সাদা-কালো যুগ পার হয়ে গিয়েছে সেই কবে! সময় সেইসব চলচ্চিত্র বা তাদের চরিত্রদের অনেককে হয়ত ভুলেই গিয়েছে। আমাদের মানসপটেও নেই তাদের সবার স্মৃতি। কিন্তু সবার ক্ষেত্রে এমনটা নয়। স্যার চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন এমন একজন অভিনেতা। নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের এই মহানায়ক ছিলেন তৎকালীন পৃথিবীর রুপালি পর্দার আইকন। শরীরের মাপের তুলনায় চাপা কোট, ছোট্ট হ্যাট অন্যদিকে মাপের চেয়ে বড়ো ঝোলা প্যান্ট, বিঘত লম্বা জুতো আর হাতে একটা লাঠি, ঠোঁটের ওপরে একচিলতে বাটারফ্লাই গোঁফ। কে না চেনে এই ভবঘুরে কমেডিয়ানকে!
তিনি যে চার্লি চ্যাপলিন! একশতাব্দী ধরে তাকে মনে রেখেছে সবাই। ১৬ এপ্রিল, ১৮৮৯ সালে লন্ডনে জন্যগ্রহণ করেন চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই ব্যক্তি। ভিক্টোরিয়ান যুগ থেকে শুরু করে তার এই যাত্রা ছিল আধুনিক কাল পর্যন্ত; এক বিস্তৃত ক্যানভাসের জীবন। মা হান্নাহ চ্যাপলিন আর বাবা চার্লস সিনিয়র দুজনেই মিউজিক হলের আপ্যায়নকারীর কাজ করতেন। তাঁর মা ছিলেন প্রচণ্ড উচ্চাকাঙ্ক্ষী! সংসার ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
চ্যাপলিনের ছোটোবেলা কেটেছে চরম অভাব-অনটনের মধ্যে। সারাদিন লন্ডনের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন, কখনো সামান্য খাবার জুটত আবার কখনো অনাহার। চ্যাপলিন যখন চলচ্চিত্রতে সেই বিখ্যাত ভবঘুরের চরিত্র নির্মাণ করতেন, সেটা আসলে তাঁর শৈশবেরই বিনির্মাণ। শৈশবে পথে ঘুরে ঘুরে দেখা ধনীদের সৃষ্ট বৈষম্য চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলেছিলেন প্রকটভাবে।
মা হান্নাহ ১৮৯৮ সালে সাইকোসিসে আক্রান্ত হয়ে মানসিক নিরাময় কেন্দ্রে চলে যান, সম্ভবত নিউরোসিফিলিসের কারণে। চ্যাপলিন আর তাঁর ভাইয়ের আশ্রয় হয় তাঁদের বাবার কাছে। বাবা চার্লস ছিলেন অ্যালকোহলে আসক্ত। প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতা দেখাতেন তাঁর সন্তানদের প্রতি, যদিও বেশিদিন বাঁচেননি। দুই বছর পর বাবা লিভার সিরোসিসে মারা গেলে আবার পৃথিবীর পথে নামতে হয়েছিল তাকে। তারপর থিয়েটারে যোগ দিয়ে একসময় ভাগ্যের চড়কিতে চড়ে পৌছেছিলেন হলিউডে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, অতিবাহিত কষ্টপীড়িত শৈশবের মধ্যে।
তাঁর চলচ্চিত্রে মূলত একজন ক্লাউন বা জোকার কীভাবে এমন কিছু চলচ্চিত্র সৃষ্টি করে গেলেন যা অনায়াসে দেশ, জাতি, ধর্মের গণ্ডি অতিক্রম করতে পেরেছিল; কীভাবেই-বা সেসব আজো দর্শকের মনে বেঁচে আছে! আসলে এর মূলসূত্র লুকিয়ে আছে লন্ডনে তিনি তার শৈশবেরই পুনর্নিমাণ করেছিলেন। যাকে আমরা ঝোলা প্যান্ট পরা জোকার হিসেবে দেখি, তিনি স্বয়ং চ্যাপলিনের আতাপ্রতিকৃতি। ছোটোবেলায় ঘুমানোর জায়গা ছিল না, না খেতে পেরে ফুটপাথেই ঘুমিয়ে পড়তেন। ধনিক
শ্রেণির প্রাচুর্য ও অনাচারকে ব্যঙ্গ করেছেন সারাজীবনের আদর্শে এবং সৃষ্টিতে। ফিলোর রিলে আপাতভাবে যা আমাদের কাছে মজার মনে হয় তা আসলে বিদগ্ধ স্যাটায়ার।
সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো মানুষ যিনি চলচ্চিত্রের খুব বেশি একটা ভক্ত ছিলেন না, তিনিও চার্লি চ্যাপলিনের চলচ্চিত্র দেখে তাঁকে প্রশংসিত করেছিলেন-‘ A Great Genius’ বলে। ফ্রয়েড মনে করতেন, সকল শিল্পীর সৃষ্টি তাঁদের শৈশবের স্মৃতি থেকে অণুপ্রাণিত এবং চ্যাপলিনও তার ব্যতিক্রম নন। অধিকাংশ চলচ্চিত্রই তৈরি হয়েছিল হলিউডে, কিন্তু সেটগুলোর সঙ্গে চ্যাপলিনের জন্যস্থান সাউথ লন্ডনের অবিশ্বাস্য মিল ছিল!
নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে তাঁর শরীরের ভাষা মুখের ভাষাকে অতিক্রম করেছিল। চোখের সামনে রূপান্তর ঘটত, মনে হতো যেন শরীরের ভাষা পাখা মেলে উড়ে আসছে দর্শকের কাছে। হয়ত অনেক ক্ষেত্রেই তার পরাজয় হতো, কিন্তু দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলত এই জোকারের কমেডি। ‘আমি হেরে যেতে পারি কিন্তু তোমরা আমার অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে পারবে না’-সম্ভবত এটাই ছিল তাঁর বার্তা!
সামাজিক ব্যবহারের যে বিধিনিষেধ তাকে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন তাঁর হাঁটার ভঙ্গিতে-দুই পা অদ্ভুতভাবে ফাঁক করে, পায়ের পাতা ঘষে হাঁটতেন, অদ্ভুত মুখভঙ্গি করতেন; অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই Social Disinhibition তৈরি করতেন। আর এই অবস্থায় সামাজিক অসংগতির প্রতি কৌতুকের ছলে তীব্রভাবে কটাক্ষ করতে পেরেছিলেন। তাঁর সৃষ্টি এই জোকার চরিত্র যার নাম Tramp, সম্ভবত তাঁর বাবার নিপীড়নের প্রতি তাঁর পুষে রাখা দ্বিতীয় সত্তা বা Alter Ego এর বহিঃপ্রকাশ। এটা অনেকটা পথের ভিক্ষুক বা বস্তির মানুষের প্রতিরূপ ও তাদের আদর্শের বাহক; তারা করুণার পাত্র কিন্তু সুযোগ পেলে চুরি করতেও দ্বিধা করবে না।
এই চরিত্র নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা এত বেশি ছিল যে গল্প থেকে শুরু করে সিনেমার ফ্রেম নিজের মতো করার জন্য নিজেই পরিচালক হয়েছিলেন, স্টুডিও বানিয়েছিলেন। পথের মানুষের জীবন দর্শনের পাশাপাশি তাঁর মনে ছিল অনেক বেশি উচ্চাশা। হয়ত এই উচ্চাশাই লন্ডনের এক পথের শিশুকে ইতিহাস বিখ্যাত ‘চার্লি চ্যাপলিন’-এ পরিণত করেছিল। তিনি সবসময় স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাইতেন। মনে করতেন একজন শিল্পীকে মুক্তভাবে কাজ করতে দিতে হবে। তাঁর চলচ্চিত্রের বিষয় ছিল সমাজের বিতর্কিত ইস্যু যেগুলো প্রকাশে দুঃসাহসের দরকার হয় সেসব প্রকাশের সাহস
তাঁর ছিল।
১৯৩৯ সালে হিটলারকে নিয়ে দ্যা গ্রেট ডিক্টেটর নামে প্যারডি চলচ্চিত্র করেছিলেন, যা সেইসময়য়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ ছিল। নিখুঁত কাজের ব্যাপারে খুব কুঁতখুঁতে স্বভাবের ছিলেন, একই শট বহুবার নিতেন, বারবার রিলের সিকুয়েন্স বদলাতেন যতক্ষণ না তাঁর মনের মতো কাজ হয়। সমালোচকদের মতে তাঁর জন্যই হয়েছিল মানুষকে হাসানোর
জন্য; কিন্তু তবু তিনি সাধারণ কোনো কমেডিয়ান ছিলেন না।
শিল্পের নতুন ঘরানা তৈরির চেষ্টায় ছিলেন, যেখানে সাদা-কালো রিলের নির্বাক সিকুয়েন্স থেকে তৈরি হতো উচ্চারিত ভাষার চেয়েও স্পষ্ট সংগীত ও গল্প। এ বিষয়ে তিনি এতটা আবিষ্ট ছিলেন যে সবাক চলচ্চিত্রের আবিষ্কারের পরও বহুদিন তাঁকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেননি, নিজের মতো নির্বাক চলচ্চিত্রই বানিয়েছিলেন! তাঁর ব্যক্তিজীবন ছিল বহুবিধ স্ক্যান্ডালে ভরা। বারবার সম্পর্কে জড়িয়েছেন। অনেক সময় তৎকালীন আইনে নাবালিকাদের সঙ্গে।
