বাবা ভুগছেন সিফিলিস রোগে, মা যক্ষ্মা রোগী, এ পর্যন্ত তাঁদের চারটি ছেলেমেয়ে হয়েছে। প্রথমটি অন্ধ, দ্বিতীয়টি মৃত, তৃতীয়টি কানে শোনে না এবং চতুর্থটি যক্ষ্মা রোগী। এমন এক দম্পতির পঞ্চম সন্তানটি কেমন হবে বলে আপনি ধারণা করেন? বোবা? বিকলাঙ্গ? যদি এমন কোনো ধারণা করে থাকেন তবে আপনার সেই ধারণাটা ভুল। কারণ সৌভাগ্যক্রমে এই দম্পতির পঞ্চম সন্তান হয়েছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি ছিলেন সংগীতের জগতে ক্ল্যাসিক্যাল এবং রোমান্টিক
স্টাইলের মাঝে মেলবন্ধন সৃষ্টিকারী, বিখ্যাত সুরকার। বলছিলাম লুডউইগ ভন বিটোফেনের কথা-জার্মানির যে বিশ্বখ্যাত মিউজিক কম্পোজার মৃত্যুর পরেও আমাদেরকে বিমোহিত করে রেখেছেন তাঁর নাইনথ সিম্ফনি জাদু দিয়ে।
২০১৬ সালে পৃথিবীর সেরা সুরকারদের কম্পোজিশনগুলো নিয়ে জরিপ চালায় বিবিসি মিউজিক ম্যাগাজিন। এতে সর্বকালের সেরা সিম্ফনি হিসেবে নির্বাচিত হয় বিটোফেনের ইরোয়কা। এ তালিকায় আরো রয়েছে বিটোফেনেরই নবম সিম্ফনি কোরাল। এখানেই শেষ নয়, সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এ সুরকারের পঞ্চম সিম্ফনিটি রয়েছে বিবিসির তালিকার ১১ নম্বরে। নিশ্চয়ই ভাবছেন মনস্তত্ত্বভিত্তিক নিয়মিত এই ফিচারে আমাদের আজকের চরিত্র বিটোফেন কেন? কারণ এই থেকে ১৮০২ সালে তার দুই ভাই জোহান এবং কার্লের কাছে একটি চিঠি লেখেন, যা ১৮২৭ সালে বিটোফেনের মৃত্যুর পর তাঁর ডেস্কেই পাওয়া যায়।
তার মানে চিঠিটা কখনোই পোস্ট করা হয়নি। ওই চিঠিতে বিটোফেনের তখনকার মানসিক দুরাবস্থার একটি চিত্র পাওয়া যায়।
চিঠির প্রতিটি পরতে পরতে কানের সমস্যার জন্য তাঁর আত্যহত্যা করার সুতীব্র বাসনা প্রকাশিত, শেষে তাঁর দুই ভাইকে অনুরোধ করেন তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর এই শারীরিক সমস্যার কারণ খতিয়ে দেখতে। জনশ্রুতি আছে, একদিন বিটোফেন তাঁর সুরকার সহকর্মী ফার্দিনান্দ রাইসের সাথে বসে ছিলেন। এমন সময় তাঁরা একজন মেষপালককে বাঁশি বাজাতে দেখনে। তাঁরা দুজনেই এটি দেখতে পান কিন্তু শুধু রাইস এর সুর শুনতে। পান। তখন বিটোফেন প্রথমবারের মতো তাঁর বধিরতাকে উপলব্ধি করতে পারেন। এই ঘটনা তাঁকে সারাজীবনের মতো বদলে দেয়। অবশ্য এটাও বলা হয়, বিটোফেনের বধিরতার কারণ ছিল প্যাজেট ডিজিজ। যদিও বিটোফেন ধীরে এবং নিশ্চিতভাবে বধির হয়ে যেতে থাকেন কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। তিনি জানতেন জীবনে তিনি শুধু সংগীত সম্পর্কিত কাজই তিনি করতে পারবেন এবং সেটা তিনি কোনোভাবেই বাদ দেবেন না।
ফলে তিনি গান লেখা অব্যাহত রাখেন। তাঁর বধিরতার প্রথম দিকে নিচু নোট ব্যবহার করতে শুরু করেন কারণ উঁচু নোট তিনি ভালোমত শুনতে পেতেন না। কিন্তু পুরোপুরি বধির হয়ে যাওয়ার পর শেষে তাঁকে শুধু তাঁর মনের ভেতর থাকা শব্দের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। আমরা বরং আরেকবার বিটোফেনের অতীতের দিকে ফিরে যাই। বিটোফেনের ছোটবেলা অন্য দশজন মানুষের মতো কাটেনি। বলা হয়ে থাকে, বিটোফেনের বাবা ছিলেন মদ্যপ। এমনো হতো বিটোফেনের বাবা মদ পান করে এসে বিটোফেনকে মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠিয়ে পিয়ানো প্র্যাক্টিস করতে বসাতেন। যাকে পরবর্তী জীবনে বিটোফেন গভীর রাতের ভয়ানক স্বপ্নের সঙ্গে তুলনা করেছেন। টানা অনেকগুলো বছর ঠিক এমন মানসিক অত্যাচার চলেছিল তাঁর ওপর।
