একজন আসক্ত ব্যক্তি জানেন যে কাজটি তিনি করছেন,সেটি তার শরীর, পরিবার ও জীবনের জন্য ক্ষতিকর। তারপরও তিনি বারবার সেই কাজটিই করেন। কেন? শুধু ইচ্ছাশক্তির অভাব, নাকি এর পেছনে কাজ করে মস্তিষ্কের আরও গভীর কোনো পরিবর্তন?
আসক্তিকে অনেক সময় ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা খারাপ অভ্যাস হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু Nature Reviews Neuroscience-এ প্রকাশিত “Addiction and the Brain: The Neurobiology of Compulsion and Its Persistence” শীর্ষক গবেষণাপত্রে দেখানো হয়েছে, আসক্তি এমন একটি জটিল অবস্থা, যেখানে বারবার মাদক গ্রহণ মস্তিষ্কের বিভিন্ন সার্কিট ও কোষীয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে গুরুতর নেতিবাচক পরিণতি জানা সত্ত্বেও মাদক গ্রহণের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

গবেষণাপত্রে আসক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে compulsive drug use অর্থাৎ ক্ষতিকর পরিণতি সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে মাদক গ্রহণ করা। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে দীর্ঘস্থায়ী relapse বা পুনরায় মাদক গ্রহণের ঝুঁকি। এমনকি withdrawal-এর শারীরিক লক্ষণ কমে যাওয়ার অনেক পরও একজন ব্যক্তি আবার মাদক গ্রহণের দিকে ফিরে যেতে পারেন।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে মস্তিষ্কের স্মৃতি ও শেখার প্রক্রিয়া। গবেষকদের মতে, আসক্তি স্বাভাবিক associative memory-এর কিছু প্রক্রিয়াকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারে, যার ফলে মাদক গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা ও সংকেত দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে। কোনো নির্দিষ্ট স্থান, ব্যক্তি, পরিবেশ বা মাদক ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত কোনো সংকেত পরবর্তিতে craving তৈরি করে relapse-এর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আসক্তির ক্ষেত্রে শুধু ‘ভালো লাগা’ বা pleasure-কে দায়ী করাও যথেষ্ট নয়। গবেষণাপত্রে আলোচিত incentive-sensitization theory অনুযায়ী, আসক্তির ক্ষেত্রে ‘liking’-এর চেয়ে ‘wanting’ অর্থাৎ তীব্রভাবে মাদক পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মাদক এবং মাদক-সম্পর্কিত সংকেতের প্রতি মস্তিষ্কের কিছু motivational system অতিসংবেদনশীল হয়ে উঠলে এসব সংকেত অত্যন্ত আকর্ষণীয় বলে মনে হতে পারে।
এই প্রক্রিয়ায় dopamine system গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মস্তিষ্কের ventral tegmental area (VTA), nucleus accumbens (NAC) এবং dorsal striatum-এর মতো অঞ্চলের পারস্পরিক যোগাযোগ reward, motivation ও reinforcement-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। বারবার মাদক গ্রহণের ফলে এসব স্নায়ুপথে পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা মাদক গ্রহণের আচরণকে আরও শক্তিশালী করে।
গবেষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে, মাদক গ্রহণের ফলে synaptic plasticity-তেও পরিবর্তন ঘটতে পারে। অর্থাৎ স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগের শক্তি ও কাঠামো পরিবর্তিত হতে পারে। কিছু গবেষণায় nucleus accumbens ও prefrontal cortex এ এমন কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা মাদক গ্রহণ বন্ধ হওয়ার পরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে তবে গবেষণাটি স্পষ্ট করে যে dependence এবং addiction এক বিষয় নয়। Dependence-এর সঙ্গে withdrawal জড়িত হতে পারে, কিন্তু dependence থাকলেই compulsive addiction হবে এমন নয়। একইভাবে withdrawal এর লক্ষণ চলে গেলেও relapse হতে পারে।
সব মিলিয়ে, গবেষণাটি দেখায় আসক্তি শুধু একটি খারাপ অভ্যাস নয়; এটি মস্তিষ্কের reward, motivation, শেখা ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িত একটি জটিল প্রক্রিয়া। তাই আসক্ত ব্যক্তিকে শুধুমাত্র ‘ইচ্ছাশক্তির অভাব’ হিসেবে বিচার না করে এর পেছনে থাকা মস্তিষ্কীয় ও আচরণগত পরিবর্তন বোঝা জরুরি।
রেফারেন্স: Hyman SE, Malenka RC. Addiction and the Brain: The Neurobiology of Compulsion and Its Persistence. Nature Reviews Neuroscience. 2001; 2:695-703.
ডা. অনন্যা ভট্টাচার্য্য
ফেইজ বি রেসিডেন্ট, এমডি (সাইকিয়াট্রি), বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।