মামলা হয়েছে। বিচার এড়ানোর জন্য, মেডিক্যাল রিপোর্ট বদলানোর জন্য প্রচুর টাকা খরচ করতে হয়েছে। মিন্ড্রেড হ্যারিস নামের তরুণী অভিনেত্রী গর্ভধারণের মিথ্যা অভিযোগ আনলে বাধ্য হয়ে তাঁকে বিয়ে করেছিলেন। পরে এই মিথ্যা বুঝতে পেরে চরম অসন্তুষ্ট হন তিনি। মাত্র দুই বছর পর ডিভোর্স হয় তাঁদের। ১৯২৪ সালে একইরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে লিটা থেকে বিয়ে করেন। পড়ে লিটা চ্যাপলিনের নামে মামলা করলে সমগ্র আমেরিকায় তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছিল। চ্যাপলিন আমেরিকার তরুণীদের নিয়ে যেসব করছেন তাতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ছিল প্রেস থেকে শুরু করে সিনেট। তখন তাঁর অবস্থা অনেকটা নক্ষত্র পতনের মতো! চ্যাপলিনের চলচ্চিত্র বয়কটের মতো আন্দোলন দানা বেঁধেছিল। তৃতীয় বারের মতো বিয়ে করেছিলেন পাউলেট গডার্ডকে। ধারণা করা হয়, চ্যাপলিন তাঁর ক্যারিয়ারে বাধা দিলে এই সম্পর্কও শেষ হয়ে যায়।
পঞ্চাশ বছর বয়সে বিয়ে করেন ওনা ওনিলকে। তিনি এই সম্পর্কে সত্যিকারের ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছিলেন। বয়সের বাধা তাদেরকে আলাদা করতে পারেনি শেষপর্যন্ত। অত্যন্ত গরীব পথশিশু থেকে মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে ধনী ও বিখ্যাত বনে যাওয়া এই মানুষ পরিশ্রমী কিন্তু খুব বেশি শিক্ষিত ছিলেন না। এই সাফল্য হয়ত তাঁর মধ্যে নিজেকে খুব বেশি বড়ো ভাবার অহংবোধ তৈরি করেছিল; মেগালোম্যানিয়ার মতো ব্যাপার।
অনেকের মতে তিনি তাঁর অল্পবয়সী স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি খুব নির্দয় আচরণ করতেন। এই জনপ্রিয়তা যা জনতাকে মোহিত করেছিল ব্যাপকভাবে: যাকে অনেক সেইসময়ে Chapilinitis বা Chapilonoia বলতেন, সেটা হয়ত স্বয়ং চ্যাপলিনকেও আক্রান্ত করেছিল, যার ফলে সঙ্গিনীদের অযোগ্য ভাবতেন। আবার এমনও হতে পারে কঠোর পরিশ্রমী এই মানুষ তাঁর পরিবারকে সময়ও দিতেন না তেমন, হয়ত ভুল বোঝাবুঝি শুরু হতো, সঙ্গে ছিল তাঁর অবিশ্বস্ততা ও স্ক্যান্ডাল। যদিও তাঁর শেষ বিবাহ স্থায়ী হয়েছিল, কিন্তু সেখানেও সন্তানদের প্রতি কঠিন আচরণ করতেন, ক্ষেপে যেতেন।
হয়ত এসবের পেছনে শৈশবের কঠিন সময়ে গড়ে ওঠা মানসিক গঠনের অবদান থাকতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না-চ্যাপলিন তাঁর ছোটোবেলায় পারিবারের স্নেহ পাননি আর বাবা কারণ ছাড়াই তাঁদের প্রচণ্ড মারধোর করতেন। এসবের ভেতরেই তাঁর মানসিক বিকাশ হয়েছিল, যা হয়ত প্রতিভা ও নির্দয়তাকে একসঙ্গে লালন করত।
চ্যাপলিন মূলত ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন। এ অবস্থায় কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে আমেরিকায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি কমিউনিস্টসুলভ সহানুভূতি দেখানোর অভিযোগে আমেরিকা তাঁর নাগরিকত্ব স্থগিত করলে আর ফেরেননি তিনি। বাকি জীবন সুইজারল্যান্ডেই কাটান। এত সাফল্য ও বিত্ত অর্জনের পরও সমাজতন্ত্রের প্রতি দুর্বলতার পেছনে আসলে ছিল তাঁর দুর্বিষহ শৈশব। নিজে অনেক ধনী হওয়া সত্ত্বেও ধনতন্ত্রকে ভালোবাসতে পারেননি, পুঁজিবাদের বিপক্ষে ছিলেন।
ছোটোবেলায় দেখা ধনীদের করা অবিচারের স্মৃতি এই মানুষটাকে কখনো মুক্তি দেয়নি। মনে মনে তিনি শৈশবের সেই অত্যাচারিত পথশিশুর সত্তা নিয়েই বাঁচতেন। ১৯৭৭সালে ২৫ ডিসেম্বর পরলোক গমন করেন নির্বাক চলচ্চিত্রের এই বলিষ্ঠ মানুষ।
ডা. সৌবর্ণ রায় বাঁধণ
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও দেখুন-