তবে বিটোফেনের তরুণ অবস্থায় বিষণ্ণতার সূত্রপাত হওয়ার ক্ষেত্রে ছোটবেলার এই অভিজ্ঞতার কোনো ভূমিকা ছিল কিনা সেটা জানা যায়নি। কিন্তু এই বিষণ্ণতা থেকে হাই লেভেল অব ম্যানিয়ার প্রকাশ যে তাঁর আচরণের ঘটেছিল সেটা বিভিন্ন গবেষক ও তাঁর বন্ধুদের বর্ণনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, যা আমাদের ধারণা দেয় তাঁর বাইপোলার ডিজঅর্ডারের (Bipolar disorder) মতো রোগের। কিন্তু যেখানে এমন রোগের কোনো পারিবারিক ইতিহাস নেই, সেখানে বাইপোলারের কারণ কী হতে পারে? এটা জানতে হলে আমাদের কোমরবিড বাই পোলার ডিজঅর্ডার সম্পর্কে জানতে হবে। কোমরবিড বাইপোলার ডিজঅর্ডার হচ্ছে এমন একটা অবস্থান, যেখানে অন্য কোনো ডিজঅর্ডারের কারণে বাইপোলার ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
অন্য ডিজঅর্ডার বলতে আমরা এখানে মদ্যপানকে ধরতে পারি। হ্যাঁ নিজের বাবার মতো বিটোফেনও ছিলেন মদ্যপায়ী। এর প্রমাণ ১৮২৭ সালে বিটোফেনের মৃত্যুর পর তাঁর লাশের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে বোঝা যায়, যেখানে তাঁর লিভারে সিরোসিস রোগের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল।
যারা বিটোফেন শুনেছেন তাঁদের অনেকেই বলেন, তাঁর সংগীত একেবারে হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তার কারণ হতে পারে এই, যে তিনি নিজের হৃৎস্পন্দনের সঙ্গে মিলিয়ে সংগীত রচনা করতেন। যা আগেও উল্লেখ করেছি। এটা সত্য যে, বিটোফেনের সবচেয়ে বিখ্যাত কিছু সংগীতের মাঝে দেখা যায় বিরল ছন্দ। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান এবং ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের এক গবেষণায় দাবি করা হয়, সম্ভবত বিটোফেনের অ্যারিদমিয়া নামের এক হৃদরোগের সঙ্গে এই ছন্দের যোগ আছে। গবেষকদের মাঝে ছিলেন একজন কারডিওলজিস্ট, একজন মেডিক্যাল হিস্টোরিয়ান এবং একজন মিউজিকোলজিস্ট। তাঁরা ধারণা করেন এই কম্পোজারের এই রোগটি থাকতে পারে এবং এর প্রকাশ ঘটতে পারে তাঁর সংগীতের মধ্য দিয়ে।
তারা বিটোফেনের কিছু কম্পোজিশনের ছন্দ বিশ্লেষণ করেন এবং আসলেই দেখা যায়, কারডিয়াক অ্যারিদমিয়ার ছন্দের সঙ্গে এদের মিল রয়েছে। হৃদরোগের ফলে যখন হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে পড়ে, তখন তাতে কিছু নির্দিষ্ট ছন্দ দেখা যায়। গবেষকেরা এমনই কিছু ছন্দ খুঁজে পান বিটোফেনের সংগীতে। কারডিয়াক অ্যারিদমিয়ার ফলে হৃৎস্পন্দন বেশি ধীর, বেশি দ্রুত অথবা অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এমনই ছন্দ দেখা যায় বিটোফেনের কাভাটিনা’র শেষের দিকে, পিয়ানো সোনাটা এ-ফ্ল্যাট মেজর, ওপাস ১১০ এসব সংগীতে অনিয়মিত ছন্দ দেখা যায়।
আমরা অবশ্য এসব অনিয়মিত ছন্দের পেছনে বিটোফেনের মুড ডিজঅর্ডারকে এগিয়ে রাখব। আর বিটোফেনের বাইপোলার ডিজঅর্ডারের পেছনে কারণ যাই থাকুক না কেন, তাঁর মনোজগতের অনিয়মিত ছন্দগুলোই সুর হয়ে তাঁকে নিজের সৃষ্টিগুলোতে অমর করেছে। বিটোফেনের শিক্ষক ও একই সময়ের সুরকার জোসেফ হায়ডিন এই সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন,
You will accomplish more than has ever been accomplished, have thoughts that no other has had. You will never sacrifice a beautiful idea to a tyrannical rule, and in that you will be right. But you will sacrifice your rules to your moods, for you seem to me to be a man of many heads and hearts. One will always find something irregular in your compositions, things of beauty, but rather dark and strange.

ডা. ফাহিম আহসান আল রশিদ
ইন্টার্ন চিকিৎসক, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ, বগুড়া
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও দেখুন-


