নেতিবাচক চিন্তা হলো আমাদের মনের এমন এক প্রক্রিয়া যা যেকোন বিষয়ের খারাপ দিকগুলোর দিকে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করে একটি বড় সমস্যা হিসেবে আমাদের সামনে তুলে ধরে। এটি হতে পারে আত্মসমালোচনা (আমি কোন কাজের না), হতাশা (আমার কোন ভবিষ্যৎ নেই), বা অন্যদের সম্পর্কে ভুল ধারণা (সবাই আমাকে অপছন্দ করে) ইত্যাদি। মাঝে মাঝে এমন কিছু চিন্তা স্বাভাবিক হলেও, যদি এগুলো বারবার বেশি পরিমাণে আসে, তাহলে তা আমাদের মানসিক অবস্থা, আচার-আচরণ এমনকি শারীরিক অবস্থাকেও খারাপভাবে প্রভাবিত করে। আমাদের মন খারাপ করে দেয়, দুশ্চিন্তা বাড়ায় এবং অনেক সময় কাছের মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
একটু চেষ্টা করলেই আমরা কয়েকটি ধাপে আমাদের মনের ভিতরে গেঁথে থাকা অনাকাঙ্ক্ষিত নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে ইতিবাচক চিন্তায় বদলে দিতে পারি।
চিন্তাটিকে চিহ্নিত করুন–
নেতিবাচক চিন্তাকে মুহূর্তেই ধরে ফেলুন। বেশিরভাগ সময় এরা অজান্তেই চলে আসে এবং আমাদের মনের অবস্থা বদলে ফেলে। যখন আপনি উদ্বিগ্ন, রাগান্বিত বা হতাশ বোধ করবেন, তখন নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন: “আমি এখন কি চিন্তা করছি“? চিন্তাটিকে ধরে ফেলতে পারলেই আপনি বুঝবেন যে এটা একটা অমূলক চিন্তা এবং এর সাথে আপনার বাস্তব জীবনের তেমন কোন মিল নেই।
চিন্তাটির সত্যতা যাচাই করুন–
প্রত্যেকটা চিন্তায় বিশ্বাস করবেন না। নিজেকে প্রশ্ন করুন: এটা কি সবসময় সত্যি? এর কোন প্রমাণ আছে?” উত্তরগুলো লিখে ফেলুন পারলে। “আমি সবসময় ব্যর্থ হই”—এমন চিন্তায় ভেঙে না পড়ে নিজের জীবনের খুব ছোট বা বড় যেকোন সফলতার কথা মনে করুন, লিখুন। দেখবেন, নেতিবাচক চিন্তার প্রভাব কমে যাবে।
ভুলকে অন্যভাবে দেখুন-
জীবনে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। কেউই ভুলের উর্দ্ধে নয়। যদি ভুলকে নিজের অযোগ্যতা ভাবেন, তাহলে আরো বড় ভুল হবে। বরং ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখলে তা ভবিষ্যতের শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। তাই ভুলকে ভয় নয়, বরং শেখার সুযোগ হিসাবে দেখতে শুরু করুন।
গঠনমূলক বিকল্প ভাবুনা ভাবুন-
নেতিবাচক চিন্তাগুলো প্রকাশ করার ক্ষেত্রে “না” মূলক শব্দ ব্যবহার করবেন না, বরং বিকল্প কোন কথা চিন্তা করুন। তবে হ্যাঁ, আপনার কথা ও বিকল্প চিন্তাগুলো বাস্তবসম্মত হতে হবে। যদি কোনকিছু নিয়ে মাথায় আসে- “আমি পারব না” তাহলে একবারে“আমি পৃথিবীর সেরা হব”, চিন্তা করতে চাইলে আপনার মস্তিষ্ক তা মানবে না। কিন্তু যদি বলেন-“এটা কঠিন, তবে আমি ধাপে ধাপে করতে পারব” তাহলে আপনার মস্তিস্ক সেটাকে সহজে গ্রহণ করবে।
নিজের অর্জন খুজে বের করুন-
নেতিবাচক চিন্তা সহজে সহজে মাথা থেকে বের হয়না। এর সহজ উপায় হলো প্রতিদিন তিনটি বিষয় কাগজে লিখুন যেগুলো আপনার জীবনের অর্জন। ছোট হোক বা বড়, আপনি লিখুন। সময়ের সাথে সাথে আপনার মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই ইতিবাচক জিনিস খুঁজতে শুরু করবে, আর আপনার নেতিবাচক চিন্তা কমতে শুরু করবে।
নিজেকে ভালবাসুন-
আপনি ভালবাসার কোন মানুষ যদি তার নিজের ব্যাপারে বলে যে সে একবারেই মূল্যহীন, তাহলে আপনি তাকে কি বলবেন? আপনিও কি তাকে মূল্যহীন বলবেন? নাকি তাকে বুঝাবেন যে তিনি কেন মূল্যহীন নন বা কেন আপনি তাকে ভালবাসেন? নিজের ক্ষেত্রেও তাই করুন। নিজেকে ভালবাসুন, নিজেকে বুঝান যে আপনি নিজেও অনেক মূল্যবান।
চেস্টা করুন–
চেস্টাতেই পরিবর্তন আসে। ডায়েরি লিখুন। মাইন্ডফুলনেস, ব্রিদিং এক্সারসাইজ —এসব নিয়মিত চর্চা করুন। এতে করে নেতিবাচক চিন্তা ধরতে পারা ও সেগুলো বদলানো আপনার অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে। যত বেশি এর চর্চা করবেন, ততই উপকার বাড়বে। সময়ের সাথে সাথে আপনার মন নেতিবাচক চিন্তা থেকে সরে গিয়ে গঠনমূলক চিন্তায় অভ্যস্থ হয়ে পড়বে।
পৃথিবীর সবই ইতিবাচক, যদি ইতিবাচক মন নিয়ে দেখা যায়। সুন্দর হোক- আমাদের সবার জীবন।
ডা. শাহরিয়ার ফারুক
সহকারী অধ্যাপক, এডাল্ট সাইকিয়াট্রি।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। মনেরখবর-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য মনেরখবর কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।
আরও পড়ুন:


