দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি : মানসিক অস্বস্তিতে ভুগছেন নাগরিকরা

দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি : মানসিক অস্বস্তিতে ভুগছেন নাগরিকরা

বিশেষ প্রতিবেদন, মনের খবর : পেঁয়াজ দিয়ে শুরু অবিশ্বাস্য বাজার মূল্যের অস্থিরতা। রেকর্ড হয়েছিলো লবনের দামেও। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে পরিমাণে সব থেকে কম গ্রহণ করা হয় লবন। সেই লবন-ই কিনা মানুষ ঘরে ঘরে জমিয়ে রাখা শুরু করেছিলো। দ্রব্যমূলের বাজারে পেঁয়াজ তো রীতিমতো বিশ্বরেকর্ড-ই করে ফেলেছে।

১৯’সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক বাজার দরের তুলনায় ৩৫২ শতাংশ বেশি দাম বেড়েছে বাংলাদেশে। এই হিসাব যখন প্রতি কেজি পেঁয়াজ ১৭০ টাকা। এরপর তো ২৫০ টাকায় পৌঁছে প্রতি কেজি পেঁয়াজ। এটা এমন এক বিশ্বরেকর্ড যেটা এখনো পর্যন্ত কোনো দেশ ভাঙতে পারেনি আর কেউ ভাঙতে পারবে বলেও মনে হয় না।

প্রতিনিয়ত দাম বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের। ডাল, চাল, আদা, রসুন, মাছ, মাংস ও সবজির বাজার সর্বত্রই আগুন। এছাড়াও জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, ওয়াসার পানির দাম বাড়ছে লাগামহীনভাবে।

এভাবে প্রতিনিয়ত জীবনযাত্রার মূল্য বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়ছে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর খেটে খাওয়ার সাধারণ মানুষ। করোনার কারণে চাকরী হারিয়ে ৪০ হাজার টাকা শুধু ফ্লাট ভাড়া দেওয়া বিত্তশালী লোকও ঢাকা ছেড়ে গ্রামে গিয়ে চায়ের দোকান দিতে বাধ্য হয়েছে।

করোনার কারণে সাধারণ মানুষের অর্থনীতির যখন তলানিতে তখন ন্যায্যমূল্যের পরিবর্তে উল্টো সিন্ডিকেট কারসাজির চড়ামূল্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে জনজীবন। দিনদিন বাজার মূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণে অর্থনৈতিকভাবে কোনঠাসা হয়ে মানসিকভাবে বিষণ্নতায় চলে যাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষগুলো।

সরকারের এদিকে কোনো নজর নেই। সরকারও বরং সিন্ডিকেটকারীদের সাথে পাল্লা দিয়ে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে দফায় দফায়। ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির কারণে হতাশাগ্রস্থদের মনের কথা তুলে ধরতে মনের খবর মুখোমুখি হয় নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষের।

অরো পড়ুন…
মানসিক স্বাস্থ্য কী?
মানসিক স্বাস্থ্য : আমরা কতোটা সচেতন?

সাদ্দাম। বয়স ৩১। বাড়ি নোয়াখালী। রাজধানীর মগবাজারে ভাসমান চায়ের দোকান পরিচালনা করেন। ঢাকায় থাকেন একাই। যা বেচাকেনা হয় তাতে বাসা ভাড়া দিয়ে ঢাকায় একা থাকতেই কষ্টে দিন যায়। প্রতিনিয়ত জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির কারণে ভুগছেন হতাশায়।ৎ

সাদ্দাম বলেন, ‘৩১ বছর বয়স অইছে, ঢাকায় আইছি ২ বছর ধইরা। যা বেচি তাতে নিজেই চলতারি না। বাড়িতে কিছু দিয়া হারি (পারি) না। অনেক কষ্ট অয় চলতে। কি করুম কেমনে চলমু খালি টেনশন অয়। মন খুব খারাপ। সরকার আমাগো জন্যি কিছু করে না। মনে খুব অশান্তি।

