মানসিক স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিনিয়োগটা জরুরি। স্বাস্থ্যখাত বা যেকোনো খাতে বিনিয়োগ বা ডোনেশন যাই হোক; অর্থ দরকার হয়। মানসিক স্বাস্থ্যখাতেও এটা খুব বেশি জরুরি বিষয়। কেননা মানসিক স্বাস্থে বিনিয়োগ সবচাইতে কম। স্বাস্থ্যখাতে যে বাজেট হয় তার পয়েন্ট ফাইভ বা পয়েন্ট ফোর পার্সেন্ট ব্যয় হয় মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে।
যেটা খুবই অপ্রতুল। এখন কথা হচ্ছে যদি বিনিয়োগ বাড়ে সেক্ষেত্রে কীভাবে করা উচিত। আমাদের দেশে জনসংখ্যা সাড়ে ১৬ কোটিরও বেশি। এরমধ্যে ২ কোটিরও বেশি মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত। প্রাপ্ত বয়স্ক ১৮ শতাংশ, কিশোর-তরুণ, শিশু ইত্যাদি ১৩-১৪ শতাংশ। অর্থাৎ আমরা যাই করি না কেন রোগী কিন্তু ইতিমধ্যে অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে কোভিড পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা অনেক বেশি বাড়তেছে। তাহলে বিনিয়োগ করতে হবে কোথায় সেটা আগে ভাবতে হবে। এটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো কেন হয় আমরা যদি সেটা চিহ্নিত করতে পারি তাহলে বিনিয়োগের তুলনামূলক গুরুত্বের খাতগুলো চিহ্নিত করতে পারব। আমরা ধরে নিতে পারি, মানসিক স্বাস্থ্যের এই করুণ দশার একটা কারণ হতে পারে এই যে, আমরা এ বিষয়ে জানি না। সমাজে এ নিয়ে অনেক বেশি অজ্ঞতা আছে, কুসংস্কার আছে। আমাদের কিছু ঘাটতি আছে, বিশেষ করে আমাদের কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। এগুলো যদি আমরা উল্লেখ্য করি, তাহলে কিন্তু দেখা যাচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ যতটা আছে বা যে পরিমাণ চিকিৎসা ব্যবস্থা বিদ্যমান আছে মানুষ কিন্তু সেটুকুও গ্রহণ করছে না। মানে হলো প্রচুর ট্রিটমেন্ট গ্যাপ রয়েছে। এটা প্রায় ৯০ থেকে ৯০.৪ শতাংশ। অর্থাৎ আমাদের যে চিকিৎসা ব্যবস্থা বর্তমানে আছে সেটারও পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না। মানুষ নিচ্ছে না।

তারমানে এখানে অজ্ঞতা আছে, এখানে কুসংস্কার আছে। হয়ত মেন্টাল হেলথ ওয়ার্কার ও অন্যান্য লোকবলের ঘাটতি আছে। বিনিয়োগটা আমাদেরকে এইভাবে চিন্তা করেই করতে হবে। কোনোটাই আলাদা আলাদাভাবে ভাববার সুযোগ নাই। যেহেতু রোগীরা সচেতন না, তারা চিকিৎসা নিতে আসছে না সেক্ষেত্রে আমরা আগে কুসংস্কার কমানোর উদ্যোগ নিতে পারি। সেখানে একটু বেশি জোর দিতে পারি। আবার বলতে গেলে রোগীর সংখ্যাও ইতিমধ্যে বেড়ে গেছে। এখন আরেকটা বিষয় জানতে হবে যে, মানসিক স্বাস্থের যে বিস্তার সেটা কিন্তু অনেক বেড়ে গেছে। মানসিক স্বাস্থের সাথে যুক্ত হয়েছে মাদকাসক্তি, ইন্টারনেট আসক্তি। আগে আমরা আসক্তি বলতে মাদকদ্রব্য নেয়াকে ভাবতাম। কেউ গাজা খায়, কেউ মদ খায়, আফিম, ফেন্সিডিলসহ নিত্য নতুন মাদক সেবনের কথা ভাবতাম। এখন কিন্তু আসক্তির পর্যায় আরো বেড়ে গেছে। ইন্টারনেট ব্যবহারও এখন অনেকটা আসক্তির পর্যায়ে চলে গেছে। অর্থাৎ আসক্তির পরিমাণ এখন দেশে মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে আসক্তি এবং মানসিক স্বাস্থের অন্যান্য সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এখন অধিক মাত্রায় বেড়ে গেছে। এজন্য বিনিয়োগের প্রশ্নে আমাদেরকে দুইটা