খেলাধুলা মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একসময় খেলাধুলাকে শুধু বিনোদন বা অবসর কাটানোর উপায় হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমান যুগে খেলাধুলা শুধু শখের বিষয় নয়; এটি একটি সম্মানজনক ও সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবেও বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বেশিরভাগ পরিবার এখনও খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নিতে নিরুৎসাহিত করে। এর পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে:
আর্থিক অনিশ্চয়তা
অধিকাংশ খেলোয়াড় পেশাগত জীবনে আশানুরূপ সফল হতে পারেন না। তাই অনেক অভিভাবক মনে করেন ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক বা সরকারি চাকরির মতো পেশা বেশি নিরাপদ।
শিক্ষার মানদণ্ড হিসেবে পরীক্ষার ফলাফলকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া
আমাদের সমাজে পরীক্ষার ফলাফল ও শিক্ষাগত সাফল্যকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রকৃত জ্ঞান, হাতে কলমে কাজের অভিজ্ঞতার তুলনায় মার্কশিট তথা সার্টিফিকেটের মূল্য এখানে অনেক বেশি। পাশাপাশি খেলাধুলাকে প্রায়শই পড়াশোনার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়। একটা মানুষ একই সাথে শিক্ষায় জ্ঞান অর্জন করবে এবং ভালো খেলোয়াড় হবে এমন চিন্তা আমাদের দেশের অধিকাংশ পরিবারগুলো কল্পনাও করতে পারে না। তাদের বেশিরভাগের ধারণা খেলাধুলা করতে গেলে পড়াশোনা করা সম্ভব নয়। পড়াশোনা এবং খেলাধুলা সমান্তরালভাবে সম্ভব নয় বিধায় যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে এই মনোভাবের কারণে আমাদের দেশের অধিকাংশ পরিবার খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে নিরুৎসাহিত করে।

সীমিত অবকাঠামো ও সুযোগ
সব খেলায় উন্নত প্রশিক্ষণ, মাঠ, কোচিং ও পেশাদার লিগ নেই। তাই খেলাধুলায় দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের সুযোগ তুলনামূলক কম বলে মনে করা হয়।
সামাজিক ধারণা
অনেকের মধ্যে এখনও ধারণা আছে যে খেলাধুলা শুধুমাত্র একটি শখ, পেশা নয়। আমাদের অনেকেই এখনো পেশা এবং শখ এই বিষয় দুটি সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝি না। শখে মানুষ কাজ করে শুধু আনন্দ পাবার জন্য। আর পেশায় মানুষ কাজ করে দায়িত্ব ও জীবিকার জন্য—যদিও সেখানে আনন্দও থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় কেউ যদি অবসরে শুধু আনন্দ পাবার উদ্দেশ্যে ফুটবল খেলেন তাহলে ফুটবল খেলা তার শখ। আর যদি কেউ ফুটবল খেলে আয় করেন এবং সেটাই তার জীবিকার প্রধান উৎস হয় তাহলে ফুটবল তার পেশা।
ক্যারিয়ারের ঝুঁকি
খেলোয়াড়দের কর্মজীবন অন্যান্য পেশার তুলনায় ছোটো হয়। আমাদের দেশে সরকারি চাকরিতে অবসর গ্রহণ করেন সাধারণত ৫৯ বছরে, অধিকাংশ বেসরকারি চাকরিতে অবসর গ্রহণের বয়স সাধারণত ৬০ বছর। আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই বয়স ৬৫ বছর পর্যন্ত। অন্যদিকে শারীরিক ফিটনেস যেহেতু ৪০ এর পর থেকে কমতে থাকে তাই যারা খেলাধুলা করেন বিশেষ করে যে সমস্ত খেলাধুলায় শারীরিক পরিশ্রম বেশি হয়, সেখানে চল্লিশের পরপরই একজন খেলোয়াড় অবসর গ্রহণ করে থাকেন। স্বল্প সময়ের এই ক্যারিয়ারকে অনেক পরিবার অনিশ্চয়তা হিসেবে দেখে থাকে। ফলে ছোটোবেলা থেকে ছেলে-মেয়েদেরকে খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নিতে নিরুৎসাহিত করা হয়।
সফল রোল মডেলের স্বল্পতা
আমরা সব সময় সফল ব্যক্তিদেরকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি। তাদের জীবনযাপন পদ্ধতিকে পারফেক্ট মনে করি এবং সন্তানদেরকে সেভাবে চলতে বলি। একজন সফল ব্যবসায়ী, সফল শিক্ষক ও সফল জনপ্রতিনিধির তুলনায় সফল ক্রীড়াবিদের সংখ্যা অনেক কম। তাই অধিকাংশ পরিবার মনে করে খেলাধুলার মাধ্যমে এমন সাফল্য অর্জন করা খুব কঠিন।
তবে আশার কথা হলো পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। বর্তমানে ক্রিকেট, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, ই-স্পোর্টসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পেশাগত সুযোগ বাড়ছে। অনেক পরিবার এখন খেলাধুলা ও পড়াশোনাকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার বাস্তবসম্মত উপায়
এখানে আমরা কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করব, যার মাধ্যমে আমরা দেখব কীভাবে খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে এগিয়ে নেওয়া যায়। এক্ষেত্রে কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে :
দক্ষতার প্রমাণ দেখান
স্থানীয়, জেলা বা জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিন। ভালো ফলাফল পরিবারকে আপনার সম্ভাবনা সম্পর্কে আশ্বস্ত করতে পারে। পড়াশোনা পুরোপুরি ছেড়ে দেবেন না। অনেক পরিবার খেলাধুলার বিরোধিতা করে কারণ তারা বিকল্প ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত থাকে। খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে গেলে তাদের উদ্বেগ কমতে পারে।
পরিকল্পনা তৈরি করুন
শুধু ‘‘আমি খেলোয়াড় হতে চাই’’ বলার চেয়ে, কোন খেলায়, কীভাবে প্রশিক্ষণ নেবেন, কী প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন এবং ভবিষ্যতে কী সুযোগ আছে—এসব স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন। কোচ বা অভিজ্ঞ ব্যক্তির সহায়তা নিন। একজন কোচ বা প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড় যদি আপনার প্রতিভা সম্পর্কে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন, তা অনেক সময় প্রভাব ফেলে।
ধাপে ধাপে এগোন
নিজের লক্ষ্য স্পষ্ট করুন এবং এই লক্ষ্যে শেষ একটা সময়সীমা বেঁধে দিন। একবারে গাছের মগডালে ওঠার চেষ্টা করবেন না। ধাপে ধাপে এগোন। কখনো হাল ছেড়ে দিবেন না। প্রথমে আঞ্চলিক বা জেলা পর্যায়ে, তারপর বিভাগীয় পর্যায়ে এবং সবশেষে জাতীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করুন। এর জন্য সুস্পষ্ট লক্ষ্য এবং কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা রাখতে হবে। মনে রাখবেন ভুল করে কেউ এভারেস্ট জয় করে ফেলে না। হুট করে কেউ হায়ার স্টাডিজের স্কলারশিপ পেয়ে যায় না, রাতারাতি কেউ ম্যারাথন দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন হয় না, একদিন ব্যায়াম করেই কেউ বডি বিল্ডার হয় না। এর জন্য চাই রাতের পর রাত-দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম, চাই অনেক ত্যাগ, অনেক সেক্রিফাইস। কারণ প্রেস্টিজিয়াস কোনো কিছুই সহজ না; আর সহজ কোনো কিছুই প্রেস্টিজিয়াস না। তাই খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নিতে হলে তার জন্য ধৈর্যসহকারে নিয়মিত অনুশীলন করে যেতে হবে।
খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য পেশা সম্পর্কেও যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করুন
সবাই পেশাদার খেলোয়াড় না হলেও কোচিং, ফিটনেস ট্রেনিং, ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা, ক্রীড়া সাংবাদিকতা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ক্যারিয়ার গড়া যায়। এগুলোও যথেষ্ট প্রেস্টিজিয়াস এবং সম্মানজনক পেশা হতে পারে।
খেলাধুলার সামাজিক উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা
আমরা সাধারণভাবে মনে করি খেলাধুলার শুধু শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমরা এটা ভুলে যাই যে শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা ছাড়াও সামাজিকভাবে খেলাধুলার গুরুত্ব অপরিসীম। ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, হকি, হাডুডু, জুডো, কারাতে এমন ধরনের যেকোনো খেলায় যেহেতু একটা নির্দিষ্ট নিয়মকানুন থাকে এবং অনেকের সাথে মিলে যেহেতু খেলাধুলা করতে হয়, তাই খেলাধুলা আমাদের মধ্যে দলবদ্ধভাবে কাজ করার মনোভাব গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে আমাদের নেতৃত্বের গুণাবলী বিকশিত হয়। পাশাপাশি খেলাধুলা আমাদেরকে শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা ও সহনশীলতা শেখায়; বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব বৃদ্ধি করে। তাই পেশা হিসেবে খেলাধুলাকে গ্রহণ করলে একজন ব্যক্তি সামাজিকভাবেও অনেক উপকৃত হতে পারেন।
পরিশেষে বলবো যে কোনো লক্ষ্য পূরণের জন্যই চাই ফোকাস এবং হার্ডওয়ার্ক। আপনি কোন বিষয়ে আনন্দ পান এবং কোন বিষয়ে আপনার প্রতিভা আছে এটা আপনাকেই খুঁজে বের করতে হবে। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নিতে চাইলে প্রথমেই দেখতে হবে সেই খেলাতে আপনি কতটা আনন্দ পাচ্ছেন, সেই খেলাকে পেশা হিসেবে নিতে গেলে কী কী সুবিধা এবং প্রতিবন্ধকতা আপনার সামনে রয়েছে এবং সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনের জন্য আপনার হার্ডওয়ার্ক করার মানসিকতা কতখানি। এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে আপনি আপনার পছন্দের খেলাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতেই পারেন।

