বর্তমানের এই গতিশীল যুগে মানুষ হিসেবে আমরা কেমন যেন অধৈর্য হয়ে উঠছি। আবেগ কিংবা অনুভূতিগুলো উপলব্ধি করার আগেই রিএক্ট করা বা রেগে যাওয়া যেন আমাদের সমাজে এখন চিরায়ত দৃশ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। এই আমরাই বোধহয় শিশুদেরকে নিজেদের অজান্তেই শিখিয়ে দিচ্ছি, অপেক্ষা মানে অকারণে দেরি। বোতাম চাপলেই ফল, চাইলেই সাথে সাথেই পাওয়া—এই অভ্যাস তাদের মনোজগতে এমনভাবে ঢুকে যাচ্ছে যে সামান্য বাধাতেই তারা অস্থির হয়ে পড়ে। অথচ মানুষ হওয়ার সবচেয়ে গভীর শিক্ষাগুলোর একটি হলো ধৈর্য। নিজেকে থামিয়ে রাখা, আবেগকে সামলে রাখা, সময়কে সঙ্গী করে এগিয়ে যাওয়া জীবনেরই অংশ।
ধৈর্য মানে নিছক চুপ করে থাকা নয়; ধৈর্য মানে নিজের ভেতরের ঝড়কে শান্ত রাখা। একটি বীজ যেমন রাতারাতি গাছ হয় না, তেমনি শিশুর চরিত্রও তাৎক্ষণিকভাবে পরিণত হয় না। সময়, অনুশীলন, আর সচেতন অভিভাবকত্ব—এই তিনে শিশুর ধৈর্যের ভিত তৈরি হয়।
আরও পড়ুন…
শিশুরা স্বভাবতই কৌতূহলী, চঞ্চল, আর তৎক্ষণাৎ ফলপ্রত্যাশী। এখানে অভিভাবকের ছোটো ছোটো সিদ্ধান্ত হতে পারে তাদের জন্য বড়ো শিক্ষা । প্রতিটি চাওয়াই যদি সাথে সাথে পূরণ হয়, তবে শিশু শেখে, “অপেক্ষা অপ্রয়োজনীয়।”
কিন্তু যখন ভালোবাসা দিয়ে বলা হয়, “এখন নয়, একটু পরে”, তখন সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে।
শিশুরা কথার চেয়ে আচরণ থেকে বেশি শেখে। আর তাদের জন্য মডেল আসলে বাবা-মা কিংবা প্রাইমারি কেয়ার গিভার (বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে নানা-নানী কিংবা দাদা-দাদি)। ট্রাফিক জ্যামে বিরক্ত হয়ে আমরাই যদি হর্ন বাজাই, লাইনে দাঁড়িয়ে রাগ দেখাই, তবে শিশুরা সেটিই অনুকরণ করবে। আবার যদি তারা দেখে আমরা শান্ত থাকি, পরিস্থিতিকে মেনে নেই, তবে তারাও অপেক্ষাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে শিখবে।

একটি ছোটো উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। চাইল্ডস ক্লিনিকে প্রায়ই এমন শিশু আসে, যে সামান্য না-পাওয়া সহ্য করতে পারে না। যেমন, সাত বছরের একটি ছেলে এসেছিল—ধরা যাক তার নাম রিয়াদ। খেলনা না কিনে দেওয়ায় সে দোকানের মেঝেতে শুয়ে চিৎকার করতো, বাসায় জিনিস ছুঁড়ে মারতো, মাকে ধাক্কা দিত। স্কুলেও একই আচরণ করতো। অভিভাবকরা শিশুর এমন আচরণে ক্লান্ত, লজ্জিত ও অসহায়। দিনকে দিন তার আচরণ আর শুধুমাত্র কান্নাকাটিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। শুরু হলো মা-বাবার গায়ে হাত তোলা, জিনিস পত্র ছুঁড়ে মারা, মেহমানদের সামনে গিয়ে ডিমান্ড করে বিব্রত করা।
আলাপচারিতায় বোঝা গেল, রিয়াদের প্রায় সব চাওয়াই দ্রুত পূরণ করা হতো একদম ছোটো থেকেই। প্রথম প্রথম ছোটো বাচ্চার আবদার, কিউট কিউট চাওয়া, পরে সেটিই হয়ে গেলো কান্না থামানোর কৌশল, এরপর থেকে ঝামেলা এড়ানোর নিরুপায় পথ। সে কখনোই ‘অপেক্ষা’ করেনি কিংবা আরও ভালোভাবে বলা যায় ‘অপেক্ষা’ শেখেনি। যখন অভিভাবকদের শেখানো হলো—চাহিদা নয়, আচরণকে রেসপন্স করতে; কান্নায় নয়, শান্ত আচরণে সাড়া দিতে; আর নির্দিষ্ট নিয়মে ‘অপেক্ষা’ অনুশীলন করাতে—কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দৃশ্য বদলাতে শুরু করল। রিয়াদ বুঝতে শিখল, কান্না নয়, ধৈর্যই কাজে দেয়।
