“ও তো একটু জেদি, “কথাই শুনতে চায় না”, “সবসময় তর্ক করে” শিশুকে নিয়ে এমন অভিযোগ আমাদের চারপাশে খুব পরিচিত। বয়সের সঙ্গে শিশুর আচরণে কিছুটা জেদ, রাগ কিংবা বিরোধিতা স্বাভাবিক। কিন্তু কখনো কখনো এই আচরণগুলো নিছক দুষ্টুমি নয়; এর পেছনে থাকতে পারে Oppositional Defiant Disorder (ODD) নামের একটি আচরণগত সমস্যা।

ওডিডিতে শিশুরা নিয়মিতভাবে বড়োদের সঙ্গে তর্ক করে, নির্দেশ মানতে অস্বীকার করে,সহজেই রেগে যায়,অন্যকে বিরক্ত করে এবং নিজের ভুলের জন্য অন্যকে দায়ী করার প্রবণতা দেখায়।সমস্যা শুধু শিশুটির আচরণেই সীমাবদ্ধ থাকে না; ধীরে ধীরে তা পরিবার, বন্ধুত্ব, স্কুল এবং অন্যান্য সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ওডিডির সঙ্গে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, দুর্বল সামাজিক সম্পর্ক ও সহপাঠীদের প্রত্যাখ্যানের মতো সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- শৈশবের এই আচরণ কি বয়স বাড়ার সঙ্গে নিজে থেকেই হারিয়ে যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই Burke, Rowe ও Boylan ১৭৭ জন ছেলেশিশুকে ৭-১২ বছর বয়স থেকে তরুণ বয়স পর্যন্ত অনুসণ করেন। তাদের ২৪ বছর বয়স পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মূল্যায়ন করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, শৈশব ও কৈশোরে ওডিডির লক্ষণ থাকা ব্যক্তিদের তরুণ বয়সেও কার্যকর জীবনযাপনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে এসব সমস্যা সবচেয়ে স্পষ্ট ছিল সামাজিক ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে ওডিডির প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। এসব তরুণের বন্ধুর সংখ্যা কম হওয়ার পাশাপাশি বন্ধুত্বের সম্পর্কের মানও তুলনামূলকভাবে খারাপ হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু “কতজন বন্ধু আছে”-এমন সংখ্যাগত পার্থক্য নয়; সম্পর্কগুলো কতটা ভালো ও টেকসই, সেখানেও পার্থক্য ছিল। একইভাবে, প্রেমের সম্পর্কেও সমস্যার প্রবণতা দেখা যায়। পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিশেষ করে বাবার সঙ্গে সম্পর্কের মান খারাপ হওয়ার সঙ্গে ওডিডির সম্পর্ক পাওয়া যায়।
কর্মজীবনেও এর কিছু প্রতিফলন দেখা গেছে। ODD- এর সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া, সহকর্মীদের সঙ্গে সমস্যা এবং ভবিষ্যতে চাকরির জন্য কারও সুপারিশ না পাওয়ার মতো কিছু ফলাফলের সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে অন্যান্য মানসিক সমস্যার প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার পর কর্মক্ষেত্রের বেশ কিছু ফলাফলের ক্ষেত্রে ওডিডির স্বতন্ত্র প্রভাব আর স্পষ্ট থাকেনি। এর বিপরীতে চাকরির জন্য সুপারিশ না পাওয়ার বিষয়টি ওডিডির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-ওডিডির প্রভাবকে ADHD, Conduct Disorder (CD), depression এবং anxiety-এর প্রভাব থেকে আলাদা করে দেখার চেষ্টা করা হয়েছিল। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব সমস্যার প্রভাব বিবেচনা করার পরও ওডিডির সঙ্গে কম ও নিম্নমানের বন্ধুত্ব, দুর্বল পিতৃসম্পর্ক, খারাপ রোমান্টিক সম্পর্ক এবং চাকরির সুপারিশ না পাওয়ার সম্পর্ক বজায় ছিল। অন্যদিকে, নিয়মভঙ্গ, আগ্রাসন ও কিছু কর্মক্ষেত্রের সমস্যার সঙ্গে CD-এর সম্পর্ক বেশি স্পষ্ট ছিল।
সবগুলো ফলাফল একসঙ্গে বিবেচনা করেও একই চিত্র পাওয়া যায়। যেসব তরুণের শৈশব ও কৈশোরে ওডিডির লক্ষণ বেশি ছিল, তাদের সামগ্রিকভাবে একাধিক ক্ষেত্রে কার্যকর জীবনযাপনে সমস্যার ঝুঁকি বেশি ছিল। অর্থাৎ ওডিডির প্রভাব কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও সামাজিক ভূমিকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাই শিশুর জেদ, রাগ বা অবাধ্যতাকে সবসময় “বয়সের দোষ” বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। আচরণ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং পরিবার ও সামাজিক জীবনে সমস্যা তৈরি করে, তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। সময়মতো শনাক্তকরণ, পরিবারকে সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শিশুর ভবিষ্যৎ পথকে আরও ইতিবাচক করে তুলতে পারে।
কারণ, আজকের একটি ছোটো আচরণগত সংকেত কখনো কখনো আগামী দিনের সম্পর্কের গল্পটিও লিখে দিতে পারে। আর সেই গল্পটি বদলানোর সবচেয়ে ভালো সময়-সম্ভবত শুরুতেই।
ডা. অনন্যা ভট্টাচার্য্য
ফেইজ বি রেসিডেন্ট, এমডি (সাইকিয়াট্রি), বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।
রেফারেন্স:
https://doi.org/10.1111/jcpp.12150