মো. হারুনের বাড়ি কিশোরগঞ্জ। বয়স ৩০ কোটায়। ফ্যামিলি নিয়ে থাকেন। মগবাজারেই তার ভাসমান দোকান। আলু চিপস আর ভূট্টার খই ভেজে বিক্রি করেন। হকার তার কাছ থেকে পাইকারি নিয়ে যান। খুচরাও বিক্রিরা করেন।

সাংবাদিক, ‘ছবি তোলা রিপোর্টিংয়ের কথা বলতেই বলে উঠেন, লাভ নাই ভাই। যে দেশে প্রধানমন্ত্রী টকশো এক দিয়া শোনে আরেক দিয়া বাইর কইরা দেয়। কয় টকশো মকশো কি কয়। ছোট্ট একটা বাসায় ৮ হাজার টাকা ভাড়া দিয়া থাকি। গরীবদের নিয়া কোনো চিন্তা নাই’।

বেচাকেনা আগের মতোই কিন্তু খরচ তো বেড়ে গেছে বলতেই বললেন, ‘খরচ বাড়েনাই সরকার বাড়াইছে। আমগো মনের খবর সরকার রাখে না। মানসিকভাবে খারাপ অবস্থায় আছি। সব সময় টেনশন হয় কীভাবে টিকে থাকবো। মানসিক অশান্তিতে আছি অনেক ভাই। এইগুলা কইতেও ভাল্লাগে না।’

রিকশা চালক মামুন মিয়া বলছেন, ‘পড়াশুনা করেছি চাকরী নাই। ইন্টাার পাশ করে ঢাকায় এসে রিকশা চালাই। কিন্তু বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের দাম যেভাবে প্রতিদিন বাড়তেছে তাতে দিন দিন হতাশা বাড়তেছে। মাঝে মাঝে চরম বিষণ্নতায় চলে। মানসিকভাবে মাস শেষে যখন বিভিন্ন খরচ মিটিয়ে হাত খালি হয়ে যায় তখন মানসিকভাবে প্রচণ্ডরকম ভেঙে পড়ি।

মামুন বলছিলেন, ইদানীং মনে হচ্ছে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছি। খুব ডিপ্রেশনে ভোগি। সরকার বাজেট করে তাতে আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য কিছুই বরাদ্ধ থাকে না। বড় বড় চোর ডাকাতদের কর মাফ করে দেয় আর আমাদের থেকে উন্নয়নের নামে বাড়ড়ি কর আদায় করে। আমাদের সরকার আসলে গরীবদের সরকার না। তারা ডাকাতদের সরকার।’

এসএসসি পড়ুয়া তরুণ নয়ন চৌধুরীর গাজীপুরে। এপেক্স ফুটওয়্যারে স্বল্প বেতনে চাকরী করেন। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে ভিষণ অস্বস্তিতে আছে নয়ন চৌধুরী। আক্ষেপের সাথেই বলছিলেন সেসব কথা। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর, প্রতিমাসে বা প্রতিদিন জিনিস পত্রের দাম বৃদ্ধি পায়। ফলে জনজীবন হচ্ছে দুঃখ ও কষ্টের শিকার। ধানের ভরা মৌসুমেও দাম বাড়ছে চালের। শুধু তাই নয় ভোজ্যেতেল সহ ডাল, আটা, শুকনা মরিচ, পিঁয়াজ ও চিনি সহ প্রতিটি নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দামই এখন বাড়তির দিকে।

হঠৎ করে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছে আমার মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত সহ স্বল্প আয়ের মানুষ। গ্যাস, বিদ্যুত ও পরিবহনের মতো সেবা সার্ভিসের মূল্য দফায় দফায় বেড়ে যাওয়ায় দেশের ক্রেতা-ভোক্তা সাধারন জনগন আরও বেশী অসহায় হয়ে পড়ছে।’