বিষয় সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। একটা হলো সামাজিকভাবে অসচেতনতা দূর করা, অজ্ঞতা কমানো, চিকিৎসা সেবার প্রচার-প্রসার করা। পাশাপাশি হেলথ কেয়ার, মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অর্থাৎ দুইটা কাজের জন্যই আমাদের লোকবল বাড়াতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সেবা বাড়াতে হবে। টিমওয়ার্ক করার মতো অবস্থান তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ গোটা বিষয়টাকে যদি একসাথে বলি তাহলে হবে যে, মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী বাড়াতে হবে। এরমধ্যে সাইকিয়াট্রিস্টস আছে, সাইকোলজিস্ট আছে, সাইকোসেরাপিস্ট আছে, অকুপেশন থেরাপিস্ট আছে, সাইকিয়াট্রি নার্স আছে, কাউন্সিলর আছে। অর্থাৎ অনেক ধরনের লোকবল বাড়াতে হবে। এটা একটা টিমওয়ার্ক হয়ে কাজ করবে। সব বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। কিন্তু, যেহেতু আমরা রাতারাতি সাইকিয়াট্রিস্টস, সাইকোলজিস্ট বা থেরাপিস্ট তৈরি করতে পারব না সেজন্য আমাদের প্রাথমিক পর্যায়ে মাঠকর্মী বাড়াতে হবে। এরজন্য দক্ষ লোকবল বাড়াতে প্রচুর ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
এই ক্ষেত্রে সরকারের যেমন দায়িত্ব আছে, বেসরকারিভাবেও প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি বা সমাজ; সকলেরই দায়িত্ব আছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, সংস্থা আছে বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আছে তাদেরও অনেক কিছু করার আছে। তাদের আলাদা উইং আছে, বহুদিন ধরে ‘ডব্লিউএইচও’ বিষয়টার পেছনে লেগে আছে। এই সমস্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান সংগঠনের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের ওপর দায়িত্ব বেশি বর্তায়। এখন আমরা যদি দেখি সরকার এখানে কতটুকু বিনিয়োগ করছে, কী করছে, কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, সরকার কী পরিকল্পনা গ্রহণ করছে সেটাও কিন্তু আমাদের জানা দরকার। আমার জানি সরকার ইতিমধ্যে বেশকিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আমাদের দেশে কিন্তু কোনো মেন্টাল হেলথ অ্যাক্ট ছিলনা। সরকারের আন্তরিকতায় আমরা ২০১৮ সালে সেটা করতে পেরেছি। এই সময়ে এসে একটা আধুনিক মানসিক স্বাস্থ্য নীতি জরুরি ছিল। ইতিমধ্যে কর্মপরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। এখন এগুলো বাস্তবায়নে অনেক বেশি জোর দিতে হবে। সরকারের বিভিন্ন সেক্টরের নীতিনির্ধারকদের বিষয়টাকে গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সবাইকে সমন্বিত উদ্যোগে কাজ করতে হবে। সেই সাথে এখন যে বিষয়টা গুরুত্ব দিতে হবে সেটা হলো, বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে হবে। এবং সেবা বাড়ানোর পাশাপাশি লোকবল বাড়াতে বাড়তি উদ্যোগ নিতে হবে।
সেই সাথে সামাজিক কুসংস্কার, অজ্ঞতা দূর করতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ নিতে হবে।
অধ্যাপক ডা. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী
প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
সভাপতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস (বিএপি)।


