর: তখন কি করেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: একটু ভাবি, কেন খারাপ হয়। তখন দেখি, অবশ্যই সবাই আমাকে ভালোবাসে না। আমার কাজকে সবাই ভালো চোখে দেখে না। সে কারণে তারা হয়তো ভালো থাকতে দেয় না। কিন্তু আমি মনে করি, বেশি মানুষ যদি আমার কাজকে গ্রহণ করেন, সেটাই আমার এবং সবার জন্য ভালো।

মনের খবর: মন ভালোখারাপ, দুঃখকষ্ট এগুলোকে কীভাবে দেখেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: অভিধানে যেহেতু শব্দগুলো আছে সেহেতু মানুষের জীবনে এগুলো কম-বেশি আসবেই। যে যেভাবে নেন, যে যেভাবে মোকাবেলা করেন, সেটাই দেখার বিষয়। এগুলোকে মানুষের জীবনের অংশ হিসেবেই দেখি।

মনের খবর: হিংসা আছে?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: হিংসা বলব না, তবে ঈর্ষা আছে। এক সময় ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। গরীব মানুষের বঞ্চনার ইতিহাস জেনেছি, সেখান থেকে তাদের মুক্ত করব সে স্বপ্ন দেখেছি। এখন তো সমাজতন্ত্র নেই, সে স্বপ্নও নেই, স্বপ্নের ছিটেফোঁটা আছে।

যে গবেষণা কাজ করি তাতে যেন সাধারণ মানুষ উপকৃত হতে পারে, একটা জ্ঞান সমৃদ্ধ সমাজ তৈরি হতে পারে; পরোক্ষভাবে হলেও গরীব মানুষরা যেন লাভবান হন এবং তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই ফেরাতে পারেন সে স্বপ্ন দেখি।

মনের খবর: কেন হয়?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: যখন দেখি অনেক না হলেও কিছু কিছু মানুষ অনেক বড় বড় কাজ করেছেন। কিন্তু আমার কাজের পরিধি এত ছোট যে তাদের ধারে-কাছেও যেতে পারছি না, তখন ঈর্ষা হয়।

মনের খবর: রাগ করেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: হ্যাঁ।

মনের খবর: কেন রেগে যান?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: যখন পরীক্ষায় ছেলে-মেয়েরা নকল করে, ব্যক্তি স্বার্থে রাজনীতিকে ব্যবহার করে, তখন খুব রাগ হয়।

মনের খবর: রাগ দমিয়ে রাখেন? না কারো ওপর ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: রাগের মাথায় অনেক সময় মুখের ওপর কিছু বলে ফেলি, ছেলে-মেয়েদের তো শাসন-ই করি।

মনের খবর: রাগ নিয়ন্ত্রণ দরকার?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: খুব দরকার। রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন।

মনের খবর: ভালোবাসার প্রবণতা কতটুকু?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: আমার ভেতরে এই প্রবণতা খুব বেশি।

মনের খবর: ভালোবাসার ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কী?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: ভালোবাসা খুব পবিত্র।

মনের খবর: আরেকবার ভালোবাসার সুযোগ দিলে কাকে ভালোবাসতেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: বাবা-মাকে।

মনের খবর: কখনো কি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়েছেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: একসময় খুব মানসিক চাপে ছিলাম।

মনের খবর: কখন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: উয়ারি-বটেশ্বরের কাজ নিয়ে যখন কোনো কোনো কলিগ অনৈতিকভাবে বিরোধীতা করেছেন।

মনের খবর: মানসিক স্বাস্থ্যকে কিভাবে দেখেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: মনের স্বাস্থ্য আসলে শরীরের স্বাস্থ্যের মতোই। শরীরের সুস্থতা যেমন মানসিক সুস্থতাও তেমন।

মনের খবর: স্বপ্ন দেখেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: স্বপ্ন তো দেখিই।

মনের খবর: কি ধরনের স্বপ্ন দেখেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: এক সময় ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। গরীব মানুষের বঞ্চনার ইতিহাস জেনেছি, সেখান থেকে তাদের মুক্ত করব, সে স্বপ্ন দেখেছি। এখন তো সমাজতন্ত্র নেই, সে স্বপ্নও নেই, স্বপ্নের ছিটেফোঁটা আছে। যে গবেষণা কাজ করি তাতে যেন সাধারণ মানুষ উপকৃত হতে পারে, একটা জ্ঞান সমৃদ্ধ সমাজ তৈরি হতে পারে; পরোক্ষভাবে হলেও গরীব মানুষরা যেন লাভবান হন এবং তারা নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই ফেরাতে পারেন সে স্বপ্ন দেখি।

মনের খবর: তাকে কতটুকু সফল করেছেন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: সফলতা-ব্যর্থতা মানুষই বিবেচনা করবে। কিন্তু জ্ঞানসমৃদ্ধ সোসাইটি যদি তৈরি করা যায়, তাহলে মানুষগুলো বঞ্চিতের কাতার থেকে তাদের দাবি অনেকটাই আদায় করতে পারবে।

মনের খবর: জীবনে স্বপ্ন দেখার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: জীবনে স্বপ্ন না থাকলে তো মানুষ বাঁচতেই পারবে না। যে যত বড় স্বপ্ন দেখবে সে সেভাবে এগিয়ে যাবে। ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট এপিজে আবদুল কালামের স্বপ্ন নিয়ে যে বক্তব্যটা দিয়েছেন ওটা খুবই পছন্দ করেছি। এ রকমই স্বপ্ন মানুষের দেখা উচিত।