নয়ন চৌধুরীরর ভাষ্য- ‘দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থানরত মানুষের জন্য তা এক অভিশাপ হিসাবে বিবেচ্য । কারণ দ্রব্যমূল্য যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সেভাবে সাধারন জনগনের উপার্জন বৃদ্ধি পায়নি। একদিকে দ্যারিদ্র্যর অভিশাপ অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি জনজীবনকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। অন্যদিকে মাথা পিছু আয়ের অসার গল্প আমাদেরকে কৌতুকের বস্তুতে পরিণত করছে। আমার নিজেকেই এখন মানসিকভাবে অসুস্থ মনে হচ্ছে।

আগে আমার মাস চলত ৬-৭ হাজার টাকায়। গত দুই মাস ধরে সেটা সাড়ে ৭ থেকে সাড়ে ৮ এ পৌছেছে। নিজেকে অনেক কিছু থেকেই গুটিয়ে নিয়েছি। তারপরও খরচ কমাতে পারছি না।পরিবার থেকে চাহিদা তো আছেই।’

মাহমুদুল হাসান মাহিম চাকরী করেন একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে। ছবি তুলতে চাইলে অপরাগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ভাই বেচে আছি এটাই অনেক বেশি। কারণ দেশটা তো গুটিকয়েক মানুষের জন্য। তারা সুখে থাকলেই দেশ টিকে থাকবে’।

মাহমুদ প্রশ্ন করেন ‘আমাদের কথা ভাবে কে? সরকার তাদের কথাই ভাবে। তাদের অবৈধ সম্পদ বৈধ করে দেয়, ঋণখেলাপি দাগি ডাকাতদের লোন দেয়। দূর্নীতিবাজ আমলা আর দলীয় ক্যাডারদের পকেট খরচ যোগাতে আমাদের উপর গ্যাস বিল, বিদ্যুত বিল, ওয়াসার পানি বিল চাপিয়ে দেয় দফাদফায় বাড়তি হিসেবে।’

ইদানীং দেখছি উচ্চ শিক্ষিত অনেক তরুণ তরুণী আত্মহত্যা করছে। মাঝে মাঝে বাজারে মূল্যে জীবন মানের খরচ বাড়ার কারণে আর্থিক টানাপোড়েনে এতোটাই বিষণ্ন হয়ে পড়ি যে তাদের মতো মরে যেতে ইচ্ছে করে। বেচে আছি ফ্যামিলির মায়ায়। এটাই যথেষ্ট। এতটুকুই বেশি। কারণ, কিছু কিছু নেতার কথা শুনলে মনে হয় আমাদের মতো গরীবদের যে এদেশে থাকতে দেয়া হয়েছে এটাই সৌভাগ্যের’ বলছিলেন মাহমুদ।

  • দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর্থিক সংকটে হচ্ছে সামাজিকভাবে অপমানিত। জীবনযাত্রার মান ক্রমেই নিম্নগামী হচ্ছে। নিম্নবিত্তরা ও প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের বেচে থাকাটাই কষ্টকর হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক মান সূচকে শুধু মাথাপিছু আয়ের হিসাব করলে দেশে সুস্থ মানুষের সংখ্যা কমে যাবে। তৈরী হবে বিশৃঙ্খলা।

আর্থিক সংকটে লজ্জায়, হতাশায় মানুষ আরো বেশি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। এতে বাড়তে পারে মানসিক অসুস্থতা, আত্মহত্যা, অপরাধ প্রবনতা ও চুরি-ছিনতাই। দ্রুত এ সংকট কাটিয়ে উঠাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা।

এটাও পড়ুন…..
পরিবারে কম সন্তান শিশুর মানসিক সমস্যা তৈরী করে : গবেষণা

স্বজনহারাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পেতে দেখুন: কথা বলো কথা বলি
করোনা বিষয়ে সর্বশেষ তথ্য ও নির্দেশনা পেতে দেখুন: করোনা ইনফো
মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মনের খবর এর ভিডিও দেখুন: সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে 

“মনের খবর” ম্যাগাজিন পেতে কল করুন ০১৮ ৬৫ ৪৬ ৬৫ ৯৪

/এসএস

শেয়ার করুন, সাথে থাকুন। সুস্থ থাকুন মনে প্রাণে।

No posts to display

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here