আরেকটি ছোটো উদাহরণ দেই। চার বছরের একটি মেয়ে, ধরা যাক নাম মিহি—খাবার টেবিলে বসে মোবাইল ছাড়া খেত না। মোবাইল না দিলে চিৎকার, কান্না, খাবার ছুঁড়ে ফেলা ইত্যাদি আচরণ করতো। মা বাধ্য হয়েই মোবাইল দিতেন। কারণ, “খেয়ে নিলেই হলো”।
এখানে সমস্যা খাবার নয়; সমস্যা ছিল তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির অভ্যাস। মিহির বাবা নিজেই একজন চিকিৎসক। তিনি মোবাইল ফোন এডিকশন বিষয়টা কাটানোর জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেন। আমাদের কাছে নিয়ে আসেন মেয়েকে। ধীরে ধীরে নিয়ম করা হলো—মোবাইল ছাড়াই ৫ মিনিট খাবার টেবিলে বসবে। তারপর ১০ মিনিট, তারপর পুরো সময়। মাঝখানে হবে গল্প, কথা আর প্রশংসা। কয়েক সপ্তাহ পর মিহি নিজেই টেবিলে বসে গল্প করতে করতে খেতে শুরু করল। কারণ সে শিখল—অপেক্ষা মানেই শাস্তি নয়, বরং একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। খেয়াল করবেন এখানে শিশুর আচরণ যতটা না সমস্যা তার চেয়ে বড়ো সমস্যা হলো বাবা-মা হিসেবে সন্তানের সামনে রোল মডেল হয়ে উঠতে না পারা। সেক্ষেত্রে নিজেদের ধৈর্য বাড়ানোর বিকল্প নেই।
শিশুদের ধৈর্য শেখানোর সহজ উপায়
পাজল, আঁকাআঁকি বা ব্লক দিয়ে গড়া অর্থাৎ যে কাজগুলোতে সময় লাগে সেগুলো করানো। আরেকটা সুন্দর উপায় হতে পারে শিশুদের গাছ লাগানো ও প্রতিদিন গাছে পানি দেওয়া শিখানো। গাছ বড়ো হতে, ফুল আসতে যে সময়টা লাগবে সেটা তাদের ধৈর্য বৃদ্ধি করতে কিংবা ভালো ফল পেতে অপেক্ষা করা শিখাবে। এটা অবশ্য বড়োদের জন্যেও প্রযোজ্য।
কোথাও গেলে লাইনে দাঁড়ানোকে ‘খেলা’ বানানো যেতে পারে।
শিশুকে ছোটো ছোটো দায়িত্ব দেওয়া, যেমন- নিজের খেলনা গুছানো, ব্যাগ প্রস্তুত করা—এসব কাজও ধৈর্য শেখায়। কারণ দায়িত্ব মানে সময় নিয়ে কাজ করা।
সবচেয়ে বড়ো কথা হলো ধৈর্যের শিক্ষা কোনো বক্তৃতা দিয়ে হয় না; হয় প্রতিদিনের ছোটো ছোটো অভ্যাসে। “তুমি পারবে, আবার চেষ্টা করো”—এই বাক্যগুলোই শিশুর মনে ধৈর্যের বীজ বপন করে। শিশুর অধৈর্যে নিজেরা অস্থির হওয়া যাবে না। তাদের অনুভূতিকে স্বীকৃতি দিতে হবে। কোমল গলায় তাদের কষ্টটা যে আপনি বুঝতে পারছেন সেটা তাদের জানাতে হবে। তবেই তারা অনুভূতিকে রেগুলেট করা শিখবে৷
আজকের শিশু যদি অপেক্ষা করতে শেখে, তবে সে ব্যর্থতা সামলাতে পারবে, সম্পর্ক ধরে রাখতে পারবে, শেখার দীর্ঘ পথে টিকে থাকতে পারবে। ধৈর্য কোনো দুর্বলতা নয়; ধৈর্য হলো ভেতরের শক্তি। আর এই শক্তির বীজ বপনের সেরা সময়—শৈশব।
- ডা. ফাতেমা জামান সুরভী
- আই.এম.ও, ডিপার্টমেন্ট অব সাইকিয়াট্রি,
- চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।