মনের খবর: নিজে ভালো থাকার জন্য তো অনেক কিছু করি। কিন্তু অন্যরা যাতে ভালোবাসেন, তাদের যাতে ভালো লাগে সে ব্যাপারে সচেতন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: আমার বিশ্বাস, ভালো কাজ করলে মানুষ ভালোবাসবেই। সেজন্য ভালো কাজ করার চেষ্টা করি। কেউ যদি ভুল বোঝে বা অজ্ঞতার কারণে যদি ভুল করে থাকি, তখন কিছুটা খারাপ লাগে। ক্লিয়ার করার চেষ্টা করি সেটা ওভাবে না বুঝে এভাবে বুঝেছি। আমি দেখেছি, যারা কাজকে মুল্যায়ন করেন, তাঁরা আমাকে ভালোবাসেন।

কিন্তু যারা দুর্বিসন্ধি বা অন্যায় আবদার করে তাদের কাছে আমি ভালো না। এই জন্য একটা উদাহরণ দেই, উয়ারি-বটেশ্বর আমাদের কমপক্ষে ১০টি জাদুঘর হবে। উয়ারি গ্রামেই একাধিক জাদুঘর হবে। গিরীশচন্দ্র সেনের জাদুঘরটি হবে, কামরাবরে একটি অনসাইট জাদুঘর হবে। এ মুহুর্তে বটেশ্বর গ্রামে একটি বড় জাদুঘরের প্ল্যান-প্রোগ্রাম করছি। পাঠান বাড়িতে ১৯৭৪ থেকে যে জাদুঘর আছে, সেটাই বড় করব।

কিছু লোক দাবি করছে, জাদুঘরটি উয়ারিতে করতে হবে। উয়ারি তো প্রত্নস্থান, সেখানে আমরা জাদুঘর করতে পারি না। সেখানে একাধিক অনসাইট মিউজিয়াম করব। ফলে ওদের এ দাবি আমি পুরণ করতে পারব না। সেজন্য তারা যদি আমাকে ভালো না বাসে তাহলে এ মুহুর্তে কিছুই করার নেই। গবেষণার স্বার্থে আমাদের যেখানে যে স্থাপনা করা দরকার, সেটিই করব।

মনের খবর: নিজের কাছে মানুষ হিসেবে আপনি কেমন?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: পুরোপুরি সফল এ দাবি করব না। ভালো স্কুল পাইনি, ভালো কলেজ পাইনি। বিশ্ববিদ্যালয়েও যে পড়ালেখার খুব ভালো পরিবেশ পেয়েছি তাও নয়। পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে গেলে যে সুযোগ-সুবিধাগুলো ছোটবেলা থেকে এই অবধি পাওয়া দরকার সেটি যদি অপূর্ণ থাকে তাহলে তো পূর্ণাঙ্গ মানুষ দাবি করা যায় না।

বলতে পারেন, জোড়াতালি দিয়ে ভালো মানুষ, ভালো গবেষক হওয়ার চেষ্টা করছি। ভালো শিক্ষা পেলে, ভালো গবেষণার পরিবেশ পেলে আরো ভালো কাজ করা যেত। তাহলে নিজেকেও আরো ভালো মানুষ বলে দাবী করতাম।

যেহেতু সে সুযোগগুলো পাইনি, খুব ভালো কাজ করতে পারছি না, খুব ভালো গবেষণাও চলছে না। আমি জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করছি। কিন্তু সীমাবদ্ধতাও অনেক। সেগুলো অতিক্রম করে কিছু কাজ করতে চেষ্টা করছি। কিন্তু অনেক কাজ করার সময় বোধ হয় নেই। সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ।

মনের খবর: জীবনে মানসিক শক্তির প্রভাব কতটুকু?

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: জীবনে মানসিক শক্তি খুব দরকার। নিজের জীবন অভিজ্ঞতা থেকে বলি, একসময় উয়ারি-বটেশ্বরে কাজ করতে করতে প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হলাম। কাজ ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থা হলো। খুব আক্রমণ হচ্ছিল-ব্যক্তিগত আক্রমণ, গবেষণা বিষয়ে নয়। তারা ব্যক্তিকে আক্রমণ করে কাজটি বন্ধ করতে চেয়েছিল। এ সময় আমার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কিছুটা হলেও চাপ পড়ছিল।

আমার স্ত্রী যেহেতু মনোবিজ্ঞানী তিনি তখন খুবই সাহায্য করেছেন। তাঁর নাম ড. আফরোজা হোসেন। আমি তাঁর একটি উপদেশ মানি। কাউন্সেলিং সাইকোলোজির ভাষায় তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় নানা ধরনের রাজনীতি আছে এটি অস্বীকার করা যাবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যে আর পাঁচটি ঘটনা ঘটে, সেগুলো যেন ময়লার বাক্সে ফেলে দিয়ে বাসায় আসি এবং নতুন জীবন শুরু করি। যেন সেদিনের জন্য হলেও দুঃখজনক ঘটনাগুলো ভুলে যাই। সে কথাটি অনুসরণ করেছি এবং তাতে সফলতাও পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সারাদিনের জঞ্জাল বা দুঃখগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে রেখে দিয়ে পাঁচটার গাড়িতে যখন উঠি সব ভুলে যাই। একটি ফ্রেশ ঘুম দিয়ে ঢাকা চলে যাই।

মনের খবর: মনের খবরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: মনের খবরকেও ধন্যবাদ।

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে

more

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here